বিএনপি এতদিন ছোট ও কার্যকর একটি মন্ত্রিসভা গঠনের কথা বলছিল। কিন্তু সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভার আকার হয়ে উঠল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম। ফলে বিএনপির ৩১ দফা অনুযায়ী ক্ষমতার ভারসাম্য এবং নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী মেধা ও যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে করেন না বিশ্লেষকরা। আর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ গৌণই রয়ে গেছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, মন্ত্রিসভার আকার বড় হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। আবার একাধিক বড় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একজন মন্ত্রীর ওপর দিলে কার্যকর নজরদারি সম্ভব হয় না। বিপরীতে ছোট মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা দায়িত্বে থাকলে সমন্বয়ের অভাব হয় এবং কাজ পিছিয়ে যায়। এতে সময় ও অর্থের অপচয় হয়।
রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে মন্ত্রিসভার আকার ২০ থেকে ২২ মন্ত্রী এবং আট থেকে ১০ প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে রাখা যৌক্তিক মনে করে অনেকে।
ছোট মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা
ধর্ম, মুক্তিযুদ্ধ, পার্বত্য চট্টগ্রাম, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ, বস্ত্র ও পাট, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের মতো ছোট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন একজন করে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা; সংস্কৃতি, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান, তথ্য ও সম্প্রচারের মতো মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা দায়িত্ব পেয়েছেন। এর মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, মুক্তিযুদ্ধ, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে অতীতে শুধু একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। ছোট মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা দায়িত্বে থাকায় নিজেদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ আস্তে আস্তে সামনে আসছে।
এবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন দুজন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম গত শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, মন্ত্রণালয়ের কাজের পরিধি, ব্যস্ততা এবং গতি আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেড়েছে। কাজের সুবিধার্থে সরকার এখানে দুজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উপদেষ্টা থেকে এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন হুমায়ুন কবির।
সাবেক সচিব, জনপ্রশাসন সংস্কার ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া বলেন, মন্ত্রীদের কাছে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ফাইল যায়। বাকি ফাইলগুলো নিচেই নিষ্পত্তি হয়। আইয়ুব মিয়া বলেন, বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সরকারের কাঠামোর মিল পাওয়া যাচ্ছে না। মন্ত্রীদের মুখে সংস্কারের কথাও শোনা যায় না।
৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন
বিএনপির ৩১ দফার চতুর্থ দফায় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার নির্বাহী ক্ষমতার মধ্যে যথাযথ ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কর্তব্য পুনর্বিন্যাস করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর অর্থ হলো, সরকার পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না রেখে মন্ত্রিসভাকে নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর অংশীদার করা। সে ক্ষেত্রে মন্ত্রী নির্বাচন এবং মন্ত্রণালয় বণ্টনেও ব্যক্তিগত আনুগত্যের চেয়ে দক্ষতা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞতা গুরুত্ব পেতে পারে।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম ঘোষণা ছিল ‘মেরিটোক্রেসি’ বা মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ গঠন। রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে নতুন মন্ত্রিসভায় রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং নীতিনির্ধারণের যোগ্যতাকে বিবেচনায় নেওয়ার প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছে।
প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও বিএনপির প্রস্তাবে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ, যোগ্য ও দক্ষ জনপ্রশাসন গড়ে তোলার কথা রয়েছে। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণকে যোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি করার কথা বলা হয়েছে। প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রীদের ইশতেহার অনুযায়ী দেশ পরিচালনার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, মন্ত্রিসভার আকার ছোট ও কার্যকর রাখা গেলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত হবে; জবাবদিহি বাড়বে এবং প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক নেতৃত্বের কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা সহজ হবে। বড় মন্ত্রিসভা হলে অশুভ প্রতিযোগিতা বাড়ে। বিএনপি বলেছিল, তারা ছোট ও কার্যকর মন্ত্রিসভা গঠন করবে। কিন্তু বিএনপি এখন পুরোনো পথেই হাঁটছে।
সংস্কার প্রস্তাবে মন্ত্রিসভার আকার
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রিসভায় সর্বোচ্চ ২৩ জন মন্ত্রী এবং ১২ জন প্রতিমন্ত্রী রাখার সুপারিশ করেছিল। পাশাপাশি বিদ্যমান মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা ৪৩ থেকে ২৫-এ নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়। কমিশনের সুপারিশ ছিল, মন্ত্রণালয়গুলো থাকবে পাঁচটি গুচ্ছে। সংস্কার কমিশনের সুপারিশে প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকা মন্ত্রণালয়গুলোর নামও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়।
কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, রাষ্ট্রপতির সচিবালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বাদে মন্ত্রণালয় হবে ২৫টি। এতে দুজন টেকনোক্র্যাটসহ মন্ত্রী হবেন ২৩ জন। প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী হবেন ১২ জন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব একজন, মুখ্য সচিব ১৭ জন ও সচিব থাকবেন ৪২ জন। একাধিক বিভাগসংবলিত মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীকে পরামর্শ দেওয়া এবং সমন্বয়ের জন্য একজন মুখ্য সচিব থাকবেন।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের একাধিক সদস্য বলেন, কমিশন চিন্তাভাবনা করেই ৩৫ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর প্রস্তাব রেখেছিল। দেশের আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় মন্ত্রীর সংখ্যা যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা উচিত। কারণ, ডিজিটাল যুগে একজন ব্যক্তি আগের তুলনায় অনেক বেশি কাজ করতে পারেন। তাই জনবল কমিয়ে সামাজিক নিরাপত্তাসহ জনকল্যাণমূলক খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর সুযোগ রাখার চিন্তা করে মন্ত্রিসভার এমন কাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছিল।
কেমন ছিল আগের মন্ত্রিসভা
বিএনপির বর্তমান মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা ৫১। প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা ১০ জন এবং বিশেষ সহকারী ৩ জন। মোট ৬৪ জন।
এর আগে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ মোট ৩৭ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া ২৫ মন্ত্রী ও ১১ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। পরে সাতজন প্রতিমন্ত্রী যুক্ত হন। এতে মন্ত্রিসভার আকার হয় ৪৪। উপদেষ্টা ছিলেন সাতজন।
২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সরকারে ৪৮ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী ছিলেন। এতে প্রধানমন্ত্রীসহ ২৬ মন্ত্রী, ১৯ প্রতিমন্ত্রী ও ৩ জন উপমন্ত্রী ছিলেন। উপদেষ্টা ছিলেন সাতজন।
২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনের পর মন্ত্রিসভার প্রাথমিক সদস্য ছিলেন প্রধানমন্ত্রীসহ ৪৯ জন। পরে মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছিল ৫৪। উপদেষ্টা ছিলেন সাতজন।
২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা শুরুতে ছিল প্রধানমন্ত্রীসহ ৩২। পরে বিভিন্ন রদবদল ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে এ সংখ্যা ৬১-তে দাঁড়ায়। উপদেষ্টা ছিলেন ৯ জন। সে হিসাবে মোট ৭০ জন।
এর আগে ২০০১ সালে অষ্টম সংসদ নির্বাচনের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত বিএনপির মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন ৬০ জন। এর মধ্যে ২৮ জন মন্ত্রী, ২৮ প্রতিমন্ত্রী এবং চারজন উপমন্ত্রী ছিলেন। উপদেষ্টা ছিলেন চারজন। মোট ৬৪ জন।
২০০৭ সালের জানুয়ারিতে গঠিত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরে প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদের অধীনে ১৫ জন উপদেষ্টা এবং চারজন বিশেষ সহকারী দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে মোট ২০ জন উপদেষ্টা এবং বিভিন্ন ধাপে ১৩ জন বিশেষ সহকারী দায়িত্ব পালন করেছেন। সমকাল