দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক মাদকাসক্তদের হাতে পরিবারের সদস্য খুন হচ্ছেন। মাদক কারবারে দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে খুনোখুনি, হামলার ঘটনাও ঘটছে। গত ১ থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত ১৩ জন খুন হয়েছেন। হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে পাঁচজনকে। এ ছাড়া মাদকাসক্ত এক যুবক গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। ১৩ খুনের মধ্যে মাদকাসক্ত ছেলের হাতে তিনজন বাবা ও দুই মা নিহত হন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনসূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আইনজীবী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়; পরিবারকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। একজন মাদকসেবীর কারণে অশান্তিতে থাকে পুরো পরিবার। নেশার টাকা জোগানো, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুনের মতো গুরুতর অপরাধে জড়ায় অনেক আসক্ত। ধর্ষণসহ বিভিন্ন সহিংস অপরাধের ঘটনায় তদন্তে অনেক ক্ষেত্রে মাদক সেবনের সংশ্লিষ্টতা উঠে আসে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ (আইস), কুশ, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক রাজধানী ও বড় শহর ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত গ্রামেও সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। এতে সামাজিক ও পারিবারিক কলহও দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।
দেশে বর্তমানে ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো মাদক ব্যবহার করছে, যা মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। তাদের অধিকাংশই তরুণ। সম্প্রতি জাতীয় পর্যায়ের এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য বলছে, গত জুনে খুন, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগে সারাদেশে ১৮ হাজার ৮২০টি মামলা হয়। এর মধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলার সংখ্যা ছয় হাজার ৫৮০টি, যা মোট মামলার প্রায় ৩৫ শতাংশ।
কারা অধিদপ্তর সূত্র বলছে, ২৯ জুলাই দেশের সব কারাগার মিলিয়ে বন্দি ছিল ৯৩ হাজার ৪৪০ জন। এর মধ্যে মাদক-বিষয়ক মামলায় বন্দি ১৭ হাজার ৮১৯ জন, যা মোট বন্দির ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষ ১৭ হাজার ২২৬ জন, নারী ৫৯৩ জন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে চারটি এবং বেসরকারি ৩৮৫টি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে এসব মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র থেকে ২১ হাজার আটজন মাদকাসক্তকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, মাদকাসক্ত সন্তান কিংবা স্বামী পরিবারের সদস্যদের নির্যাতন ও মানসিক অশান্তি সৃষ্টি করছে। ফলে অনেক পরিবারে সম্পর্কগত সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। যে সংকট পরিবারে ভাঙন তৈরি করছে। একই সঙ্গে মাদকের অর্থ সংগ্রহে মাদকাসক্তদের একটি বড় অংশ চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা অপরাধে জড়াচ্ছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় মাদক প্রবেশ ও সহজলভ্যতা রোধ এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে মাদকাসক্তির মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, মাদকবিরোধী অভিযানে অনেকে গ্রেপ্তার হচ্ছেন; আবার তারা জামিনে বেরিয়ে একই কাজ করছেন। তিনি বলেন, মাদক আসে দেশের বাইরে থেকে। সে ক্ষেত্রে সীমান্তে যারা আছে, তাদেরও দায়-দায়িত্ব অনেক। চালানগুলো কীভাবে আসে, সেগুলো দেখা দরকার। আবার দেশের ভেতরেও সেভাবে রোধ করা যাচ্ছে না।
মাদক ঘিরে খুন
গত ৩০ জুলাই ফরিদপুরের বায়তুল আমান এলাকায় মাদক কেনার টাকা না পেয়ে মা সাহেলা বেগমকে খুন করে তাঁর ছেলে আব্দুর রহিম শেখ। প্রায় ১০ বছর আগে রহিম সৎমাকেও খুন করেছিল। ২৭ জুলাই সাভারের রাজফুলবাড়িয়ার ছাকিপাড়ায় মহিন মিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করে তাঁর কিশোর ছেলে। ২৫ জুলাই চট্টগ্রামের আনোয়ারায় মাদকাসক্ত ছেলে রিমন দাশগুপ্তের ছুরিকাঘাতে মা-বাবা নিহত হন। ৩ জুলাই পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে মাদকাসক্ত ছেলে তাপস দেবনাথ শিলপাটা দিয়ে আঘাত করে ঘুমন্ত বাবা উত্তম দেবনাথকে খুন করে। মাদক কেনার টাকা না পেয়ে গত ১২ জুলাই রাতে গাজীপুরের শ্রীপুরে গার্মেন্টকর্মী স্ত্রী নাছিমা আক্তারকে কুপিয়ে হত্যা করে সাহেদুল ইসলাম।
এ ছাড়া মাদক নিয়ে বিরোধের জেরে ২২ জুলাই যশোর শহরের বারান্দীপাড়া ফুলতলা মোড়ে শরিফুলকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ১৬ জুলাই নোয়াখালীর কবিরহাটে মাদক নিয়ে পূর্বশত্রুতার জেরে মোহাম্মদ ফারুক নামে এক ব্যক্তি খুন হন।
এদিকে মাদক ঘিরে গত ২১ জুলাই রাজধানীর হাজারীবাগ, ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ, ১৭ জুলাই কুষ্টিয়ার খোকসার দেবীনগর, ৪ জুলাই নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকা এবং ১ জুলাই চট্টগ্রামের পাঁচলাইশের মুরাদপুরে একজন করে খুন হন।
চাঞ্চল্যকর হত্যা
মাদকাসক্তির কারণে দেশের চাঞ্চল্যকর হত্যার অন্যতম ২০১৩ সালের আগস্টে রাজধানীর চামেলীবাগের পুলিশ দম্পতি খুন। মাদকাসক্ত মেয়ে ঐশী রহমানের হাতে খুন হন পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না রহমান। মা-বাবা হত্যার দায়ে ঐশী এখন কারাবন্দি। বিচারিক আদালত প্রথমে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে উচ্চ আদালত সেই সাজা কমিয়ে ঐশীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
এক মায়ের আর্তনাদ
চার সন্তানের মধ্যে বড় ও মেজো ছেলে প্রায় সাত বছর ধরে ইয়াবায় আসক্ত। কর্মহীন এ দুই ভাই একসঙ্গে মাদক সেবন করে। ইয়াবা কেনার টাকা না পেলেই ব্যবসায়ী বাবা ও সরকারি চাকরিজীবী মায়ের ওপর চালাত নির্যাতন। মাদকের টাকার জন্য শুধু ঘরের আসবাবই নয়; দরজাও খুলে বিক্রি করে। নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে তারা। দুই ছেলের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে দুই বছর আগে তাদের বাবা বাড়ি ছেড়ে চলে যান।
গত ৮ জুলাই তারা মায়ের কাছে ১৩ হাজার টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ঘরের আসবাব ভাঙচুর করে মাকে হত্যার হুমকি দেয়। নিরুপায় হয়ে প্রতিবেশীদের সহায়তায় দুই ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দেন অসহায় মা। এরপর ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন। ঘটনাটি ঘটে গত ৯ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে।
গত ২৯ জুলাই ওই মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমকাল। তিনি বলেন, দুই ছেলেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে অনেক চেষ্টা করেছি। আমার সাজানো-গোছানো সংসার তারা তছনছ করে দিয়েছে।
এদিকে গত ৩০ জুলাই জামালপুরের বকশীগঞ্জে মাদকাসক্ত ছেলে নাহিদ মিয়াকে পুলিশে দেন এক বাবা। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত ওই যুবককে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন।
মাদকের কারণে ভাঙছে সংসার
স্ত্রী ও শিশুসন্তান নিয়ে রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন রিকশাচালক মো. শাকিল। হেরোইনে আসক্ত হওয়ার পর রিকশা চালানো এক রকম ছেড়েই দেন। তিন মাসের বাসা ভাড়া বকেয়া থাকায় হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যান শাকিল। তখন দেড় বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে মোহাম্মদপুরে রায়েরবাজারের রিকশাচালক বাবার বাসায় ওঠেন স্ত্রী ফারজানা আক্তার সাথী। তিন মাসের মধ্যে শাকিল স্ত্রীর খোঁজ নেননি। গত ২৫ জুলাই ধানমন্ডির একটি পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে শাকিলের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে জানায় পুলিশ।
অটোরিকশা ছিনিয়ে নিতে বন্ধুকে খুন
মানিকগঞ্জের কালীগঙ্গা নদী থেকে গত ২৫ মার্চ অটোচালক রফিক মিয়ার মাথাহীন লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। আগের দিন অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। হত্যা মামলার তদন্তে নেমে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। আসামিরা পুলিশের কাছে স্বীকার করেন, তাদের কাছে মাদক কেনার টাকা ছিল না। তাই বন্ধু রফিকের অটোরকিশা ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন তারা। পরে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে রফিককে কালীগঙ্গা নদীর তীরে ডেকে নিয়ে যান। রফিক বুঝতেই পারেননি, বন্ধুত্বের নামে তারা তাঁর জীবন কেড়ে নেবেন। গলা কেটে হত্যার পর নদীতে লাশ ফেলে রিকশা নিয়ে পালিয়ে যান তারা। সমকাল
দীর্ঘদিন ধরে মাদক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ৪০৬ জন মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে একযোগে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। পুলিশ সদরদপ্তরের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে এ কার্যক্রম শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মানি লন্ডারিং ইউনিট।
অভিযুক্ত ব্যক্তি ও তাদের স্বজনের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও ব্যাংক লেনদেনের তথ্য খুঁজে বের করা হচ্ছে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে পৃথকভাবে চারটি সংস্থাকে চিঠি দিয়েছে সিআইডি। একসঙ্গে মাদক-সংশ্লিষ্ট এত সংখ্যক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের ঘটনা এই প্রথম। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীদের ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্য পেতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) চিঠি দিয়েছে সিআইডি। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে চিঠি দিয়ে চাওয়া হয়েছে সম্পদের হিসাব। সংশ্লিষ্ট থানার ওসির কাছে লিখিত পত্র দিয়ে অভিযুক্তদের ব্যাপারে তথ্য দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া অভিযুক্তদের জাতীয় পরিচয়পত্র চাওয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশনের কাছে।
সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন বলেন, অনেকের কাছে মাদক অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। দ্রুত অর্থবিত্তের মালিক হওয়া যায়। অনেক কাজের মধ্যে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি আমাদের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। সমাজে অনেক অপরাধের মূল কারণ মাদক। কোনো পরিবারে একজন মাদকাসক্ত থাকলে তার ক্ষতি কী, তা ওই পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পারেন।
তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের অবৈধ অর্থ ও সম্পত্তির উৎস সন্ধান করা এবং এ-সংক্রান্ত অর্থ পাচারের তদন্ত করা সিআইডি শিডিউলভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ বিষয়ে আমরা খুব সিরিয়াস। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে নতুন যে আইন হয়েছে, তাতে আশা করি, আরও কার্যকর ও শক্তভাবে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
কয়েক যুগ ধরেই মাদক দেশের অন্যতম প্রধান সামাজিক সমস্যা। এটি অন্যতম জাতীয় সমস্যা হিসেবেও চিহ্নিত। সর্বশেষ ১৩ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও মাদক ও জুয়াকে দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে এগুলো নির্মূলে কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। একাধিক সংসদ সদস্য নিজ নিজ এলাকায় মাদক সমস্যার ভয়াবহ চিত্রের তথ্য তুলে ধরে সংসদ অধিবেশনে বক্তব্য দেন।
সিআইডি চারশর বেশি মাদক ব্যবসায়ী ও পৃষ্ঠপোষকের বিরুদ্ধে যে অনুসন্ধান শুরু করেছে, সেই তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এদের সবার নেটওয়ার্ক ঢাকাকেন্দ্রিক। সবার বিরুদ্ধে অন্তত চারটি মামলা আছে। কারও কারও বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ২০ থেকে ৪৭। এ তালিকায় নারী মাদক ব্যবসায়ীও রয়েছেন। সিআইডির চিঠির জবাবে এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ীর ব্যাপারে ওসিদের পক্ষ থেকে তথ্য দেওয়া হয়েছে। এসব তথ্য এখন যাচাই করে দেখা হচ্ছে।
তালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি মামলা রয়েছে ভাটারার রাজু আহমেদের– ৪৭টি। এরপরই রয়েছে ভাসানটেকের মো. রূপচানের– ৪৩টি। এ ছাড়া শাহজাহানপুরের মো. সোহেলের বিরুদ্ধে মতিঝিল ও শাহজাহানপুর থানায় ২৭টি মামলা রয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে এসব মামলা হয়েছে। সোহেল বর্তমানে পলাতক। তিনি এলাকায় ‘কানা সোহেল’ নামে পরিচিত। এ ছাড়া খিলগাঁওয়ের পূর্ব গোড়ানের বাসিন্দা মো. খালেদ মিয়ার বিরুদ্ধে ২১টি মামলা রয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে এসব মামলা হয়েছে। সর্বশেষ তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এ বছরের ১১ মার্চ খিলগাঁও থানায়। এ ছাড়া খিলগাঁওয়ের ত্রিমোহনী এলাকার মাদক ব্যবসায়ী মাইন উদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ১৪টি। গত আট বছরে তাঁর বিরুদ্ধে এসব মামলা হয়েছে। সর্বশেষ তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে গত ৯ জানুয়ারি।
তালিকায় থাকা রাজধানীর মুগদা এলাকার মাদক ব্যবসায়ী মো. লালনের বিরুদ্ধে মামলা আছে ২২টি। তাঁর গ্রামের বাড়ি ভোলার ইলিশায়। বর্তমানে তিনি পলাতক। সর্বশেষ ৩ জুন পল্টন থানায় লালনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে। এ ছাড়া সবুজবাগের উত্তর বাসাবোর বাসিন্দা মো. নুরুন্নবীর বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা রয়েছে। তাঁর গ্রামের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের দাতপুরে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বর্তমানে নুরুন্নবী তাঁর পাশের একটি জেলায় আত্মগোপনে আছেন। তিনি সবুজবাগে ‘টেস্টি বাবু’ হিসেবে পরিচিত। সবুজবাগের আরেক বড় মাদক ব্যবসায়ী হলেন মো. শামীম। রমনা, সবুজবাগ, ওয়ারী, মুগদা, খিলগাঁও থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা আছে ১৬টি। জামিন পেয়ে বর্তমানে পলাতক শামীম।
বড় মাদক ব্যবসায়ী ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সিআইডির অনুসন্ধানের তালিকায় আরও রয়েছেন হাজারীবাগের মো. সুমন, আজগর আলী ও ফালান শিকদার। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ১০টির বেশি মামলা আছে। এ তালিকায় কামরাঙ্গীরচরের মনির হোসেন, খুরশিদা বেগম খুশি, সিদ্দিক মিয়া ও হাসির নাম আছে। সিদ্দিক মিয়ার বিরুদ্ধে ২৪টি মামলা আছে। খুরশিদা ইয়াবা, গাঁজা ও হেরোইন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাঁর বিরুদ্ধে নিউমার্কেট ও কামরাঙ্গীরচর থানায় ১৪টি মামলা রয়েছে।
কোতোয়ালি এলাকার মন্টি কুমার নাথ, সাইফুল ইসলাম সাগর, নূরে আলম, ইমরান, অসিত নন্দী, শম্ভুনাথ সুর ও জিতু চন্দ্র দাসের নাম আছে। শম্ভুনাথ সুরের বিরুদ্ধে মামলা আছে ২০টি। তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম মামলা হয়েছে কোতোয়ালি থানায় ২০১২ সালের ৩০ মে। এ হিসাবে তিনি ১৬ বছর ধরে মাদক ব্যবসায় জড়িত। শম্ভুর বিরুদ্ধে সর্বশেষ মামলা হয়েছে ২০২২ সালের ২০ ডিসেম্বর কোতোয়ালি থানায়। এ ছাড়া কোতোয়ালির অসিত নন্দীর বিরুদ্ধে মামলা আছে ১৯টি।
চকবাজারের তারা মিয়া ও মো. রতনের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। লালবাগ এলাকার মো. বাবুল, শাকিল ও মো. আসাদের নাম আছে। বংশালের বিল্লাল হোসেন শাওন, শ্যামপুরের দিনার কাজল, মো. শহিদ, মিরপুরের শাহ আলীবাগের মোছা. বকুলী, ভাটারার রুবেল মিয়া, রাজু আহমেদ, খিলক্ষেতের আক্তার হোসেন, বনানীর জিল্লুর রহমান, ভাসানটেকের মো. বাবুল, মোরশেদা বেগম, কাফরুলের মাহবুবুর রহমান, রূপনগরের সালেহা বেগম, বাড্ডার সাতারকুলের হোসনা আক্তার, মোহাম্মদপুরের ভুঁইয়া সোহেল ওরফে বুনিয়া সোহেল, মনু ওরফে গলাকাটা মনু, মো. সারফু আরমান, আনোয়ার হোসেন কাল্লু, সেলিম, আরিফুল ইসলাম, শেরেবাংলা নগরের শুক্কুরের নাম আছে।
তালিকায় আরও রয়েছেন হাজারীবাগের মো. সুমন, নিপা আক্তার, লাকি, আবুল কালাম, মানিক, আসাদ মিয়া, সোনিয়া বেগম, মমিন মিয়া, আজগর আলী, আবদুস সামাদ, বশির, সালমা আক্তার, সজল, কামরাঙ্গীরচরের মনির হোসেন, আরমান, নওয়াব আলী, ইয়াকুব আলী, মোশাররফ হোসেন, টুটুল হোসেন, আবদুর রহমান, রহমত উল্লাহ, মন্টি কুমার নাগ, কোতোয়ালি এলাকার সাইফুল ইসলাম, পারুল রানী, মনির হোসেন, নূরে আলম, ইমরান, সুফিয়া বেগম, রানা কুমার নাগ, মাইনুদ্দিন, মো. আকরাম, মো. আজিম, মো. জীবন, সাজন প্রসাদ, চকবাজারের আরমান হোসেন, তারা মিয়া, মো. শাহিন, রেজাউল, লালবাগের মো. তুহিন, শাওন, স্বপন, রোজিনা আক্তার, মো. শাকিল, মো. মিজান, মামুন মিয়া, মো. আরিফ, মো. জুয়েল, হায়দার হোসেন, রোজিনা বেগম, হোসেন উদ্দিন ও মো. খলিল।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী, দুর্নীতিগ্রস্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য, অসাধু রাজনৈতিক নেতাকর্মী মাদক ব্যবসায় যুক্ত। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মাদক নেটওয়ার্কে এমন একটি শক্তিশালী চক্র বিস্তৃতি লাভ করেছে।
ভয়াবহতা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে, তবে তা এখনও অপ্রতুল। শহর এলাকা ছাড়িয়ে মাদক এখন তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে গেছে এবং তরুণরা ব্যবহার করছে। দেশে মাদকের ‘প্রবেশদ্বার’ হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার-চট্টগ্রাম। এ ছাড়া বিভিন্ন সীমান্ত হয়ে মাদক ঢুকছে। আবার পর্যটন এলাকা হিসেবে খ্যাত কক্সবাজার দীর্ঘদিন ধরে মাদকের প্রধান রুট। মিয়ানমার থেকেও প্রতিদিন ঢুকছে ইয়াবা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মাদক সেবন, ব্যবসা ও পাচারের দিক থেকে বাংলাদেশ অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশে পরিণত হয়েছে।
অনুসন্ধানের তালিকায় থাকা চারজনের মোবাইল ফোনে কল করেও তাদের পাওয়া যায়নি। কামরাঙ্গীরচরের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী খুরশিদা বেগমের তিনটি ফোন নম্বর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে দুটি বন্ধ। একটি নম্বরে কল দিলে একজন রিসিভ করে দাবি করেন, তিনি খুরশিদা নামে কাউকে চেনেন না।
পুলিশ সদরদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত মাসে সারাদেশে মাদকদ্রব্য উদ্ধারজনিত মামলা হয়েছে ছয় হাজার ৩৮৩টি। খুন, ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই, নারী-শিশু নির্যাতন, অপহরণসহ সব ধরনের অপরাধে জুলাইয়ে মামলা হয়েছে ১৭ হাজার ৯১১টি। এ হিসাবে জুলাই মাসের মোট মামলার ৩৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ মাদক-সংক্রান্ত।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে সারাদেশে সব ধরনের অপরাধের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৫ হাজার ৩৮৯টি। এর মধ্যে মাদক-সংক্রান্ত মামলা চার হাজার ৬৫৮টি। এ হিসাবে মোট মামলার ৩০ শতাংশ মাদক-সংক্রান্ত।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৯ থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রায় তিন কোটি ৬১ লাখ ইয়াবা, ২৫০ কেজি হেরোইন, ২২ কেজি কোকেন, আট কেজি আফিম, ৮২ হাজার ২৭৫ কেজি গাঁজা এবং পাঁচ লাখ ৫১ হাজার ৭৮৮ বোতল ফেনসিডিল জব্দ করেছে সংস্থাটি। সমকাল