বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৫২ অপরাহ্ন




মশা নিয়ন্ত্রণে ১০ মাসে খরচ সাড়ে ৫ কোটি টাকা, তবু বাড়ছে ডেঙ্গু

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬ ৯:৩৬ pm
ডেঙ্গু পরীক্ষা ডেঙ্গুরোগী dengue fever mosquito corona dengue ডেঙ্গু রোগী করোনা মশা মশারি কয়েল স্প্রে corona dengue ডেঙ্গু রোগী করোনা dengue ডেঙ্গু corona রোগী করোনা dengue corona ডেঙ্গু রোগী করোনা মশা মশারি কয়েল স্প্রে International Centre for Diarrhoeal Disease Research Bangladesh ICDDRB Diarrhea আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ বা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডাইরিয়াল ডিজিজ রিসার্চ বাংলাদেশ আইসিডিডিআরবি আইসিডিডিআরবি ডায়রিয়া
file pic

মশা নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ব্যয় বাড়লেও কমছে না উপদ্রব। উল্টো বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার বিস্তার বাড়ায় দ্রুত বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত গত ১০ মাসে শুধু মশার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কিনতেই প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা খরচ করেছে চসিক।

অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপে নগরের বেশ কয়েকটি এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব পাওয়া গেছে নিরাপদ মাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।

২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই পাঁচ অর্থবছরে প্রায় ১৪ কোটি টাকার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কিনেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে অ্যাডাল্টিসাইড (পূর্ণবয়স্ক মশা মারার ওষুধ) কিনতে ৫ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং লার্ভিসাইড (লার্ভা ধ্বংসকারী ওষুধ) কিনতে ব্যয় করা হয়েছে ৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। ফগার মেশিন ও হ্যান্ড স্প্রে মেশিন কিনতে ব্যয় হয়েছে এক কোটি ৩০ লাখ টাকা।

গত ৩০ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মশক নিধন খাতে ২৫ কোটি টাকার বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়। মশার কারণে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি বেড়ে যাওয়ায় এত বড় বাজেট রাখার কথা জানান সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। গত অর্থবছরে এ খাতে বাজেট রাখা হয়েছিল পাঁচ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চলতি বছরের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৪৯৭ জন। এর মধ্যে মারা গেছে তিনজন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১৬৩ জন।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, আগস্টের প্রথম ১৯ দিনেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৬৬৩ জন। এর আগে জুলাইয়ে আক্রান্ত হন ৫৩৬ জন। অর্থাৎ দুই মাসের ব্যবধানেই আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।

জুলাই-অক্টোবরকে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। ২০২২ সালের এ সময়ে আক্রান্ত ছিলেন ২ হাজার ৬৪০ জন। ২০২৩ সালে তা বেড়ে ১২ হাজার ৩ জনে দাঁড়ায়। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হন ২ হাজার ৭৩৭ এবং ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৬০ জন।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সাড়ে চার বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২২ সালে প্রাণ গেছে ৪১ জনের, আক্রান্ত হয়েছেন পাঁচ হাজার ৪৪৫ জন। ২০২৩ সালে প্রাণ যাওয়া ও আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। বছরটিতে প্রাণ গেছে ১০৭ জনের, আক্রান্ত হয়েছেন রেকর্ড ১৪ হাজার ৮৭ জন। ২০২৪ সালে প্রাণ যায় ৪৫ জনের, আক্রান্ত হন চার হাজার ৩২৩ জন। ২০২৫ সালে প্রাণ যায় ২৭ জনের ও আক্রান্ত হন চার হাজার ৮৬৪ জন। চলতি বছরের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে তিনজনের, আক্রান্ত দেড় হাজার।

৮ থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করে ৯৯টিতে এডিসের লার্ভা পাওয়া যায়। ৩৪৫টি পানির পাত্র পরীক্ষা করে ১১৪টিতে লার্ভার উপস্থিতি মেলে।

জরিপে কনটেইনার ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩৩.০৪ শতাংশ। নিরাপদ মাত্রা ১০ শতাংশের নিচে। হাউস ইনডেক্স ২৬.৭৬ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ৫ শতাংশের নিচে। ব্রেটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩০.৮১ শতাংশ, নিরাপদ মাত্রা ২০ শতাংশের নিচে।

দীর্ঘদিন একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মশার মধ্যে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে পারে। কোন ওষুধ কার্যকর, তা পরীক্ষাগারে নিয়মিত যাচাই করা দরকার।– নগর পরিকল্পনাবিদ দেলোয়ার হোসেন মজুমদার

উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, পশ্চিম ও দক্ষিণ বাকলিয়া, পাথরঘাটা, আন্দরকিল্লা ও দক্ষিণ হালিশহরকে উচ্চঝুঁকির এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহ বলেন, জরিপে পাওয়া লার্ভার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এডিস ইজিপ্টাই। পানি সংকটের কারণে বাসাবাড়িতে জমিয়ে রাখা পানি এবং নির্মাণাধীন ভবনগুলো এডিসের বড় প্রজননস্থল হয়ে উঠেছে।

মশা নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ব্যয়ও কম নয়। গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত মোট ১০ মাসে মশার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কিনতে প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা খরচ করেছে চসিক।

এর বাইরে ওষুধ ছিটানোর কাজে থাকা ৩৫৫ জন অপারেটরের বেতন বাবদ প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ রয়েছে ৯ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

২০০০ সাল থেকে মশা নিয়ন্ত্রণে চসিকের ব্যয় প্রায় ৪৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে গত ১০ বছরেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা।

তারপরও চান্দগাঁও, মোহরা, বহদ্দারহাট, শুলকবহর, হামজারবাগ, জামালখান, চকবাজার ও হালিশহরের বাসিন্দারা মশার উপদ্রব কমেনি বলে অভিযোগ করছেন।

৭০ লাখ মানুষের জন্য কর্মী ৩৫৫
চসিকের ৪১টি ওয়ার্ডে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন ৩৫৫ জন কর্মী। চসিকের দাবি, প্রতিটি ব্লকে ৭২ ঘণ্টা পরপর ওষুধ ছিটানোর ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে নগরবাসীর অভিযোগ, অনেক এলাকায় নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হয় না। দীর্ঘদিনেও কোনো কোনো এলাকায় মশক নিধনকর্মীদের দেখা যায় না।

চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, প্রায় ৭০ লাখ মানুষের নগরীতে সাড়ে তিনশর কিছু বেশি কর্মী দিয়ে সেবা দেওয়া কঠিন। এরপরও সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনের চেয়ে লার্ভা ধ্বংস বেশি কার্যকর। এ কারণে ফগিংয়ের পাশাপাশি লার্ভা ধ্বংসে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

শুধু ফগিংয়ে মিলবে না সমাধান
বিশেষজ্ঞদের মতে, মশা নিয়ন্ত্রণে শুধু ওষুধ ছিটিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। কোন এলাকায় কোন প্রজাতির মশা রয়েছে, কোথায় প্রজননস্থল এবং কোন কীটনাশক কার্যকর এসব বিষয় নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মো. আহসান হাবিব সিয়াম বলেন, মশা নিধন কার্যক্রমে কীটতত্ত্ববিদদের পর্যাপ্ত সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। বৈজ্ঞানিক দক্ষতা ছাড়া বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

নগর পরিকল্পনাবিদ মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, দীর্ঘদিন একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মশার মধ্যে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে পারে। কোন ওষুধ কার্যকর, তা পরীক্ষাগারে নিয়মিত যাচাই করা দরকার।

চসিকের মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরফুল ইসলাম মাহি বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ৬০ সদস্যের বিশেষ দল কাজ করছে। আগামী ছয় মাসের জন্য পর্যাপ্ত লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড মজুত রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমের পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। বাসাবাড়ি, ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র ও নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমতে না দিলে এডিসের প্রজনন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। জাগো নিউজ




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD