মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৭ অপরাহ্ন




পথের কাঁটা হাসিনা

থমকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:১৮ am
Bangladesh–India বাংলাদেশ-ভারত Bangladesh India বাংলাদেশ ভারত
file pic

বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশই সম্পর্কের উন্নয়নের কথা বলছে। কিন্তু ঘুরেফিরে ‘শেখ হাসিনা’ ইস্যুতে এসেই আটকে যাচ্ছে দুই দেশের হিসাবনিকাশ। চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে বসে আর কোনো রাজনৈতিক বা উসকানিমূলক বক্তব্য দেবেন না বলে দেশটির পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এরপরও আস্থার সংকট এখনো কাটেনি। কারণ, ভারত হাসিনাকে ব্যবহার করে আবারও নতুন কোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করে কি না, এ নিয়ে ঢাকায় সংশয় আছে। বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট বাংলাদেশের আপত্তি সত্ত্বেও শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে রাজনৈতিক বক্তব্যের সুযোগ দেওয়া এবং ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণের চিঠিতে তারেক রহমানকে ‘প্রধানমন্ত্রী’ সম্বোধন না করায় এ সংশয় আরও গভীর হয়েছে।

বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে সোমবার ভোলায় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের (বীরবিক্রম) দেওয়া বক্তব্যে। তিনি বলেছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক রাখা প্রয়োজন হলেও এখন পর্যন্ত দেশটির পক্ষ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। কেবল কূটনৈতিক পর্যায়ে কথাবার্তা চলছে। তিনি বলেন, পতিত সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া এবং সেখানে বসে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া সৎ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ নয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশেরও কিছু রিজার্ভেশন বা আপত্তি রয়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি এও বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একজন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে সঠিক মর্যাদা দিয়ে ভারত আমন্ত্রণ জানায়নি।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, সরকারের এমন মনোভাবের কারণেই মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু ভারত ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা হাসিনাকে ফেরত দেবে না। তিনি নিজে থেকে চাইলে দেশে যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়ার আসলে কী হবে, ভারত এতে সহায়তা করবে কি না-সে প্রশ্ন থেকে যায়। বাংলাদেশের দিক থেকে বলা হয়েছে, অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্বিপাক্ষিক ভারত সফর করবেন। কিন্তু সেই পরিবেশ সৃষ্টিতেও এখনো অন্যতম বাধা ‘শেখ হাসিনা’ বলে মনে করা হচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি দেশের জনমনেও এমন ভাবনাই ঘুরপাক খাচ্ছে। কেউ কেউ এমনও বলছেন, হাসিনা ভারতের ‘ট্রাম্প কার্ড’।

তবে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির যুগান্তরকে বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে শেখ হাসিনা ইস্যুটি একটি বড় অন্তরায় হলেও এটিই একমাত্র বাধা নয়। এ সংকট নিরসনে উভয় পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো আলোচনা বা কূটনৈতিক উদ্যোগের অভাব দেখা যাচ্ছে। সমস্যার সমাধান হিসাবে তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাহস এবং সদিচ্ছার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে বলেন, শেখ হাসিনার বিচারিক প্রক্রিয়া, জনমনে ক্ষোভ এবং কূটনৈতিক জটিলতা কাটিয়ে উঠতে শীর্ষ পর্যায়ের সংলাপ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। শেষ পর্যন্ত জাতীয় স্বার্থরক্ষায় দুই দেশের নেতৃত্বকে কৌশলগত এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘শেখ হাসিনা’ ইস্যুই দুই দেশের সম্পর্কের উন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে হাসিনা বলছেন তিনি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন। এজন্য দু-এক জায়গায় ঝটিকা মিছিলের পাশাপাশি তার পক্ষে বিভিন্ন ‘বয়ান’ তৈরি করা হচ্ছে। অবস্থাটা এমন-তিনি ও তার দল গায়ের জোরেই বাংলাদেশে ঢুকে পড়বেন। অন্যদিকে, হাসিনা বা আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে রাজনীতি করতে পারছে কি না, সে আলোচনাও হচ্ছে। বলা হচ্ছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত দলটিকে রাজনীতি করতে দেওয়ার জন্য ভারতের পক্ষ থেকে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন চাপ রয়েছে। কিন্তু এক জাতিসংঘের হিসাবেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন; যার দায় পুরোটাই হাসিনার ওপর বর্তায়। অভ্যুত্থানে আহতও হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। এছাড়া ক্ষমতায় থাকতে তার সরকারের সময়ে শত শত মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। অভ্যুত্থানের মুখে হাসিনাসহ তার দলের অনেকে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। দেশের রাজনীতিতে আলোচনা হলো-ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের তথা রক্তস্নাত অধ্যায়ের পর ভোটের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের সরকার দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। এখন তাই শেখ হাসিনা ও তার দলের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিচারই মুখ্য আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার চাইলেও হাসিনা বা নিষিদ্ধ ঘোষিত দলটিকে রাজনীতির মাঠে আনা সম্ভব হচ্ছে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে দেশের কিছু জায়গায় পতিত আওয়ামী লীগের কর্মীদের মিছিল দেখা গেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার সুযোগ এবং শেখ হাসিনার দেশে ফিরে রাজনীতি করা-দুটিই বর্তমান পরিস্থিতিতে এক বিষয় নয়। কারণ, আগে শেখ হাসিনা যে গণহত্যা চালিয়েছে তার বিচার হতে হবে। তাই চাইলেই শেখ হাসিনা রাজনীতিতে ফিরতে পারবেন না। এমনকি ভারত চাইলেও সম্ভব না। কারণ, শেখ হাসিনা রাজনীতিতে ফিরতে চাইলে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি ছাড়াও জনগণের বড় একটি অংশ ক্ষুব্ধ হবে।

তবে শুধু শেখ হাসিনা ইস্যুতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থবির থাকতে পারে না বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ। যুগান্তরকে তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থবির হয়ে থাকাটা কূটনৈতিক অদূরদর্শিতার লক্ষণ। তার মতে, পরিবেশ স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় হাত গুটিয়ে বসে না থেকে বরং নিজেদের উদ্যোগে আলোচনার পথ প্রশস্ত করা জরুরি।

তিনি বলেন, বিশেষ করে গঙ্গা পানিচুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে অগ্রগতি নিশ্চিত করতে ভারতের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন করা প্রয়োজন। যথাযথ পদক্ষেপের অভাবে সম্পর্ক আরও শীতল হলে তা বাংলাদেশের জন্য অধিক ক্ষতিকর হতে পারে। মূলত, পারস্পরিক আদান-প্রদান বৃদ্ধির মাধ্যমেই দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান অচলাবস্থা নিরসনের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলেন, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দুই দেশের টানাপোড়েনের একটি দৃশ্যমান কারণ হলেও এটিই একমাত্র বা প্রধান সংকট নয়। বিশ্বরাজনীতির পরিবর্তনশীল একটি প্রেক্ষাপট দেখা যাচ্ছে এবং বাংলাদেশ তার অংশ। এই পরিবর্তনের অন্যতম দিক ডানপন্থার উত্থান। এই উত্থানের সঙ্গে ভারতের বর্তমান সরকারের সমীকরণ এখনো পুরোপুরি মেলেনি। শেখ হাসিনা যদি ভারতে না থেকে দেশেও থাকতেন, তবুও ভারতের সঙ্গে এ টানাপোড়েন চলত। গবেষক ও লেখক আলতাফ পারভেজ শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের চেয়ে দুই দেশের সম্পর্কের অন্তরায় হিসাবে উভয় রাষ্ট্রের উগ্রপন্থি বা দক্ষিণপন্থি অভিজাত শ্রেণির নেতিবাচক ভূমিকাকে দায়ী করেছেন। তার মতে, এই প্রভাবশালী গোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ ও দূরত্ব বজায় রাখতে চায়। অথচ সীমান্তের সাধারণ মানুষ এবং দরিদ্র সমাজ সব সময়ই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যাতায়াতব্যবস্থার উন্নয়ন প্রত্যাশা করে।

(যুগান্তর)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD