মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ০৬:০২ অপরাহ্ন




টিকা নিয়েও ১১% শিশু হামে আক্রান্ত: নতুন গবেষণার তাগিদ

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:২৮ pm
Omicron ভ্যাকসিন vaccine vaccination Booster Dose কোভিড ১৯ টিকা করোনা corona covid corona covid করোনা বুস্টার ডোজ করোনা corona covid corona covid করোনা Monkeypox virus মাঙ্কিপক্স
file pic

দেশে ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সরকারকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব কমাতে সরকার দেশব্যাপী ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী সকল শিশুর জন্য বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে, যার আওতায় প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, নিয়ম অনুযায়ী দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও অনেক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে, এমনকি মৃত্যুবরণও করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত ন্যাশনাল ইপিআই সার্ভিল্যান্সের এক সাম্প্রতিক জরিপে এই ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।

জরিপের ভয়াবহ তথ্য

হাম সন্দেহে ২ হাজার ৩১০ জন শিশুর ওপর চালানো জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এদের মধ্যে ৫৪.৭ শতাংশ শিশু কোনো টিকাই গ্রহণ করেনি। ২২ শতাংশ শিশু প্রথম ডোজ (এমআর-১) নেওয়ার পরও হামে আক্রান্ত হয়েছে। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২৩.২ শতাংশ শিশুকে হামের পূর্ণ দুই ডোজ (এমআর-১ ও ২) দেওয়ার পরও তাদের শরীরে হামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

নিয়ম অনুযায়ী দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, হামে পূর্ণ টিকা নেওয়া সত্ত্বেও ১১.২ শতাংশ শিশু আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়া এক ডোজ টিকা নেওয়ার পরও ১৭ শতাংশ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে টিকা নেওয়া ও না নেওয়া উভয় শিশুই রয়েছে
জরিপে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ৭৫১ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৭১.৮ শতাংশ শিশু টিকা নেয়নি। এর মধ্যে ৪৯ শতাংশ শিশুর টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি। ১৭ শতাংশ শিশু এক ডোজ টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্ত হয়েছে। আর ১১.২ শতাংশ শিশু হামের পূর্ণ টিকাদান কর্মসূচি সম্পন্ন করার পরও হামে আক্রান্ত হয়েছে।

চলতি বছরের চিত্র

এ বছরের প্রথম দুই মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জানুয়ারি মাসে ৫৫০ জন আক্রান্তের মধ্যে ১৩০ জন শিশু প্রথম ডোজ এবং ১৩৮ জন শিশু দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ করেছিল। ফেব্রুয়ারি মাসে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন ১১শ আক্রান্তের মধ্যে ৯৫ জন প্রথম ডোজ এবং ৯৯ জন দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ করেছিল। বাকিদের অধিকাংশেরই টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই হাম হয়েছে।

বিগত চার বছরের তথ্যমতে, হামের টিকা নেওয়ার বয়সের (৯ মাস) আগেই এবার সবচেয়ে বেশি শিশু আক্রান্ত হয়েছে। ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার ২০২৩ সালে ছিল ৬ শতাংশ, ২০২৪ সালে ১৫ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ১১ শতাংশ। কিন্তু এ বছর টিকা নেওয়ার আগেই ৩৩ শতাংশ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে।

৯ থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের আক্রান্তের হারও বিগত বছরের তুলনায় বেশি। ২০২৩ সালে ৬ শতাংশ, ২০২৪ সালে ১৫ শতাংশ, ২০২৫ সালে ১১ শতাংশ এবং এ বছর বিগত তিন মাসে ১৮ শতাংশ শিশু আক্রান্ত হয়েছে, যাদের বয়স ৯ মাস থেকে এক বছর।

বিশেষজ্ঞদের মত

বিশেষজ্ঞরা জানান, এ বছর হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৩৩ শতাংশ শিশুর টিকা গ্রহণের বয়সই হয়নি। এদের প্রত্যেকের বয়স ৯ মাসের কম। একইসঙ্গে টিকা গ্রহণের পরও হামে আক্রান্তের সংখ্যাও কম নয়। এ তথ্য দিয়ে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, হামে আক্রান্তদের মধ্যে টিকা দেওয়া ও না দেওয়া উভয় শিশুই আছে। তার মানে শুধুমাত্র টিকার বিষয়কে সামনে না এনে নতুনভাবে গবেষণা করা দরকার কী কারণে হঠাৎ করে হামের প্রকোপ দেশব্যাপী এভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

রোববার (১২ এপ্রিল) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) মিল্টন হলে ‘হামের পুনঃআবির্ভাব: প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনার প্রতিবন্ধকতা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিক বলেন, ‘আমরা এতদিন নিশ্চিত ছিলাম যে ৬ মাস পর্যন্ত শিশুদের হাম হয় না, কারণ মায়ের ইমিউনিটি শিশুর শরীরে থাকে। কিন্তু এখন হচ্ছে। তার অর্থ, মায়ের ইমিউনিটি বাচ্চার শরীরে যাচ্ছে না। এজন্য কিশোরীদের বিয়ের আগে একটি বুস্টার ডোজ দেওয়া যায় কি না, তা ভেবে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে মায়েদের ওপর গবেষণা পরিচালনার প্রয়োজন রয়েছে। যদি কাজে দেয়, তাহলে বিয়ের আগে একটি বুস্টার ডোজ দেওয়া যেতে পারে।’

বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, ‘আমাদের ভুলটা কোথায় হয়েছে, সেটা আইডেন্টিফাই করতে হবে। আমাদের ভ্যাকসিন কাভারেজের তথ্যে বড় ধরনের গলদ আছে। কোনো কোনো জেলায় ১৫০% কাভারেজের কথা বলা হচ্ছে, যা অবাস্তব। এর মানে তথ্যগুলো সঠিক ছিল না।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. লুৎফুন্নেসা বলেন, ‘হাম একটি বিধ্বংসী রোগ, যা শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে দেয়। ভিটামিন এ-এর ঘাটতি এর অন্যতম কারণ। এটি তীব্র সংক্রামক। হাসপাতালে আলাদা কর্নার না থাকায় একটি শিশু আরও অনেকের মাঝে রোগ ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে কোন কন্ডিশনে শিশু হাসপাতালে আসবে, সেটি ঠিক করে দিলে মনে হয় ভালো হবে।’

আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারাদেশে নিশ্চিতভাবে হামে ২৮ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে, হামের লক্ষণ নিয়ে বা সন্দেহজনক হিসেবে মৃত্যু হয়েছে আরও ১৫১ জন শিশুর। অর্থাৎ, গত এক মাসে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১৭৯ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

একই সময়ে সারাদেশে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৬৩৯ জন। এছাড়া, সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ২২৫ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে ঢাকা বিভাগ শীর্ষে রয়েছে, এর পরেই অবস্থান রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগের।

সরকারের বিশেষ পদক্ষেপ

দেশব্যাপী হাম ছড়িয়ে পড়ায় সরকার টিকা গ্রহণের বয়স ৯ মাসের স্থলে কমিয়ে ৬ মাসে নিয়ে এসেছে এবং গত ৫ এপ্রিল থেকে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শুরু করেছে। সংক্রমণের হার বিবেচনায় ১৮ জেলার ৩০ উপজেলার ১২ লাখ শিশুকে এই বিশেষ টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

রোববার (১২ এপ্রিল) থেকে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ, বরিশাল ও ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনে এই টিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী ১ কোটি ৭৮ লাখ ৪০ হাজার শিশুর মাঝে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হবে। এর মাধ্যমে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ৯৫ শতাংশ শিশুকে হামের টিকার আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। DP




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD