বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৪৮ অপরাহ্ন




হামের পর নিউমোনিয়া ও অপুষ্টির শিকার শিশুরা

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:৪৪ pm
শিশু সর্দিজ্বর ঘরে জ্বর সর্দি কাশি Fever Cold Cough জ্বর মাথা ব্যথা গলা শরীর ম্যাজম্যাজ কাশি হাঁচি ঘরে সর্দি কাশি
file pic

হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে যারা মারা গেছে তাদের প্রায় ৯০ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে নিউমোনিয়া ও অপুষ্টিজনিত জটিলতার কারণে। অন্য যারা মারা গেছে, তাদের ৩৩ শতাংশ মেনিনগোএনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের আবরণীর প্রদাহ) এবং ২২ শতাংশের ক্ষেত্রে সেপটিসেমিয়ার (রক্তে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া) মতো জটিলতা দেখা গেছে। মারা যাওয়া শিশুদের বড় অংশই টিকাবঞ্চিত ছিল। রাজধানীর তিন হাসপাতালে হামে মারা যাওয়া শিশুদের তথ্য বিশ্লেষণে এই চিত্র উঠে এসেছে।

ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল এবং ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কভিড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া ৬৬ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তবে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ডেথ রিভিউ (মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা) শুরু করেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

এই তিন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল প্রায় ছয় হাজার ৪০০ শিশু। এর মধ্যে মারা গেছে ৬৬ জন।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি তিন শিশুর একজনের মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মারা গেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৮ শতাংশ শিশুর বয়স ছয় মাসের কম, ৫০ শতাংশের বয়স সাত থেকে ১০ মাস এবং এক বছরের বেশি বয়সী ৩২ শতাংশ।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফ এ আসমা খান বলেন, হামে আক্রান্ত অবস্থায় নিউমোনিয়া শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। অধিকাংশ শিশুই গুরুতর শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে আসে, পরে পরীক্ষায় তাদের নিউমোনিয়া শনাক্ত হয়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সম্ভব না হওয়ায় দেরিতে ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। তিনি অতীতের এক গবেষণার বরাত দিয়ে বলেন, হাম আক্রান্ত শিশুদের প্রতি ২০ জনের একজন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকে। আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুর প্রধান কারণ এটি।

ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কভিড হাসপাতালের পরিচালক কর্নেল ডা. লতিফা রহমান বলেন, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি একটি বড় সমস্যা। এর সঙ্গে নিউমোনিয়া যুক্ত হয়ে মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। চিকিৎসকরা জানান, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশের মৃত্যুর মূল কারণ নিউমোনিয়া। প্রাথমিক পর্যায়ে অক্সিজেন সাপোর্ট নিশ্চিত করা গেলে অনেক মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হলেও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তা যথাযথভাবে হচ্ছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক জানিয়েছেন, দেশে নিউমোনিয়াজনিত শিশুমৃত্যুর পরিস্থিতি নতুন নয়। তবে মৃত্যুহার কমাতে দীর্ঘদিন ধরে বড় কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নিউমোনিয়াসহ জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুদের যথাযথ সেবা দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, যেসব শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের মধ্যে হাম সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। বিশেষ করে যারা টিকা নেয়নি বা টিকা নেওয়ার পরও যথাযথ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠেনি, তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। হামে আক্রান্ত শিশুদের অনেকের কান পাকা এবং মুখগহ্বরে ঘা হওয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়।

গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা (অংশীদারিত্ব ও কৌশল-জনস্বাস্থ্য) এবং পুষ্টি বিশেষজ্ঞ মো. ফেরদৌস বলেন, দেশে শিশুদের অপুষ্টিজনিত সংকট এখনও প্রকট। অনেক শিশু তীব্র অপুষ্টিতে (সিভিয়ার অ্যাকিউট ম্যালনিউট্রিশন বা এসএএম) ভুগছে। বিশেষ করে গত দেড় বছরে এ ধরনের অপুষ্টির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তিনি বলেন, স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্তদের মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ১২ গুণ বেশি। অপুষ্টি প্রতিরোধে আগে বছরে দুইবার ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন চালানো হতো। প্রায় আড়াই কোটি শিশুকে ক্যাপসুল খাওয়ানো হতো। কিন্তু গত দেড় বছর ধরে এই কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে ভিটামিন এ ক্যাপসুল ক্রয়ের প্রক্রিয়া চলমান। তবে তা হাতে পেতে আরও অন্তত ছয় মাস লাগতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংক্রমণ ছড়িয়েছে দেশের বেশির ভাগ জেলায়। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে মহামারি ব্যবস্থাপনার পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, টিকাদান ছাড়াও সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।

কেন বাড়ছে সংক্রমণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকার ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানে বিঘ্ন এবং সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচির অভাবের কারণে সংক্রমণ ঝুঁকিতে থাকা শিশুর সংখ্যা বেড়েছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ভ্রমণ বাড়ায় দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে হাম।

সুপারিশ উপেক্ষিত
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহামারি মোকাবিলার মৌলিক ধাপ— ডেথ রিভিউ, সমন্বিত চিকিৎসা প্রোটোকল, ব্যাপক পরীক্ষা, আইসোলেশন ও জনসচেতনতা। কিন্তু এসব যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। তাদের মতে, জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা, দ্রুত টিকাদান জোরদার, উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো এবং অক্সিজেনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরিস্থিতিকে উচ্চ ঝুঁকির আখ্যা দেওয়ার পর এ নিয়ে সরকারের জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করা উচিত ছিল। এতে একদিকে যেমন সঠিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যেত, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো যেত।

হাম মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ খুব একটা আমলে নিচ্ছে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ১২ এপ্রিলের যৌথ সভা থেকে বিশেষজ্ঞরা একটি বহুপক্ষীয় কমিটি গঠনসহ বেশ কিছু জরুরি সুপারিশ করেছিলেন। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন হতে দেখা যাচ্ছে না বলে জানান, জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক মো. মঈনুল আহসান বলেন, হামের উচ্চ ঝুঁকিতে বাংলাদেশ– বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এমন বার্তা পাওয়ার পর সংস্থাটির কর্মকর্তাদের থেকে লিখিত সুপারিশ চাওয়া হয়েছে। তাদের সুপারিশ পেলে পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সংক্রমণের চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে এক হাজার ২১৮ সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে নিশ্চিত হামের রোগী ৮৮। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে চার হাজার ৯৫৪ শিশু আক্রান্ত বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। সন্দেহজনক রোগী ৩৫ হাজার ৮০। একই সময়ে হামে মৃত্যু হয়েছে ৪৭ জনের। এ ছাড়া হামে আক্রান্ত বলে সন্দেহজনক ২২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত ২৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

৭৪ শতাংশ শিশু কোনো টিকা পায়নি
দেশে হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ কোনো টিকা পায়নি। আক্রান্তদের ১৪ শতাংশ প্রথম ডোজ নিয়েছিল। ১২ শতাংশ দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও সংক্রমিত হয়েছে। গতকাল রাজধানীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান ইউনিসেফ বাংলাদেশের হেলথ ম্যানেজার (ইমিউনাইজেশন) ডা. রিয়াদ মাহমুদ। তিনি বলেন, গত ৫ এপ্রিল একযোগে ৩০টি উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। ইতোমধ্যে তিন সপ্তাহ পার হয়েছে। যেসব উপজেলায় এই কর্মসূচি চালানো হয়েছে, সেখানে নতুন রোগী পাওয়া যাচ্ছে না। এতে ধারণা করা যাচ্ছে, মে মাসের শেষ নাগাদ হামের প্রকোপ কমে আসতে পারে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, দেশে হাম প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা গেছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৬১ শতাংশ। নির্দিষ্ট উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এ হার ৯২ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে পরীক্ষার সীমিত সক্ষমতা ও বিপুলসংখ্যক ‘সন্দেহজনক’ রোগী নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে বলে জানান তিনি।

নিয়মিত ইপিআই টিকাদান ৯৫ শতাংশ নিশ্চিত করা গেলে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে। কিন্তু বর্তমানে একটি ইমিউনিটি গ্যাপ রয়ে গেছে। কারণ অন্যান্য টিকা ১৪ সপ্তাহের মধ্যে শেষ হলেও হামের দ্বিতীয় ডোজ নিতে অপেক্ষা করতে হয় ১৫ মাস পর্যন্ত। তিনি আরও জানান, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) টিকা আগামী মাসের শুরুতেই দেশে পৌঁছাবে। বর্তমানে সব হাসপাতালে আইসোলেশন ব্যবস্থা চালু থাকায় আক্রান্তদের এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের সুযোগ নেই। আমরা আশা করছি, খুব শিগগিরই সংক্রমণের সর্বোচ্চ পর্যায় অতিক্রম করে পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যাবে। সমকাল




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD