২০০৫ সালের আগেস্টে হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে শুরু। সেই থেকে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে ২১ বছর ধরে স্বপ্ন দেখিয়েছেন, অসংখ্য রাতকে রাঙিয়েছেন। সেই জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নেমে আবেগ সামলাতে পারলেন না লিওনেল মেসি। কিংবদন্তি এ ফুটবলারের চোখের কোণে দেখা গেল জল।
বেনিনের বিপক্ষে মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে ম্যাচ দিয়ে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সঙ্গে তার গল্পের শেষ অধ্যায় লিখে ফেলার আগ মুহূর্তে আবেগ লুকাতে পারেননি এই মহাতারকা। ম্যাচের আগে থেকে শুরু করে মাঠের ভেতরেও বারবার ফুটে উঠেছে তার আবেগ, কখনো চোখের জলে, কখনো তৃপ্তির হাসিতে। সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি আসে আর্জেন্টিনার জাতীয় সংগীতের সময়। সতীর্থ ও কোচ লিওনেল স্কালোনির মতো মেসির চোখেও তখন জল। আবেগ সামলানোর চেষ্টা করলেও চোখের পানি আটকে রাখতে পারেননি আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিধারী। মাথা উঁচু করে সামনে তাকিয়ে ছিলেন তিনি, পাশে ছিল ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের পতাকা।
তবে চোখের জল সামলে সেই বিশেষ মুহূর্তটাকে উপভোগও করেছেন তিনি। গ্যালারিজুড়ে তার জন্য তৈরি হওয়া উৎসবের আবহ দেখে কয়েক সেকেন্ড থমকে ছিলেন মেসি। এরপর ঠোঁটে ফুটে ওঠে ছোট্ট, তৃপ্তির এক হাসি। স্টেডিয়ামের পথে দলের বাসে বসে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি মেসি। আর্জেন্টাইন সমর্থকদের ভালোবাসার ঢল দেখে বাসের ভেতরেই কেঁদে ফেলেন তিনি। আবেগ সামলে নেওয়ার চেষ্টা করলেও চোখের পানি থামেনি। বাইরে থাকা সমর্থকদের দিকে তাকিয়ে শুধু উষ্ণ এক হাত নেড়ে ভালোবাসার জবাব দিয়েছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।
শেষবারের মতো জাতীয় দলের হয়ে ওয়ার্ম-আপ করতে মাঠে প্রবেশের সময় দুই হাত তুলে স্টেডিয়ামের বিভিন্ন গ্যালারির দিকে অভিবাদন জানান মেসি। আর সেটুকুতেই যেন বিস্ফোরিত হয় মনুমেন্তাল। মুহূর্তেই গর্জে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম। এরপর যখন ঘোষক একে একে আর্জেন্টিনার একাদশের নাম ঘোষণা করছিলেন, তখন মেসির নাম আসতেই একসঙ্গে গর্জে ওঠে হাজারো কণ্ঠ। শেষবারের মতো ১০ নম্বর জার্সি গায়ে, শেষবারের মতো জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় এভাবে, ‘শেষবারের মতো ১০ নম্বর জার্সিতে, আমাদের অধিনায়ক, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। কিংবদন্তি লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।’
ম্যাচ শুরুর পরও থামেনি বিদায়ের আবেগ। প্রথমার্ধের ১০ মিনিটে হঠাৎ যেন ফুটবল ম্যাচের কথা ভুলে গেলেন মাঠের ২২ খেলোয়াড়। আগে থেকেই মেসির শেষ ম্যাচ উপভোগ করার কথা জানিয়েছিলেন বেনিনের ফুটবলাররা। তাই অপ্রত্যাশিত সেই বিরতিতে কয়েকজন বেনিন খেলোয়াড় এগিয়ে এসে মেসিকে শুভেচ্ছা জানান। আর গ্যালারিতে তখন অন্য দৃশ্য, পুরো মনুমেন্তাল দাঁড়িয়ে, করতালিতে শেষবারের মতো নিজেদের অধিনায়ককে অভিবাদন জানাচ্ছে।
বিদায়ী ম্যাচের জন্য অনুশীলন কমপ্লেক্স থেকে মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে আসতে সময় লাগে এক ঘণ্টার বেশি। রাস্তায় নেমে আসেন ভক্তরা। সে সময়ও মেসির চোখে দেখা যায় জল। বিশেষ জার্সি পরে সতীর্থদের সঙ্গে ওয়ার্মআপ করেন মেসি। দর্শকদের অভিবাদনের জবাব দেন তিনি। গ্যালারিতে ছিলেন তার পরিবারের সদস্যরা।
বিদায়ী ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে অবশেষে নীরবতা ভেঙেছেন মেসি। আর্জেন্টিনার মানুষের উদ্দেশে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় তিনি বলেছেন, ‘আমি শান্তিতে বিদায় নিচ্ছি। আমি সবকিছু দিয়ে চেষ্টা করেছি।’
জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির এই বিদায় শুধু একটি ম্যাচের সমাপ্তি নয়; এটি একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের শেষও। যে জার্সিতে তিনি দেখেছেন হতাশা, কান্না ও ব্যর্থতা, সেই জার্সিতেই পেয়েছেন বিশ্বচ্যাম্পিয়নের গৌরব। ২১ বছরের এই যাত্রায় আর্জেন্টিনার হয়ে অসংখ্য স্মৃতি উপহার দিয়েছেন তিনি। তার কথায় যেন সেই দীর্ঘ পথচলারই প্রতিধ্বনি।