বিশ্বের আরও পাঁচটি দেশের প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভোটাধিকার পাচ্ছেন। এসব দেশে নতুন করে প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বিতরণ কার্যক্রম চালু করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ ছাড়া ইসি ভোটার হতে প্রবাসীদের অনলাইন নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও সহজ করার উদ্যোগও নিয়েছে। নতুন যে পাঁচটি দেশে এই কার্যক্রম চালু হচ্ছে– তার মধ্যে বাহরাইন, সুইডেন ও সিঙ্গাপুরের উদ্বোধনের সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। চলতি মাসেই নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার সুইডেন এবং নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সিঙ্গাপুরে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় বাহরাইনে উদ্বোধনের তারিখ কয়েক দিন পেছানো হয়েছে। আগামী মাসের শুরুতে জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদের দেশটিতে এর উদ্বোধন করার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডেও প্রবাসীদের জন্য এনআইডি কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে ইসি। দেশ দুটিতে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের সুইডেন থেকে নিবন্ধন করতে হবে। কেননা নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডের প্রবাসীরা কনস্যুলেট সেবা সুইডেন দূতাবাস থেকে নেন। আর প্রবাসে এনআইডি সেবা দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে এসব দূতাবাসের মাধ্যমে প্রবাসীদের নিবন্ধনের আবেদন নিয়ে দেশে যাচাই-বাছাই ও এনআইডি ছাপায় ইসি।
তবে পরিকল্পনায় থাকলেও ফ্রান্সে প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি বিতরণ কার্যক্রমের আওতায় আনা আপাতত সম্ভব হচ্ছে না। ফ্রান্সের বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে কার্যক্রমটি পরিচালিত হওয়ার জন্য সেখানকার কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ছিল। দূতাবাস থেকে জানানো হয়েছে– এখনও তারা প্রস্তুত নয়। তাই আপাতত দেশটিতে কার্যক্রম স্থগিত করেছে ইসি।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আগে ১৪টি দেশের ২৪টি স্টেশনে প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি বিতরণের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। যা এখনও চলমান। নতুন করে পাঁচটি দেশ যুক্ত হওয়ায় এখন ১৯টি দেশের প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এখন যেসব দেশ ও স্টেশনে এই কার্যক্রম চালু আছে, সেগুলো হচ্ছে– সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ও দুবাই; সৌদি আরবের রিয়াদ ও জেদ্দা; যুক্তরাজ্যের লন্ডন, ম্যানচেস্টার ও বার্মিংহাম; ইতালির রোম ও মিলান; কুয়েতের কুয়েত সিটি; কাতারের দোহা; মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর; অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা ও সিডনি; কানাডার অটোয়া ও টরন্টো; জাপানের টোকিও; যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, মায়ামি, ওয়াশিংটন ডিসি ও লস অ্যাঞ্জেলেস; মালদ্বীপের মালে; ওমানের মাসকাট এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়া। জাতীয় নির্বাচনের পর গত পাঁচ মাসে এসব দেশ থেকে নতুন করে এক লাখ প্রবাসী নিবন্ধন করেছেন। যাদের মধ্যে ৩০ হাজারের মতো এনআইডি পেয়েছেন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণে তাদের জন্য ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি প্রদানের এই কার্যক্রম হাতে নিয়েছিল বর্তমান ইসি। সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে আইডিইএ প্রকল্পের (পর্ব-২) আওতায় প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি বিতরণ শুরু হয়। সে সময় পোস্টাল ভোটিং বিডি ও অনলাইন ড্যাশবোর্ড সিস্টেমের মাধ্যমে সাত লাখ ৭২ হাজার ৫৪২ জন প্রবাসী নিবন্ধন করে এনআইডি পান। তার মধ্যে সাত লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২ জন প্রবাসীর ঠিকানায় ডাকযোগে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়। পাঠানো ব্যালটের মধ্যে পাঁচ লাখ ১৮ হাজারের বেশি প্রবাসী ব্যালট গ্রহণ করেন এবং চূড়ান্তভাবে চার লাখ ৫৮ হাজার ৫৯ জন প্রবাসী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগেই বিশ্বের ১৬০টি দেশে বসবাসরত প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশির মধ্যে ৫০ লাখের বেশি ভোটাধিকার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা ছিল তাদের। তবে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও সময়ের অভাবে সেটা করা যায়নি। জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট শেষে এই কার্যক্রম আবারও জোরদার করেছে ইসি।
এর আগে দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২০০৯ সালের নির্বাচনী আইনে প্রবাসীদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির আইনি ভিত্তি তৈরি হয়। ২০১৯ সালের নভেম্বরে মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম অনলাইনে প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি সেবা চালু হয়। তবে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে সেখানে প্রাথমিক অংশগ্রহণ ছিল খুবই সীমিত। গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত বর্তমান কমিশন প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করে এই কার্যক্রমে গতিশীলতা আনে।
সহজ হলো প্রবাসী এনআইডি সেবা
প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে নিবন্ধন অ্যাপে সরাসরি বায়োমেট্রিক তথ্য আপলোডের নতুন নিয়ম চালু করেছে ইসি। গত ২১ জুলাই ইসির ১২তম কমিশন সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী– আগের দুই স্তরের নিবন্ধনের বদলে এক স্তরের নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে।
জানা গেছে, আগে ভোটার নিবন্ধন করতে প্রথম স্তরে প্রবাসীদের আবেদন করার পর তাদের সব তথ্যাদি তদন্ত ও যাচাই-বাছাই করত ইসি। এসব তথ্য সঠিক পাওয়ার পর দ্বিতীয় স্তরে বায়োমেট্রিক তথ্য দেওয়ার পর আবারও তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হতো। নতুন নিয়মে প্রবাসীরা আবেদন ফরম জমা দেওয়ার পর নিজেদের আঙুলের ছাপ বা বায়োমেট্রিক তথ্য সরাসরি সিস্টেমে আপলোড করে দিতে পারবেন। এতে ঢাকায় তদন্তের আগের বাড়তি একটি ধাপ কমে গিয়েছে। নির্বাচন কমিশন সরাসরি সিস্টেম থেকে তা যাচাই করে অনুমোদন দেবে। সমকাল