মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ০২:৩৬ অপরাহ্ন




ইইউ-যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি নেতিবাচক, বাড়ছে দুশ্চিন্তা

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬ ১২:২৩ pm
Textiles Textile garment factory garments industry rmg bgmea worker germent পোশাক কারখানা রপ্তানি শিল্প শ্রমিক আরএমজি সেক্টর বিজিএমইএ poshak shilpo পোশাক খাত
file pic

দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুই উৎস- রপ্তানি ও প্রবাসী আয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিবাচক ধারায় থাকলেও রপ্তানি খাতে নেই স্বস্তি। বাংলাদেশের প্রধান দুই রপ্তানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানির প্রবৃদ্ধি চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ঋণাত্মক হওয়ায় তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ।

দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশই আসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ থেকে। ফলে এসব বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া বাংলাদেশের রপ্তানি, কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন এবং সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন শিল্পের মালিক ও অর্থনীতিবিদরা।

ইইউর রপ্তানির চিত্র
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে বিশ্ববাজার থেকে ইইউর পোশাক আমদানি ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ কমে ২৭ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩১ বিলিয়ন ডলার।

একই সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আরও বেশি হারে কমেছে। রপ্তানি ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমে ৬ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার।

ইইউর সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী চীনের রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ, যা দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারে। তৃতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক তুরস্কের রপ্তানি ১৬ দশমিক ৬০ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারে। ভারতের রপ্তানি ১২ দশমিক ১০ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে আমদানি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। কারণ আমাদের রপ্তানির একটি বড় অংশ এখনো এসব বাজারনির্ভর। বৈশ্বিক চাহিদা কমে গেলে অর্ডার কমে যাওয়া, মূল্য নিয়ে চাপ ও প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।-বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু

বাংলাদেশের জন্য আরও উদ্বেগের বিষয় হলো রপ্তানি মূল্যের বড় ধরনের পতন। ইইউ বাজারে গড় আমদানিমূল্য যেখানে ৫ দশমিক ২২ শতাংশ কমেছে, সেখানে বাংলাদেশের গড় রপ্তানিমূল্য কমেছে ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

চীনের গড় মূল্য কমেছে ৭ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং ভারতের ৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ। অন্যদিকে, ভিয়েতনাম গড় রপ্তানিমূল্যে ১ দশমিক ৪৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা প্রতিযোগীদের তুলনায় তাদের শক্তিশালী অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের রপ্তানির চিত্র
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানিও কমেছে। জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে দেশটির মোট পোশাক আমদানি ১২ শতাংশ কমে ২৩ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২৬ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার।

এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পোশাক সরবরাহকারী ভিয়েতনাম ১ দশমিক ৩১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে রপ্তানি ৫ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে, যা এক বছর আগে ছিল ৫ বিলিয়ন ডলার।

যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী বাংলাদেশ ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ রপ্তানি হারিয়ে ২ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। আগের বছরের একই সময়ে এ রপ্তানি ছিল ২ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার।

দামের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে মিশ্র চিত্র। বিশ্বব্যাপী গড় আমদানিমূল্য ১২ দশমিক ৯২ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ পতন ছিল ৯ দশমিক ০১ শতাংশ। বিপরীতে ভিয়েতনাম ২ দশমিক ৬৯ শতাংশ মূল্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, আর চীনের মূল্য কমেছে ৩৮ শতাংশ।

কেন উদ্বেগ বাড়ছে
শুধু গার্মেন্টস শিল্পের কার্যাদেশ নয়, একই সঙ্গে কমেছে পরিমাণ ও দাম। অর্থাৎ, ক্রেতারা কম পোশাক কিনছেন, আবার কম দামেও কিনছেন। এতে রপ্তানি আয় দ্বিগুণ চাপে পড়ছে।

তৈরি পোশাক রপ্তানি

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচন এবং খুচরা বিক্রেতাদের অতিরিক্ত মজুত পোশাক আমদানি কমার অন্যতম কারণ। একই সঙ্গে ক্রেতারা এখন কম দামের উৎসের দিকে আরও বেশি ঝুঁকছেন।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বর্তমানে উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, ডলারের চাপ ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় বৃদ্ধির মুখোমুখি। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য কমে যাওয়ায় উৎপাদকদের মুনাফা আরও সংকুচিত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি কোথায়
বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৪ শতাংশই তৈরি পোশাক। আবার এ খাতের প্রায় ৭০ শতাংশ রপ্তানি যায় ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রে। ফলে এই দুই বাজারে দীর্ঘমেয়াদি মন্দা দেখা দিলে, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমবে, কারখানাগুলোর সক্ষমতা ব্যবহার কমে যেতে পারে এবং ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো টিকে থাকার সংকটে পড়বে।

ফলে, কর্মসংস্থান ও নতুন বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বর্তমানে এ শিল্পে ৪০ লাখেরও বেশি লোক কাজ করে, যাদের বড় অংশ নারী। এছাড়া এলডিসি-পরবর্তী সময়ে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

করণীয় কী
বর্তমান পরিস্থিতিকে সাময়িক ধাক্কা হিসেবে না দেখে কাঠামোগত পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে নিতে হবে। পাশাপাশি, টেকসই নীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে সামনে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে আমদানি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। কারণ আমাদের রপ্তানির একটি বড় অংশ এখনো এসব বাজারনির্ভর। বৈশ্বিক চাহিদা কমে গেলে অর্ডার কমে যাওয়া, মূল্য নিয়ে চাপ ও প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।’

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের শিল্পকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘প্রচলিত পোশাকের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের পণ্য, নতুন বাজার ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন, অটোমেশন এবং টেকসই উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।’

শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে সরকারের নীতিগত সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন মাহমুদ হাসান। তিনি বলেন, ‘কারখানার নির্বিঘ্ন কার্যক্রমের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ব্যবসার ব্যয় কমানো, সহজ শর্তে অর্থায়ন, বন্দর কার্যক্রমের দক্ষতা বৃদ্ধি ও দ্রুত কাস্টমস সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।’

সরকার ও শিল্পখাতের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বর্তমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারলে বাংলাদেশের পোশাক খাত ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে বলে জানান এই ব্যবসায়ী নেতা।

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে আগামী দশকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে হলে শুধু রপ্তানির পরিমাণ বাড়ালেই হবে না, রপ্তানির গুণগত মান ও বৈচিত্র্যও বাড়াতে হবে।’

প্রচলিত পণ্যের বাইরে টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, স্পোর্টসওয়্যার, আউটারওয়্যার ও উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্যে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ভারত ও লাতিন আমেরিকার মতো বাজারে প্রবেশ বাড়াতে হবে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

তিনি বলেন, উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, দক্ষতা উন্নয়ন ও লিন ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে বিনিয়োগ জোরদার করা প্রয়োজন।

‘পাশাপাশি ম্যান-মেড ফাইবারসহ স্থানীয় কাঁচামাল উৎপাদন সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, স্বল্পসুদে অর্থায়ন, বন্দর ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি ও দ্রুত কাস্টমস সেবা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ,’ বলেন তিনি।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমান আমদানি সংকোচন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। এটিকে কেবল স্বল্পমেয়াদি চাহিদা হ্রাস হিসেবে দেখলে চলবে না, বরং এটি আমাদের রপ্তানি কাঠামো, বাজার নির্ভরতা ও শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।’

ড. জাহিদ বলেন, ‘নীতিগত সংস্কার, বাজার বৈচিত্র্য ও শিল্পের আধুনিকায়নের মাধ্যমে এই সংকেতকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো গেলে বর্তমান চ্যালেঞ্জ ভবিষ্যতের শক্তিতে রূপ নিতে পারে। অন্যথায় পোশাক রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।’

বর্তমান পরিস্থিতি সাময়িক মন্দার চেয়েও বড় একটি বার্তা বহন করছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক পোশাক বাজারে প্রতিযোগিতা এখন শুধু কম দামে পণ্য সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরির সক্ষমতাই আগামী দিনের প্রতিযোগিতার মূল নির্ধারক হবে।’

বাংলাদেশ যদি এসব ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়াতে না পারে, তাহলে শুধু রপ্তানি প্রবৃদ্ধিই নয়, দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অবস্থানও চাপের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করেন ড. জাহিদ হোসেন।

বাংলাদেশ শিগগির স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ করবে। ফলে বিদ্যমান কিছু শুল্ক ও বাণিজ্য সুবিধা কমে আসবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এমন সময়ে যদি প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে চাহিদা দুর্বল থাকে, তাহলে নতুন বাণিজ্য বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে। তাই এখনই প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাজার সম্প্রসারণ ও শিল্পখাতের কাঠামোগত সংস্কারে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।’ জাগো নিউজ




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD