ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) এক বছরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে নিজেদের কার্যক্রম ও অর্জনের খতিয়ান তুলে ধরেছে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের’ নেতারা।
বৃহস্পতিবার ডাকসু ভবনের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক বছরের বিভিন্ন উদ্যোগ ও অর্জনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অসহযোগিতা এবং বাজেট না পাওয়ার অভিযোগ করেন তাঁরা।
শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পুরো বছর কাজ করেছেন এবং এক বছরের কাজকে ৪১টি খাতে ভাগ করে হাজারের বেশি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম।
সাদিক কায়েম বলেন, হলের আবাসনসংকট সমাধান, রিডিং রুম আধুনিকায়ন, অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের পরিবহন সমস্যা নিরসন ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচি, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধ সেল, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়ন, ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্নতা এবং বহিরাগত নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সাদিক কায়েম বলেন, ডাকসুর ইতিহাসে এবার রেকর্ডসংখ্যক, প্রায় তিন ডজন (৩৬টি) প্রকাশনা বের করা হয়েছে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সাদিক কায়েম বলেন, পুরো বছর কাজ করতে গিয়ে তাঁরা প্রশাসনের কাছ থেকে ‘বিমাতাসুলভ’ আচরণ পেয়েছেন। ডাকসুর নির্ধারিত বাজেট দেওয়া হয়নি। এমনকি খরচের সঠিক হিসাবও ডাকসুর প্রতিনিধিদের সরবরাহ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অসহযোগিতার বিষয়টি ডাকসু নেতাদের নিজস্ব বক্তব্য উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী প্রথম আলোকে বলেন, ‘তারা (ডাকসু নেতারা) যখন আমাদের কাছে এসেছে, আমরা সব কাজেই সহযোগিতা করেছি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অসহযোগিতা করা হয়নি; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম মেনে এবং বিধি অনুযায়ী কাজ করার জন্য আমরা তাদের পরামর্শ দিয়েছি। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে তারা হয়তো আমাদের ভুল বুঝতে পারে।’
সহ-উপাচার্য আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী আরও বলেন, তারা হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে তাদের মতো করে কাজগুলো করতে চেয়েছে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কিছু বিধি-বিধান ও নিয়মের মধ্যে চলে। কোনো ব্যক্তি বা কোনো দলের আদর্শ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় না। সে ক্ষেত্রে নিয়ম মানার জন্য তাদের হয়তো কোনো কোনো পর্যায়ে, কোনো কোনো জায়গায় অপেক্ষা করতে হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে যেকোনো কাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সব সময়ই আন্তরিক ছিল।
এদিকে সংবাদ সম্মেলনে পরবর্তী নির্বাচন প্রসঙ্গে সাদিক কায়েম বলেন, ১৪ সেপ্টেম্বর মেয়াদের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর নতুন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আহ্বান জানানো হলেও প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। উপাচার্য ও ডাকসু সভাপতির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ সভায় নতুন নির্বাচনের রূপরেখা ও তফসিলের দাবি প্রথম এজেন্ডা হিসেবে তোলা হলেও তা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
সাদিক কায়েম বলেন, নব্বই-পরবর্তী সময়ে যেভাবে ছাত্রসংসদ নির্বাচন বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠ স্তব্ধ করা হয়েছিল, বর্তমান সরকারও সেই পথ অনুসরণ করতে পারে। তবে নব্বইয়ের সেই রাজনৈতিক চর্চা এখন আর চলবে না। অবিলম্বে পরবর্তী ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ও রূপরেখা ঘোষণার দাবি জানান তিনি।
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে ১৪ হাজার ৪২ ভোট পেয়ে সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন সাদিক কায়েম। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ১০ হাজার ৭৯৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন এস এম ফরহাদ এবং সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে ১১ হাজার ৭৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হন মহিউদ্দীন খান। শীর্ষ তিন পদের বাইরে ডাকসু ও হল সংসদের প্রায় বেশির ভাগ পদেও শিবির-সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা জয়ী হন। গত বছর ১৪ সেপ্টেম্বর তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেন।
প্রেজেন্টেশনে দেখানো বছরব্যাপী কার্যক্রমের মধ্যে ছারপোকা দমনে ব্যয় হয়েছে ৩২ লাখ টাকা। শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. মোহাম্মদ মোর্তজা মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকায়নে খরচ হয়েছে ৩ কোটি টাকা, কেন্দ্রীয় মসজিদ সংস্কারে খরচ ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। পাশাপাশি নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক জিমনেসিয়াম বানাতে খরচ হয়েছে ৬৫ লাখ টাকা এবং এ ছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ হল সংস্কারে ৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা আদায়ের কথাও জানানো হয়েছে প্রেজেন্টেশনে।
সমাজসেবা সম্পাদকের ৩৫ কোটি টাকার কাজের দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডাকসু যে কাজ করেছে তা ৩৫ কোটি টাকার চাইতেও অনেক বেশি। তবে প্রশাসনের বাধার কারণে আমরা অনেক কাজই করতে পারিনি।
কার্যবিবরণী অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে মোটরসাইকেল ও গাড়ি চালনা প্রশিক্ষণ, হলভিত্তিক প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ এবং বিনামূল্যে স্পোকেন ইংলিশ কোর্সের আয়োজন করা হয়েছে। গবেষণা বিষয়ে কর্মশালা, গবেষণা প্রস্তাবনা তৈরির প্রশিক্ষণ, বৃত্তি ও উচ্চশিক্ষা বিষয়ক সেশন এবং শিক্ষা এক্সপোসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও আয়োজন করা হয়। পরিবহন খাতে শনিবার বাস সার্ভিস চালু, বিভিন্ন রুটে সন্ধ্যার ট্রিপ, নারী হলগুলোর জন্য বাস এবং সাপ্তাহিক ঢাকা-কুমিল্লা বাস সার্ভিস চালুর কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও রুট বৃদ্ধির বিভিন্ন উদ্যোগের তথ্যও দেয়া হয়েছে।
কার্যক্রমের বিরবরণ দিয়ে ‘খতিয়ান’ নামে একটি বই প্রকাশ করেছে ডাকসু। বইয়ের একটি বড় অংশে বাস্তবায়ন না হওয়া বা আটকে থাকা বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইসিটি বিভাগের সহযোগিতায় কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ, সার্টিফিকেশন সহায়তা, ইনোভেশন হাব ও চাকরি মেলার মতো ছয়টি উদ্যোগ আটকে রয়েছে।
এ ছাড়া মাঠ সংস্কার ও ডিজিটাল সেবা, হলের ভর্তুকি মূল্যে খাবার, ডাকসু ক্যান্টিন সংস্কার, পুকুরপাড় সৌন্দর্যায়ন, ওয়াকওয়ে ও আলোকসজ্জাসহ স্থানীয় সরকার বিভাগ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রকল্পও বাস্তবায়িত হয়নি।
কাজী মোতাহার হোসেন ভবনের ক্যান্টিন, টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বিন, মোবাইল টয়লেট, নতুন যানবাহন সংগ্রহ এবং বিভিন্ন হলের অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ আরও কয়েকটি উদ্যোগ আটকে থাকার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুদান বিতরণ, নারী শিক্ষার্থীদের জিমনেসিয়াম চালু এবং কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ সংস্কার নিয়েও বইয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়।