বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ০২:০২ অপরাহ্ন




র‌্যাপিড-ইআরএফ সেমিনারে বক্তারা

বৈষম্য কমাতে প্রত্যক্ষকর বাড়ানোই প্রধান উপায়

আউটলুকবাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২২ ১১:২৫ am
Speakers at the RAPID-ERF Seminar erf র‌্যাপিড-ইআরএফ সেমিনারে বক্তারা

ক্রমবর্ধমান বৈষম্য আয় কমাতে প্রত্যক্ষকর বাড়াতে হবে। এটি প্রধান উপায় হবে। এ ক্ষেত্রে সব করযোগ্য ব্যক্তিরা আয়কর স্লাব অনুযায়ী কর প্রদান করলে জিডিপির অনুপাতে বর্তমানে ১ শতাংশ ব্যক্তি আয়কর বাড়িয়ে ৩.১ শতাংশ অর্জন করা সম্ভব হবে। এ জন্য নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যা বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে কর অব্যহতি সুবিধা বাদ দিলে জিডিপির অনুপাতে আরও ২ শতাংশ কর বাড়ানো সম্ভব।

শনিবার ‘বৈষম্য মোকাবিলা ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষকর প্রয়োগ’ শীর্ষক সেমিনারে এমন তথ্য তুলে ধরেছে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‌্যাপিড)। র‌্যাপিড এবং ইকোনমিক রিপোটার্স ফোরাম (ইআরএফ) যৌথভাবে সেমিনারের আয়োজন করে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন র‌্যাপিড চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, বাংলাদেশের কর জিডিপি অনুপাত ৯ শতাংশ, যা সারা বিশে^র তুলনায় সর্বনিম্ন। এর বড় কারণ প্রত্যক্ষকর অনেক কম। এটা বাড়াতে হবে। বর্তমানে পরোক্ষকর ৬৫ শতাংশ এবং প্রত্যক্ষকর ৩৫ শতাংশ। তবে সরকার আগামী দিনে প্রত্যক্ষকর ৭০ শতাংশ ও পরোক্ষকর ৩০ শতাংশে আনার যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি সঠিক সিদ্ধান্ত।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে দুটি সমস্যা ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং সরকারি ব্যয় জিডিপির অংশ হিসাবে অনেক কম। এর বড় কারণ প্রত্যক্ষকর কম। যদিও টাকার অংকে প্রত্যক্ষকর আগের চেয়ে বেড়েছে। তবে জিডিপির অনুপাতে ও পরিমাণের দিক থেকে বিশে^র অনেক দেশের তুলনায় অনেক কম। ভারত, ভূটান, মালয়েশিয়াসহ বিশে^র প্রায় সব দেশে প্রত্যক্ষকর থেকে সরকারের আয় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। যদিও দেশের যারা গরিব মানুষ তাদের আয়ের অনুপাতে সবচেয়ে বেশি ভ্যাট দেয়। আর বেশি আয়ের মানুষ সবচেয়ে কম ভ্যাট দিচ্ছে।

র‌্যাপিড চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও উন্নত দেশে যেতে হলে জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব আয় ২০৩০ সালের মধ্যে ১৭ শতাংশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ২১ শতাংশ করতে হবে। আর এর উল্লেখযোগ্য অংশ প্রত্যক্ষকর থেকে আসতে হবে। বর্তমানে কর নেট অনেক কম। টিনধারী ৭.৬ মিলিয়ন থাকলেও ২.৪ মিলিয়ন রিটার্ন দাখিল করছে। এর মধ্যে নামমাত্র সংখ্যক কর দেন। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে দিতে পারে সরকার। কারণ বর্তমানে মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি আছে। এর পরেও সবার কাছ থেকে ব্যক্তি আয়কর জিডিপির অনুপাতে ৩ শতাংশের বেশি অর্জন সম্ভব হবে। আবার করপোরেট কর জিডিপির অনুপাতে মাত্র ১.৪ শতাংশ। বর্তমানে ২ লাখ ৭৩ হাজার নিবন্ধিত কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১১ শতাংশ বা ৩০ হাজারের মতো কোম্পানি কর দেয়। এ ক্ষেত্রেও অনেক ঘাটতি রয়েছে। আর অনেকের সম্পদ থাকলেও মাত্র ১৫ হাজার লোক সম্পদের সারচার্য দেয়। এটা বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, করের আওতা বাড়ানোর এমন একটি পদ্ধতি আনতে হবে যেটা দিয়ে আয় বাড়াবে। যেমন বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে সোস্যাল ইন্সুরেন্স নাম্বার চালু করলে আয়-ব্যয়সহ করের হিসাব রাখা সহজ হবে। এতে কর আদায় বাড়াবে।

রাজ্জাক বলেন, যাদের কর দেয়ার ক্ষমতা আছে তারা কম দেন। সরকার অনেক খাত থেকে কর পাচ্ছে না। অপ্রচলিত খাতে প্রায় ৮০ভাগ জনশক্তি কাজ করে। আর সামর্থ থাকা সত্বেও তারা করের আওতার বাইরে আছে। এসব খাত থেকে প্রত্যক্ষকর বাড়াতে পারলে বৈষম্য দূর করতে পারবে সরকার। এছাড়া অনেক খাতেই কর অব্যহতি দেয়া আছে। এসব অব্যহতির তেমন কাজে আসছে না। এসব অব্যহতি তুলে দিয়ে রাজস্ব আয় বাড়িয়ে বৈষম্য কমাতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতে ব্যয় বাড়ানো যাবে। তিনি করনীতি ও কর প্রশাসন আলাদা করার সুপারিশ করেন। করনীতি বিভাগকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রত্যক্ষ কর বাড়ানো উচিত। তবে ৭০ শতাংশ প্রত্যক্ষকর বৃদ্ধি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কারণ এনবিআরের কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। রাজনৈতিক অর্থনীতির কারণে এনবিআর রাজস্ব আয়ে পিছিয়ে আছে। রাজস্ব আয় বাড়াতে এখন বড় বাধা রাজনৈতিক অর্থনীতি। কারণ অনেক খাতেই কর অবকাশ সুবিধা দিতে হচ্ছে। বিশেষ কর হার আরোপ করতে হচ্ছে। তাছাড়া সংসদ সদস্যদের অনেকেই ব্যবসায়ী হওয়ায় তারাও কর ছাড়ের সুবিধা নিতে চাইছে। এসব কারণে বছরে আড়াই লাখ কোটি টাকা কর ছাড় দিতে হচ্ছে। এসবই রাজনৈতিক অর্থনীতির স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণেই কাক্সিক্ষত রাজস্ব আয় হচ্ছে না। এই রাজস্ব আয় বাড়াতে সংস্কার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে এনবিআরের জোনগুলো সংখা দিয়ে না করে খাত ভিত্তিক করে রাজস্ব আয় বাড়াতে জোর দিতে হবে।

অর্থমন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কবিরুল ইজদানী বলেন, জিডিপির তুলনায় বাজেট ছোট। এর পরেও রাজস্ব আয় কম থাকায় বাজেটের ঘাটতি মেটাতে সরকারকে দেশ-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। রাজস্ব সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকা স্বত্বেও কর জিডিপি অনুপাতের অনেক কম। এ থেকে উত্তরণে বড় সমাধানে এনবিআরের অটোমেশন এবং করদাতার সেবা উইং তৈরি করা উচিত। তিনি বলেন, আবাসন খাত এবং ফেসবুক, আমাজন ও ফুডপান্ডার মতো নতুন ব্যবসার প্রসার হচ্ছে সেখান থেকেও সরকার কাক্সিক্ষত কর পায় না। এর জন্য করনীতি সংস্কার করতে হবে।

অর্থমন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, প্রত্যক্ষকর বাড়াতে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। অফিস কক্ষে বসে মানুষের মধ্যে ভয়ভীতি সৃষ্টি না করে জনগণের কাছে যেতে হবে। যাতে তারা কর দিতে উৎসাহী হয়। তাদেরকে বোঝাতে হবে কর না দিলে সরকারি সুযোগ সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে।

র‌্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক ড. এম আবু ইউসুফের সঞ্চালনায় সেমিনারে অংশ নেন এনবিআরের সদস্য মাহমুদুর রহমান, ইআরএফ সভাপতি শারমিন রিনভী ও সাধারণ সম্পাদক এস এম রাশিদুল ইসলাম।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD