বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌম ঋণমানের আউটলুক বা পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করেছে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস। তবে দেশের দীর্ঘমেয়াদি ‘বি প্লাস’ এবং স্বল্পমেয়াদি ‘বি’ ক্রেডিট রেটিং অপরিবর্তিত রেখেছে ঋণমান নির্ধারণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাটি।
গত সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, ব্যাংক খাতে দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতার পাশাপাশি বিশ্ব জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তৈরি হওয়া ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি ভারসাম্য পুনঃস্থাপনের একটি কঠিন সময় পার করছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে রেমিট্যান্সে শক্তিশালী প্রবাহ অব্যাহত থাকা, পোশাক খাতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার এবং বহুপক্ষীয় ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে কার্যকর সম্পৃক্ততার ওপর। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস স্থিতিশীল থেকে নেতিবাচক করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ হওয়া মানে ঋণমান কমে যাওয়া নয়। এটি ভবিষ্যতে ঋণমান কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ার সতর্কসংকেত। বিদ্যমান ঝুঁকিগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা না গেলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ঋণমান কমে যেতে পারে। এর আগে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত এসঅ্যান্ডপির সর্বশেষ মূল্যায়নে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস ছিল ‘স্থিতিশীল’।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, আর্থিক খাতের ভারসাম্যহীনতা ও জ্বালানি বাজারের ঝুঁকির মতো প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি ধারা ও বৈদেশিক খাতের অবস্থান আরও দুর্বল হতে পারে। এসব কারণে আগামী ১২ থেকে ১৮ মাস রপ্তানি ও অর্থনীতির দ্রুত পুনরুদ্ধার ব্যাহত হতে পারে।
এসঅ্যান্ডপি বলেছে, আগামী দুই থেকে তিন বছরে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিকপ্রবৃদ্ধি আরও দুর্বল হলে বা বৈদেশিক খাতের অবস্থার উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটলে দেশের ক্রেডিট রেটিং কমে যেতে পারে। অন্যদিকে আগামী তিন থেকে চার বছরে ভালো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলে এবং বৈদেশিক ও রাজস্ব পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হলে আউটলুক আবার স্থিতিশীল করা হতে পারে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং তৈরি পোশাক রপ্তানির ধীরগতি। আগামী তিন বছরে বাংলাদেশের গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
এসঅ্যান্ডপি বলেছে, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী থাকলেও তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দুর্বলতা দেখা গেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নতুন সরকারের সংস্কার কর্মসূচি, বিশেষ করে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন কর্মসূচি বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব সংস্কারের বাস্তবায়নে সময় লাগবে বলেও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
সংস্থাটি বলেছে, দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এখনও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে অন্যতম বাধা। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর গড় খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৪০ শতাংশ, যা অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের তুলনায় অনেক বেশি। এসব ব্যাংকের পুনঃমূলধনীকরণে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে এবং এ জন্য সরকারকে রাজস্ব বা মুদ্রানীতিগত সহায়তা দিতে হতে পারে। রাষ্ট্রায়ত্ত ও ইসলামী ব্যাংকগুলোতেই মূলত মূলধন ঘাটতি ও সম্পদের নিম্নমানের সমস্যা কেন্দ্রীভূত। এসব ব্যাংকের দুর্বল মূলধন ভিত্তি এবং উচ্চ খেলাপি ঋণ অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে ব্যাংক খাতের সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
সংস্থাটি তাদের ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রি কান্ট্রি রিস্ক অ্যাসেসমেন্টে (বিআইসিআরএ) বাংলাদেশকে ৯ নম্বর ঝুঁকি শ্রেণিতে রেখেছে। এই মূল্যায়নে ১ সর্বনিম্ন এবং ১০ সর্বোচ্চ ঝুঁকি নির্দেশ করে। অর্থাৎ বৈশ্বিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত উচ্চ ঝুঁকির শ্রেণিতে রয়েছে।