বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ০৭:০০ অপরাহ্ন




ইআরএফ-এসএমই ফাউন্ডেশন কর্মশালা

সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের দায়িত্বে থাকা উচিত না: শিল্প প্রতিমন্ত্রী

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১১ মে, ২০২৩ ৬:১৬ pm
erf ইআরএফ-এসএমই ফাউন্ডেশন কর্মশালা
file pic

শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার বলেছেন, অর্থনীতি ও বাজার এই দুই জায়গাতেই সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। যার কারণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঝরে পড়ছেন এবং পণ্যের মূল্য বেড়ে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মানুষ বাজার করতে গিয়ে এখন কাঁদছে। এই সিন্ডিকেট ধরতে না পারলে এবং ভাঙতে না পারলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের দায়িত্বে থাকা উচিৎ না।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) এর সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘কোভিড-১৯ পরবর্তী পরিস্থিতিতে এসএমই খাতের উন্নয়নে গণমাধ্যমের ভুমিকা’ শীর্ষক এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন।

কর্মশালাটি ইআরএফ ও এসএমই ফাউন্ডেশন যৌথভাবে আয়োজন করে। ইআরএফ সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেমের সঞ্চালনায় ও এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মাসুদুর রহমানের সভাপতিত্বে কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. মফিজুর রহমান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ইআরএফ সভাপতি মোহাম্মাদ রেফায়েত উল্লাহ মীরধা।

মূল প্রবন্ধে এসএমই ফাউন্ডেশনের কর্মকান্ড ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তা তৈরিতে ভুমিকা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে ফাউন্ডেশনের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সরকারের কাছে কিছু দাবিও তুলে ধরেন মূল আলোচক।

এসময় প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘দেশ এগিয়ে চলেছে, বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। কিন্তু তারপরও দেশে আজকে যে অরাজকতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে, ব্যবসার নামে আজকে যে লুটপাট হচ্ছে, মানুষের পকেট কাটা হচ্ছে এগুলো সাংবাদিকদের আরো জোরালো ভাবে তুলে ধরতে হবে, এগুলো আরো ফোকাস করতে হবে।’

‘আমরা যখন বাজারে যাই তখন দেখি দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, কেন উর্ধ্বগতি? আমাদের কিন্তু কোন কিছুর অভাব নেই, আমরা প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে সয়ংসম্পূর্ণ। চাল, ডাল, তরিতরকারি, মাছ-মাংস থেকে শুরু করে সবকিছুতেই স্বয়ংসম্পূর্ণ। তারপরও সিন্ডিকেটের কারণে দেশের এই অবস্থা বিরাজ করছে।’

অবাক লাগে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে লক্ষ লক্ষ বেকার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ কিন্তু মওকুফ করা হয়না। কাদের ঋণ মওকুফ করা হচ্ছে? যারা ব্যাংক থেকে লক্ষ কোটি টাকা নিয়ে খেলাপি হয়েছে তাদেরটাই বার বার মওকুফ করা হচ্ছে। তারা মওকুফ পেয়ে আবার ঋণ নিচ্ছে। বড় খেলাপিদের এই ঋণগুলো যদি এসএমই ফাউন্ডেশনসহ ক্ষদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের দেয়া হতো তবে তাদের ব্যবসা আরো সমৃদ্ধশালী হতো। কিন্তু সেটা করা হচ্ছে না।

আমি আগেও অর্থমন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে বলেছি বড় খেলাপিদের ঋণ যাতে মওকুফ না করা হয়। কিন্তু বারবারই তাদেরকে সুবিধা দেয়া হয়। কারা ব্যাংকের মালিক হয়েছে, কিভাবে হয়েছে এগুলো আপনাদের তুলে ধরতে হবে।

তিনি বলেন, আমার ঢাকা শহরে রাজনীতির বয়স ৫০ বছর, আমি দেখেছি অনেকে ব্রিফকেস নিয়ে ঘুরতো, অনেকের কাছে টাকা ছিল না, অন্যের কাছে সিগারেট চেয়ে খেত। আজকে তারা ব্যাংকের মালিক। তারা সরকারি ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে বেসরকারি ব্যাংকের মালিক হয়েছে।’

‘আমি মনে করি, যারা সরকারি ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে বেসরকারি ব্যাংকের মালিক হয়েছেন অর্থমন্ত্রণালয়ের উচিৎ তাদের নামগুলো প্রকাশ করা। কেন ওনারা করেন না, আমি জানিনা, এটা একটা বড় প্রশ্ন।’

তিনি আরো বলেন, আজকে আমরা দেখছি যে ব্যক্তি লুটপাট করে বড় লোক হচ্ছে তাকে আরো সুযোগ দিচ্ছি। ফলে কিছু ব্যক্তির কাছে ব্যাংক থেকে শুরু করে সারা অর্থনীতি জিম্মি হয়ে পড়েছে। এই সিন্ডিকেট আমাদের ভাংতে হবে। এই সিন্ডিকেট ভাংতে গেলে আপনারা যারা সাংবাদিক রয়েছেন তারা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।

তিনি দৃঢ় ভাবে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যেভাবে সিন্ডিকেট গড়ে ওঠেছে, এই সিন্ডিকেট যদি আমরা ধরতে না পারি, এই সিন্ডিকেট যদি আমরা ভাংতে না পারি, দেশের ১৭ কোটি মানুষের যে দু:খ কষ্ট যদি লাঘব না করতে পারি তবে আমার মনে হয়, আমাদের মতো লোকের মন্ত্রী থাকা উচিৎ না।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমি অনেককে দেখেছি বাজার করতে গিয়ে কাঁদছেন। কারন বাজারের যে অবস্থা তার পকেটে সে টাকা নেই। এটার এক মাত্র কারণ সিন্ডিকেট। আমাদের চিনির অভাব নাই, আমাদের চাল-ডাল তরি-তরকারি অভাব নাই।’

শিল্প প্রতিমন্ত্রী বলেন, সুগার মিলের যারা আখচাষী তারাই সুগার মিলের শ্রমিক, যার কারণে মিলগুলোতে লুটপাট হয়েছে, আর লুটপাটের কারণে মিলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের চিনির মিলগুলো যদি যথারীতি চালাতাম তবে বাজারে চিনির দাম এতো বাড়তো না। এখন চিনির স্বল্পতা দেখা দিয়েছে, চিনি খুজে পাওয়া যায় না- এগুলো হতো না।

একইভাবে আমাদের এসএমই খাতের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাদের যারা মুড়ি-চানাচুড় বিক্রি করে চলতো, সেখানেও দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলো হাত বাড়িয়েছে। যার কারণে ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সঙ্গে প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে পারছে না।

আমরা উন্নত দেশ হওয়ার ক্ষেত্রে এসএমই ফাউন্ডেশন গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারে। ইতিমধ্যে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নিত হয়েছি। আমাদের উন্নত বিশ্বের কাতারে যেতে হলে আমাদের বেকার সমস্যা সমাধান করতে হবে, আমাদের অর্থনীতিকে আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তা হলে আমরা স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে পারবো। আমাদের দেশে যদি ক্ষুধা দারিদ্র ও বেকার সমস্যা থাকে তবে আমরা স্মার্ট বাংলাদেশ কিন্তু করতে পারবো না। আমাদের এদিকে নজর রাখতে হবে।

আমরা যাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের উত্তোরোত্তর এগিয়ে নিতে পারি আমাদের কে সে লক্ষে কাজ করতে হবে।

এসএমই ফাউন্ডেশনকে আগামী বাজেটে ৫ হাজার কোটি টাকা দেয়া উচিৎ। যেভাবে বিভিন্ন প্রকল্পে টাকার অপচয় হচ্ছে এটি না হলে এই টাকা দেয়া কোন বিষয় না।

কয়েক দিন আগে পত্রিকায় দেখলাম বাফার এক গুদামের কাজ তিন মন্ত্রীর আমলেও শেষ করতে পারেনি, এটি মন্ত্রীদের দোষ নয়, আমলাদের দোষ। কারণ লাল ফিতার দৌরাত্ব এখনও কমেনি। আমলরা যেটা বলে সেটাই আমাদের করতে হয়। মন্ত্রী যদি দুর্বল হয় আর সচিব যদি সবল হয় তবে সেখানে মন্ত্রীর কিন্তু কোন ভুমিকা থাকে না।

এসএমই ফাউন্ডেশনের চ্যালেঞ্চ ও দাবি

মফিজুর রহমান এসএমই ফাউন্ডেশনের চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে বলেন, পর্যাপ্ত তহবিল/এন্ডাউমেন্ট ফান্ডের অভাব আমরা উদ্যোক্তাদের ভালোভাবে সেবা দিতে পারছিনা। আমাদের লোকবলের কারনে ঢাকার বাইরে খুব একটা কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে না। বর্তমানে মাত্র ২০০ কোটি টাকা তহবিল দিয়ে ফাউন্ডেশন চলছে। এছাড়া ব্যাংক সুদের হার হ্রাসের কারণে আয় হ্রাস হয়ে গেছে। নিজস্ব ভবন না থাকায় ভাড়া বাবদ অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্য প্রদর্শনের কোনো প্লাটফর্ম না থাকায় উদ্যোক্তাদের বাজারজাত করণে বাধা তৈরি হচ্ছে। এছাড়া শিল্প মন্ত্রণালয়/অর্থ বিভাগ হতে বাজেট বরাদ্দ/সংস্থান না পাওয়া (রেভিনিউ কিংবা ডেভেলপমেন্ট); ফাউন্ডেশনের আয়কর অব্যহতি প্রাপ্তির লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাথে অমিমাংসিত বিষয় ও এখাতে সরকারের কোনো উন্নয়ন প্রকল্প না থাকা ইত্যাদিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি সরকারের কাছে কিছু দাবি তুলে ধরেন। সেগুলো হলো- আয় বৃদ্ধি এবং দেশব্যপী বর্ধিত কর্মসূচি গ্রহণের জন্য এন্ডাউমেন্ট ফান্ড (১,০০০ কোটি টাকা) ক্রেডিট হোলসেলিং কর্মসূচি সম্প্রসারণের জন্য ক্রেডিট ফান্ড (৫০০-১,০০০ কোটি টাকা);

এসএমই নীতিমালাসহ সরকারের বিভিন্ন নীতিমালা বাস্তবায়নে সূনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ; ফাউন্ডেশনের নিয়মিত কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য বাজেট বরাদ্দ (শিল্প মন্ত্রণালয়ের খাতে); সরকারের অর্থায়নে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদন; দাতা সংস্থার অর্থায়নে কারিগরী ও উন্নয়ন প্রকল্প;

ঢাকায় নিজস্ব অফিস ভবনসহ বিভাগীয়/জেলা পর্যায়ে শাখা অফিস, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং ইনকিউবিশন অ্যান্ড ইনোভেশন সেন্টার স্থাপনের দাবি জানান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD