প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথমবার আজ চট্টগ্রাম সফরে আসছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে এ কর্মসূচি ঠিক করা হলেও চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সাংগঠনিক সভায় তিনি অংশ নেবেন। এতে ৬০০ নেতাকর্মীর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। তিনি সেখানে তৃণমূল নেতাদের অভাব-অভিযোগের কথা শুনবেন। দেবেন দিকনির্দেশনা। আর তার এই কর্মসূচিকে ঘিরে চট্টগ্রামে নেতাকর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনা। আজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রী কর্মব্যস্ত দিন পার করবেন।
সফরসূচি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী আজ সকালে মহেশখালীর মাতারবাড়ী যাবেন। সেখানে নতুন করে ১৩২০ মেগাওয়াটের একটি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। আরও কিছু অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। সেই বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অবকাঠামো কোথায় স্থাপন করা যায়, মাঠ পর্যায়ে তা দেখবেন। দুপুর ১২টার দিকে বাঁশখালীতে বন্যাদুর্গতদের মাঝে ১০০ ঘর হস্তান্তরসহ সরকারি সহযোগিতা প্রদান এবং পুনর্বাসন সংক্রান্ত একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। বাহারছড়া সমুদ্রসৈকতের এই অনুষ্ঠান থেকে প্রধানমন্ত্রী যাবেন হাটহাজারীতে। হাটহাজারী কলেজ মাঠে তিনি বন্যাদুর্গতদের পুনর্বাসনসংক্রান্ত সভায় অংশ নেবেন। হাটহাজারীতে প্রয়াত আলেম আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও জুনাইদ বাবুনগরীর কবর জেয়ারতের কর্মসূচিও রয়েছে। এরপর তার ফটিকছড়িতে হেফাজত আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গেও বৈঠকের কথা রয়েছে। বিকালে তিনি ফটিকছড়িতে জনসভায় যোগ দেবেন। সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের একটি হোটেলে চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগর বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক বৈঠক করবেন। এখানে তৃণমূল্যের ৬শর মতো নেতাকর্মী অংশ নেবেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে প্রশাসন সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রাম সফর সফল ও সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে সব বাহিনী একযোগে কাজ করছে। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।’ তবে সবকিছু ছাপিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠকটিই বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বিএনপিতে বর্তমানে তিনটি ধারা দৃশ্যমান। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে ঘিরে একটি, ভূমি প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে ঘিরে একটি এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনকে ঘিরেও একটি ধারা তৈরি হয়েছে। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনুসারীদের মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়া, কমিটিতে স্থান করে দেওয়া এবং নির্বাচনের পর দল সরকার গঠন করলে অনুসারীদের বিভিন্ন সেবা সংস্থা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি-বেসরকারি সংস্থার শীর্ষ পদ এবং কমিটিতে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এই তিন ধারার শীর্ষ নেতারাই এটি করেছেন। তবে যারা এই তিন ধারার বাইরে বা কোনো ধরনের লবির সঙ্গে যুক্ত হননি, কেবল দলীয় আদর্শ লালন করে রাজনীতির মাঠে ত্যাগ স্বীকার করে যাচ্ছেন, তারা ছিটকে পড়ছেন সব জায়গা থেকে। এ কারণে অনেকের মধ্যে রয়েছে হতাশা। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তৃণমূল বৈঠকে তারা তাদের অবহেলা এবং বঞ্চনার সেসব কথা তুলে ধরার চেষ্টা করবেন বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্মসম্পাদক ও নগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি গাজী মোহাম্মদ সিরাজ উল্লাহ বলেন, “১৬ বছর আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে মাঠে ছিলাম। সর্বোচ্চ মামলা ও সর্বোচ্চ জেল-জুলুমের শিকার হয়েছি। তখন কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলাম। দল ক্ষমতায় আসার পর নগর কমিটিতে স্থান হয়েছে সদস্য হিসাবে। অবস্থাটা এমন যেন ‘কমিশনার থেকে কনস্টেবল পদে ডিমোশন।’ ত্যাগ নয়; দলে চলছে ‘মাইম্যানের জয়জয়কার।’ দলের আদর্শে নয়; নেতার মানুষ হলেই হাইব্রিডিরাও পাচ্ছেন পদপদবি, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা।’ বর্তমানে চট্টগ্রাম বিএনপি যেন অভিভাবকহীন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেলে আমি এসব বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করব।”
চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের সাবেক সহযোগাযোগ সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী মিন্টু বলেন, ‘আমরা নির্বাচনের আগে লড়াই-সংগ্রামে দলের একজন কর্মী হিসাবে কাজ করেছি। কোনো নেতার অনুসারী হিসাবে নয়। কিন্তু নির্বাচনের পর এক নেতার কাছে গেলে তিনি বলছেন, ‘তুমি তো অমুক নেতার অনুসারী। আঁকাবাঁকা পথে চলছ। আরেক নেতার কাছে গেলে তিনি বলছেন, ‘তুমি তো তমুক নেতার পিছে হাঁটো। দলের একজন ত্যাগী কর্মী হিসাবে কেউ বিবেচনা করছেন না।’
চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম চট্টগ্রাম সফরে দলের চেয়ারম্যানের সঙ্গে একটি বৈঠকের সুযোগ। চেয়ারম্যানও আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বৈঠক ঘিরে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা চেয়ারম্যানের কাছে তাদের সুখ-দুঃখের কথা জানাতে পারবেন এবং একটি দিক-নির্দেশনা এই বৈঠক থেকে পাওয়া যাবে বলে মনে করছি।’
(যুগান্তর)