মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১০:১২ পূর্বাহ্ন




ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট বাতিলসহ সাংবাদিকদের সুরক্ষা আইনের দাবি সম্পাদক পরিষদের

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২ মে, ২০২৩ ৪:৩২ pm
Editors' Council সম্পাদক পরিষদ সংবাদপত্র newspaper Editor
file pic

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট বাতিলের দাবি জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। পাশাপাশি এক্ষেত্রে সরকারের কোনো আপত্তি থাকলে আইনটি সংশোধন করে সেখানে যেন এটি সাংবাদিকদের ওপর প্রয়োগ করা হবে না, এমন বিধান যুক্ত করা হয়, সেই দাবিও জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের সুরক্ষার জন্য নতুন আইনেরও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

মঙ্গলবার (২ মে) জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সভায় এই দাবি জানান সম্পাদক পরিষদের সভাপতি মাহফুজ আনাম। ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস ২০২৩, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সকল প্রকার মানবাধিকারের চালিকাশক্তি’ শীর্ষক সভার আয়োজন করে সম্পাদক পরিষদ। এটি সঞ্চালনা করেন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দেশে সাংবাদিকসহ মত প্রকাশের ব্যাপারে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে ব্যাহত করা হচ্ছে। শুধু আইনেই নয়, সরকার, গোয়েন্দা সংস্থা, প্রশাসনসহ নানাভাবে সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

সভায় মাহফুজ আনাম বলেন, আমরা ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট বাতিলের দাবি জানাচ্ছি। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট সাইবার ক্রাইম বন্ধ করা জন্য করেছি। তাহলে সেখানে এটা যুক্ত করা হোক, এই আইন সাংবাদিকদের ওপর প্রয়োগ করা হবে না। সাইবার ক্রাইম বন্ধ করার জন্য যদি এই আইন ব্যবহার করা হয়, তাহলে তো অন্যকথা। কিন্তু এখন স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর ব্যবহার করা হচ্ছে, মতপ্রকাশের ওপর ব্যবহার করা হচ্ছে, তাই এটা বাতিল করা হোক। অথবা সেখানে একটা ধারা যুক্ত করা হোক ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট গণমাধ্যম ও স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর প্রয়োগ করা হবে না। এটা আমরা অফিসিয়ালি আপনাকে (সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদীয় কমিটির সভাপতি হাসানুল হক ইনু) প্রস্তাব দিচ্ছি।

ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মাধ্যমে যেসব সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং মামলা করা হয়েছে তা যেন বাতিল করা হয়। এ আইনে গ্রেপ্তার সাংবাদিকদের মুক্তি দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমাদের তৃতীয় দাবি হচ্ছে দেশে সাংবাদিকতায় যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, আমরা কিছু লিখতে দ্বিধাগ্রস্ত, সেলফ সেন্সরশিপের মধ্যে বাস করি; ভয়ের মধ্যে যে সাংবাদিকতা এটাতে আমরা থাকতে চাই না।

সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, সাংবাদিকদের সুরক্ষায় পজেটিভ একটা আইন হতে পারে। সেটা আমাদের সংবিধানে ৩৯ অনুচ্ছেদে আছে। সম্পাদক পরিষদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-

১. স্বাধীন ও মুক্ত সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে যেসব আইন প্রক্রিয়াধীন আছে, সেই প্রক্রিয়া এখনই স্থগিত করা। আইনগুলোর মধ্যে যেসব ধারা স্বাধীন সাংবাদিকতাকে ব্যাহত করতে পারে, সেগুলো আইন থেকে বাদ দেওয়া।

২. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করতে হবে। আর যদি তা বাতিলে সরকারের কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকে, তাহলে এমন একটি ধারা যুক্ত করতে হবে, যেখানে বলা থাকবে, এই আইন গণমাধ্যম, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য প্রযোজ্য নয়। সাংবাদিকতার কারণে আজ পর্যন্ত যেসব মামলা করা হয়েছে, সেগুলো প্রত্যাহার ও গ্রেপ্তার সাংবাদিকদের মুক্তি দিতে হবে।

৩. যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, সেটি সরকার উদ্যোগী হয়ে যেন একেবারেই মুছে ফেলে।

৪. সাংবাদিকতার সুরক্ষার জন্য আইন হতে পারে, যা সংবিধানের চেতনার মধ্যে রয়েছে।

অনুষ্ঠানে সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদীয় কমিটির সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, আমি মনে করি ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট বাতিল নয়, সংশোধন করা হোক। সাংবাদিকদের ওপর এই আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধ করতে হবে। কাউকে গ্রেপ্তার করতে হলে তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে করতে হবে। সরকারের আইনমন্ত্রী যেহেতু বলছেন-ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু-কিছু ধারা সরকারকে বিব্রত করছে, এটা সংশোধন করা দরকার। আমি সরকারকে বলব- আইন মন্ত্রালয়ের পরামর্শ নিয়ে এটি সংশোধন করুন, গণমাধ্যম বান্ধব করুন।

সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু প্রশ্ন তোলেন, ‘কিছু গণমাধ্যম রাজাকারের পক্ষে, সামরিক শাসনের পক্ষে কাজ করছে। গণতন্ত্রবিরোধীদের পক্ষে কথা বলছে। এটা কি স্বাধীনতার পক্ষে যায়? ডিএসএ কি সাংবাদিকতার একমাত্র বিপদ? এর বাইরে করপোরেট দুনিয়া, প্রশাসন, বিভিন্ন বাহিনী মালিকপক্ষ যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে, গণমাধ্যমকে তা নিয়ে ভাবতে হবে। বিজ্ঞাপন আসবে না, তাই অনেক ক্ষেত্র নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেন না আপনারা। নানা সময়ে গোয়েন্দারা যেভাবে বিধিনিষেধ দেয়, সেগুলো আপনারা প্রকাশ করেন।’ ইনু বলেন, ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য কোনো দর-কষাকষি চলতে পারে না। সাইবার জগতে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, একই সঙ্গে বাক্‌স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে হবে।’

সভাপতির বক্তব্যে হাসানুল হক ইনুর বক্তব্যের কিছু অংশের বিরোধিতা করেন ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহ্‌ফুজ আনাম। কোন কোন গণমাধ্যম অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পক্ষে সংবাদ প্রকাশ করেছে, সামরিক শাসনের জন্য কাজ করে সরকারকে বিব্রত করেছে, তার প্রমাণ চান তিনি। গণমাধ্যম সম্পর্কিত আইনগুলোতে সংশ্লিষ্টদের অন্তর্ভুক্ত করারও দাবি জানান ডেইলি স্টারের সম্পাদক।

অনুষ্ঠানে সমকালের সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন বলেন, পেশাজীবী হিসেবে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও ঐক্য দরকার। আজকে স্বাধীন সাংবাদিকতা বিপন্ন হয়েছে। এটা রক্ষা করতে হলে সাংবাদিকদের ঐক্য হওয়া দরকার। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট তৈরি করা হয়েছে ভয় দেখানোর জন্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দ্যা ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ বলেন, সাংবাদিকদের অবস্থা এখন করুন। তাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা হয়েছে; একটা আইন করে, আরেকটা সাংবাদিকদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে। আমাদের মধ্যে যে বিভাজন এটা দূর হবে কি না সন্দেহ আছে। আমরা দেখেছি, অনেক ইস্যুতে সাংবাদিকদের এক পক্ষ দাঁড়ায়, আরেক পক্ষ কিছুই বলে না। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট সরকারের মধ্যেও একটা অস্বস্তি তৈরি করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেটা আইনমন্ত্রী বারবার বলছেন, কতগুলো ধারা আছে সেগুলো অস্বস্তি তৈরি করছে। এটা সংশোধন করা দরকার। এটা যদি সরকার ভেবে থাকে তাহলে তা সংশোধন করা দরকার।

নিউএজ সম্পাদক নুরুল কবির বলেন, একদলীয় শাসনব্যবস্থায় ভিন্নমত প্রকাশ করতে দেওয়া হবে না, দেবেও না। যে আইনের জন্য সবাইকে ভুগতে হচ্ছে, অনুনয় করে লাভ হবে না। সরকারের মন্ত্রী, এমপি পর্যায় থেকে বারবার বলা হয়েছে সংশোধন করা হবে, কিন্তু হয়নি। গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সঙ্গে নিয়ে জনগণকে সমন্বয় করে আন্দোলন করতে হবে।

প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক বলেন, বাংলাদেশে মত প্রকাশের যথেষ্ট স্বাধীনতা আছে। বুঝে নেন, ওইভাবে বলতে পারছি না। সংবিধানে মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে বলা আছে, কিন্তু কীভাবে ক্ষমতাসীনেরা বিরক্ত হবেন না, সেটার ব্যাখ্যা পরিষ্কার করা নেই। যে কারও বিরুদ্ধে যেকোনো সময় ডিএসইতে মামলা হতে পারে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন নিউ এইজ পত্রিকার সম্পাদক নুরুল কবীর, প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, দৈনিক দেশ রূপান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুন। সভায় প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানও উপস্থিত ছিলেন।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD