২০১৩ সালের ২৪শে এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের ফলে ১১০০ জনেরও বেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল। মর্মান্তিক ওই ঘটনার ১০ বছর পার হয়ে গেছে। রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর বিশ্বের চোখ এসে পড়েছিল বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং শ্রম অধিকারের উপর। এরপর গত এক দশকে পরিস্থিতি আসলে কতটুকু ভাল হয়েছে? বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন বা আইএলও কান্ট্রি ডিরেক্টর তুওমো পাউটিয়াইনেন। আইএলও’র ‘ফিউচার অব ওয়ার্ক’ পডকাস্টে যুক্ত হয়ে তিনি আলোচনা করেন, বাংলাদেশে পোশাক খাতের নিরাপত্তা কতটুকু উন্নত হয়েছে এবং এখনও যেসব চ্যালেঞ্জগুলি রয়ে গেছে তা নিয়ে। এছাড়া অন্যান্য পোশাক উৎপাদনকারী দেশগুলি বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে কী শিখতে পারে সে সম্পর্কেও তার মতামত শেয়ার করেছেন তুওমো।
আইএলওর এশিয়া কার্যালয় থেকে পডকাস্টটি আয়োজন করেন হোস্ট স্টিভ নিধাম। তিনি প্রথমেই বলেন, রানা প্লাজার এই দুর্ঘটনা কোনো স্থানীয় ইস্যু ছিল না। এটি বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিয়ে মৌলিক প্রশ্নগুলো উত্থাপন করেছিল। দেশে দেশে শ্রমিকদের অধিকার আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছিল। এটি ছিল এমন একটি বিপর্যয় যার সঙ্গে আমরা সকলেই সরাসরি যুক্ত। কিন্তু গত ১০ বছরে বাংলাদেশে পরিস্থিতির কি উন্নয়ন হয়েছে?
তার প্রশ্নের জবাবে তুওমো বলেন, রানা প্লাজার ওই ঘটনা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য ছিল ভয়াবহ এক ধাক্কা। তবে আমি মনে করি, ওই ঘটনার পর বাংলাদেশে পরিস্থিতির ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, বিশেষ করে শিল্প ও পেশাগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে। তাছাড়া এখন আর ঢাকার মধ্যে শিল্প কারখানা নির্মাণ হতে দেখা যাচ্ছে না। রানা প্লাজার ট্রাজেডির পর গোটা শিল্পটাকেই নতুন করে সাজানো হয়েছে। এখন পোশাক কারখানাগুলো সব শিল্প এলাকাগুলোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে, শহরের মধ্যে নয়।
তুওমো বলেন, রানা প্লাজার ঘটনার পর বাংলাদেশের শিল্প ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ইলেকট্রিকাল নিরাপত্তাও প্রাধান্য পাচ্ছে। এর ফলে কারখানাগুলোর পরিবেশ ব্যাপক হারে পরিবর্তন ঘটেছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হচ্ছে। কেনো যখন ভবন ভেঙে পড়ছিল তখন শ্রমিকদের বের হতে দেয়া হয়নি! কেনো ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা এত কম? ট্রেড ইউনিয়ন নিয়ে এত অনিচ্ছারই বা কারণ কি? এসব প্রশ্নের জবাব খোজার পাশাপাশি শ্রমিকদের কণ্ঠস্বরও জাগ্রত হয়েছে বলে মনে করেন তুওমো।
তার দাবি, গত এক দশকে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বেশ উন্নতি হয়েছে। যদিও শ্রম অধিকারের বিষয়টি এখনও পিছিয়েই আছে। শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতে কি কি করা প্রয়োজন তা নিয়েও আলোচনা করেন আইএলও কান্ট্রি ডিরেক্টর। তিনি বলেন, আইএলও যেভাবে পরামর্শ দেয় সে অনুযায়ী শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ। মূলত দেশের আইনের কারণেই এটি হচ্ছে। বর্তমানে বেশ কিছু সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। শ্রম আইনগুলোকে কীভাবে সংশোধনের মাধ্যমে আরও আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা যায় তা নিয়ে শ্রমিক ও মালিকদের সঙ্গে কথা বলছে সরকার। এর ফলে ট্রেড ইউনিয়নগুলো এমনভাবে পরিচালিত হতে পারবে যেভাবে তাদের পরিচালিত হওয়া উচিত।
তুওমো বলেন, বর্তমান কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ট্রেড ইউনিয়নের নিবন্ধন একটি প্রধান ইস্যু। তাদেরকে সেভাবে সহায়তা করতে হবে যাতে তারা নিজেদের আরও আধুনিক হয়ে উঠতে পারে। শুধুমাত্র পোশাক খাতই নয়, অন্য উদীয়মান খাতগুলোর শ্রমিকদের কণ্ঠস্বরকেও একত্রিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, এই পরিবর্তনের সবথেকে জরুরি দিকটি হল ট্রেড ইউনিয়নগুলোর জন্য দর কষাকষির টেবিলে একটি আসন নিশ্চিত করা। সরকার এবং মালিকদের বুঝতে হবে যে, ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে দরকষাকষির পার্টনার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ট্রেড ইউনিয়নগুলো যেনো অর্থপূর্ণ পক্ষ হতে পারে এবং এই দর কষাকষির জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে সে জন্য তাদেরকে সহায়তা করতে হবে।
রানা প্লাজার সময় এটা স্পষ্ট ছিল যে, বাংলাদেশে যে দ্রুত গতিতে পোশাক শিল্প বড় হচ্ছিল তার সঙ্গে তাল মিলাতে পারছিল না শ্রম পরিদর্শক ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি। তবে সরকার খুব দ্রুত এই সমস্যাটি চিহ্নিত করতে পেরেছিল। তারা আইএলওর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করতে শুরু করে এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের পরিদর্শন কাঠামো তৈরি করে। এই কাঠামোতে অগ্নিনিরাপত্তা দপ্তর ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তরগুলোকেও যুক্ত করা হয়। এতে করে সম্মিলিতভাবে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে।
আইএলও’র এই কর্মকর্তা বলেন, শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপও রয়েছে। অনেক বাণিজ্য পার্টনারই বলছে, আপনাকে যদি কিছু বিক্রি করতে হয় তাহলে সবার আগে শ্রমিকদের মান উন্নয়ন এবং তাদের জন্য উন্নত কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টি সরকারের কাজ। এটা সরকারের সাধারণ দায়িত্ব। সরকারকে এগিয়ে আসতেই হবে। শ্রমিকরা যাতে নিরাপদ থাকে তা নিশ্চিতে সরকারকে আরও উন্নয়ন ও সেই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রের পরিবেশের উন্নয়নও নিশ্চিত করতে হবে।