বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫১ পূর্বাহ্ন




আবু সাঈদের রংপুর কতটা বদলেছে

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৪৫ am
Mass uprising martyrs injured injure July Martyr July Fighter July Fighters Abu Sayed Abu Sayeed abu_sayeed আবু সাঈদ আবু সাঈদ
file pic

আবু সাঈদের আত্মত্যাগ ও ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রংপুরের মানুষের প্রত্যাশা ছিল বৈষম্যহীন সমাজ, সুশাসন এবং উন্নত জীবনমান। শুধু সরকার বদল নয়; রাষ্ট্রের আচরণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকায় ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে চেয়েছে তারা। দলীয় প্রভাবমুক্ত শিক্ষাঙ্গন, নির্ভয়ে কথা বলার অধিকার ও মামলা-হয়রানি বন্ধের স্বপ্ন দেখেছে তারা। জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পর রংপুরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। তাদের কথায় এসব প্রত্যাশার বিষয় উঠে এসেছে। তবে তাদের বেশির ভাগের মতে, বিভিন্ন প্রত্যাশা পূরণে এখনও বিশাল চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

‘আমরা শুধু সরকার পরিবর্তন চাইনি’
রংপুর নগরের তরুণ রাকিব হাসান বলেন, ‘আমরা শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন করিনি। আমরা চেয়েছিলাম, রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাবে, প্রশাসন জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে এবং পুলিশ থাকবে নিরপেক্ষ। কিন্তু দুই বছর পর তেমন কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ছে না।’

বালাপাড়া এলাকার তরুণ নাঈম ইসলাম বলেন, ‘৫ আগস্টের পর ভেবেছিলাম, নতুন একটা বাংলাদেশ হবে। রাষ্ট্রীয় কাঠামো হবে জবাবদিহিমূলক, ঘুষ-দুর্নীতি থাকবে না। কিন্তু আমরা যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা এখনও অনেক দূরে আছে।’

তবে জুলাই আন্দোলনের পর তরুণদের চিন্তা ও চেতনায় পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করেন অনেকে। রাজনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে নতুন প্রজন্ম আগের চেয়ে বেশি সচেতন হয়েছে। অনেক তরুণ প্রথমবার রাজপথে নেমেছেন, কেউ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন, কেউ নাগরিক অধিকার নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার বলেন, ‘আগে আমরা অনেক বিষয় নিয়ে ভয়ে চুপ থাকতাম। এখন শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে শিখেছে। তবে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি যেন আবার রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপে হারিয়ে না যায়, সেটিই আমাদের ভয়।’

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন আবু সাঈদ। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে উত্তাল হয়ে ওঠে সারাদেশ।

বেরোবিতে বদল কতটা?
আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার পরও বেরোবি ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে অন্তত ছয় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত সোমবার সন্ধ্যা থেকে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু হাসান বলেন, ‘বৈষম্যের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছায় জীবন দিয়েছেন আবু সাঈদ। আমরা ভেবেছিলাম, এবার বিশ্ববিদ্যালয়টির অন্তত উন্নয়ন হবে। কিন্তু তেমন কিছুই হলো না।’

বেরোবি ছাত্রদলের সহসভাপতি তুহিন রানা বলেন, ‘আবু সাঈদের জীবন উৎসর্গে আমরা আশা করেছিলাম, সব ধরনের বৈষম্য-বঞ্চনার অবসান, গণতন্ত্রের আমূল পরিবর্তন এবং নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত হবে। কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেলেও রংপুরের কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। তবে মানুষের বাকস্বাধীনতা ফিরেছে।’

বেরোবি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক ইমরান খান সৌরভ বলেন, ‘দুই বছরেও রংপুরের তেমন কোনো পরিবর্তন বা উন্নয়ন হয়নি। বেরোবিতে শহীদ আবু সাঈদ গেট, জাদুঘর বা স্মৃতিস্তম্ভ এখনও দৃশ্যমান নয়। আবু সাঈদ যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন, সেই বৈষম্যও দূর হয়নি।’

ইংরেজি বিভাগের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের আধিপত্য ছিল। এখন ছাত্রদল ও শিবিরের আধিপত্য আছে। পরিবর্তন বলতে শুধু দল পরিবর্তন হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। অবকাঠামোগত উন্নয়নও আশানুরূপ নয়। শিক্ষার্থীদের মেধা-মনন ও ক্যারিয়ার সমৃদ্ধকরণেও দৃশ্যমান উদ্যোগ কম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, আবু সাঈদ প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন বৈষম্য দূর করার জন্য। কিন্তু সেই বৈষম্যের তলানিতে পড়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয় তথা রংপুর অঞ্চল। শিক্ষার পরিবেশ, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

উন্নয়নে রংপুর কি এখনও পিছিয়ে
আন্দোলনের দুই বছর পরও উন্নয়নের ক্ষেত্রে রংপুর পিছিয়ে আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সড়ক, রেল, স্বাস্থ্য, কৃষি ও শিক্ষায় বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি। কামারপাড়া বাসস্ট্যান্ড স্থানান্তর হয়নি। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সংকটও পুরোপুরি কাটেনি। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়নেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই।

রংপুর জেলা এলজিইডি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার আট উপজেলায় মোট ৭ হাজার ৬১৫ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে পাকা ২ হাজার ৭৩৯ দশমিক ৯৩ কিলোমিটার, যা প্রায় ৩৫ শতাংশ। কাঁচা সড়ক রয়েছে ৪ হাজার ৮৭৫ দশমিক ৭১ কিলোমিটার, অর্থাৎ প্রায় ৬৫ শতাংশ।

এলজিইডির কর্মকর্তারা বলছেন, দক্ষিণাঞ্চলে গড়ে ৭০ শতাংশ সড়ক পাকাকরণ হয়েছে। সে তুলনায় রংপুর অনেক পিছিয়ে। আবু সাঈদের জন্মভিটা পীরগঞ্জ উপজেলায় ২০২৪ সালের পর মাত্র ১৫ কিলোমিটার সড়ক পাকাকরণের কাজ চলছে। উপজেলাটিতে এখনও কাঁচা সড়ক রয়েছে ৭৩২ কিলোমিটার।

রংপুর সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আজম আলী বলেন, ২০২৪ সালের পর সিটি করপোরেশন এলাকায় সড়ক বা অবকাঠামোগত তেমন উন্নয়ন হয়নি। সম্প্রতি ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। তা দিয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করা হবে।

রংপুর নাগরিক কমিটির নেতা আব্দুল জব্বার সরকার বলেন, অতীতের সব সরকারের আমলে বৈষম্য ও উন্নয়নবঞ্চিত ছিল রংপুর। এখনও আছে।

পুলিশের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক
চব্বিশের ১৬ জুলাইয়ের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, ৫ আগস্টের পর পুলিশের প্রতি আস্থা ফেরানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। নগরের বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘পুলিশের আচরণে কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও ভয় কাজ করে। আমরা চাই, পুলিশ রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে কাজ করুক।’

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার মারুফ হোসেন বলেন, ‘৫ আগস্টের পরে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষ আস্থা হারালেও এখন তা ফিরেছে। পুলিশ জনগণের বন্ধু হবে, এ লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।’

ক্ষমতা বদলেছে, রাজনীতি কি বদলেছে
বদরগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মেছের উদ্দিন বলেন, রাজনীতিতে মুখ বদলেছে; কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির মৌলিক পরিবর্তন কতটা হয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। দখল, প্রভাব বিস্তার ও প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।

রংপুরের বাসিন্দা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মেহেদি হাসিন বলেন, গণতান্ত্রিক সমাজে নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি আইনের অপব্যবহারও বন্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় বা ভিন্নমতের কারণে কোনো নাগরিক যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করা না গেলে পরিবর্তন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

বেরোবির জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ত্বহা হোসাইন বলেন, উন্নয়নে এখনও বৈষম্যের শিকার রংপুর। অনেকেই আশা করেছিলেন, আবু সাঈদের আত্মত্যাগের বিষয়টি দেশ-বিদেশে গুরুত্ব পাওয়ায় রংপুরে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হবে। শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব ঘুচবে। কিন্তু কোনোটাই গুরুত্ব পায়নি।

রংপুরের প্রবীণ নাগরিক আবদুল হালিম বলেন, ‘আবু সাঈদ নিজের জন্য জীবন দেননি। তিনি এমন এক সমাজের জন্য জীবন দিয়েছেন, যেখানে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে। এখন যদি আবার মানুষ কথা বলতে ভয় পায়, তাহলে পরিবর্তনের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।’ চ্যানেল 24




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD