শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪, ০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন




এবিএম মূসা-সেতারা মূসা আজীবন সম্মাননা পেলেন মতিউর রহমান চৌধুরী

আউটলুকবাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ২০ মে, ২০২৩ ৩:৪৯ pm
Matiur Rahman Chowdhury journalist editor talk-show host editor in chief ManabZamin tabloid newspaper মতিউর রহমান চৌধুরী সাংবাদিক সম্পাদক টক-শো হোস্ট বাংলা ভাষার ট্যাবলয়েড সংবাদপত্র মানবজমিন প্রধান সম্পাদক MRC mz
file pic

সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদানের জন্য এবিএম মূসা-সেতারা মূসা আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন মানবজমিন প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী। শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এবিএম মূসা-সেতারা মূসা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে মতিউর রহমান চৌধুরীর হাতে এই সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেয়া হয়।

অনুষ্ঠানে ‘রাজনীতির বাঁক-বদল এবং সাংবাদিকের আদর্শ ওনীতির প্রসঙ্গ’ শীর্ষক স্মারক বক্তৃতা করেন বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক আবুল মোমেন।

আজকের পত্রিকার সম্পাদক অধ্যাপক গোলাম রহমানের সভাপতিত্বে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানে ফাউন্ডেশনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও কার্যক্রম তুলে ধরেন এবিএম মূসার মেয়ে প্রফেসর শারমিন মূসা। অনুষ্ঠানে সমকালের সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন, সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক অজয় দাস গুপ্ত, নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা হক মিনু অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। এ ছাড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন সিনিয়র সাংবাদিক শফিকুল করিম সাবু, কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক হাসান হাফিজ। মঞ্চে ফুল দিয়ে অতিথিদের বরণ করে নেন এবিএম মূসার কন্যা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের প্রফেসর শারমিন মূসা। উত্তরীয় পরিয়ে দেন এবিএম মূসার আরেক কন্যা সিনিয়র সাংবাদিক পারভীন সুলতানা মূসা ঝুমা ও জামাতা ব্যারিস্টার আফতাব উদ্দিন।

সম্মাননা প্রাপ্তির প্রতিক্রিয়ায় মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, এ সম্মাননায় আমি গর্বিত, আনন্দিত। তবে খুবই চিন্তিত। কারণ এ সম্মাননা পাওয়ায় আমার দায়িত্ব কিন্তু আরও বেড়ে গেলো। মূসা ভাই ছিলেন একজন অসাধারণ মানুষ। যাকে নিয়ে এ সম্মাননা পেলাম তিনি আমার প্রিয় মূসা ভাই। একই ভবনে কাজ করেছি। এক সঙ্গে আড্ডা দিয়েছি। তিনি কাজ করতেন অবজারভারে। আমি কাজ করেছি পূর্বদেশে।

এবিএম মূসা আজীবন সত্য ও ন্যায়ের কথা বলেছেন। কাজও করে গেছেন। সত্যের সঙ্গে কখনো আপোস করেননি। রাজনীতি করতেন, দলের রাজনীতি করতেন। কিন্তু কোনো দিন আপোস করেননি সত্য বলতে।

প্রয়াত সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ লিখেছিলেন ‘সত্য বাবু মারা’ গেছেন। মূসা ভাই বলতেন- ‘সত্য বাবু মারা যাননি’ সত্যের সঙ্গে আমরা প্রতিনিয়ত আপোস করছি। আমরাই দায়ি। আমরা সত্য বাবুকে মেরে ফেলেছি। ‘সত্য বাবু মারা’ যান নাই। আসলে ‘সত্য বাবু মারা যাননি’ মূসা ভাই সেটা প্রমাণ করে গেছেন। তিনি বলেন, এখনতো রাজনৈতিভাবে আমরা বিভাজিত হয়ে গেছি। তাদের মধ্যেও রাজনীতি ছিল। কিন্তু তারা আড্ডার টেবিলে কোনো দিনেও রাজনীতি আনেন নাই। সেই আড্ডাটা বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, মুক্ত সমাজ না থাকলে মুক্ত সাংবাদিকতা হয় না। আমরা সমাজটাকে আটকে দিয়েছি। এই অবস্থায় আমার মনে হয় গণতন্ত্র যদি থাকে মুক্ত সাংবাদিকতা হবে। মূসা ভাই মুক্ত সাংবাদিকতা চেয়েছিলেন। কিছুটা করেও গেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আপোস করেন নাই। তিনি মানুষকে ভালো বাসতেন। এমন কোনো দিন নাই যে দিন প্রেস ক্লাবে আসতেন না। বিদেশে চাকরি করেছেন। কিন্তু দেশে ফিরে আসলেই আমাদের সবাইকে নিয়ে বসতেন। মূসা ভাইয়ের কাছ থেকে অনেক সেখার ছিল। তিনি পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। তার সেহ্ন, মায়া-মমতা ছিল অতুলনীয়। তিনি সাংবাদিকদের আগলে রেখেছেন। এটা আাজকের যুগে অসম্ভব। তিনি বলেন, আসুন রাজনীতিকে অন্য জায়গায় রেখে সাংবাদিকতা নিয়ে এগিয়ে যাই। তাহলেই আজকের সমাজে মুক্ত সাংবাদিকতা করা যাবে। এটাই আজকের প্রত্যাশা।

অনুষ্ঠানে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন মানবজমিন সম্পাদক, জনপ্রিয় সংবাদ উপস্থাপিকা মাহবুবা চৌধুরী।

স্মারক বক্তৃতায় আবুল মোমেন বলেন, বর্তমানে গণমাধ্যমের বিস্ফোরণ ঘটেছে। পেশাদারিত্বের যুগে নানা অপেশাদার বিবেচনা থেকে গণমাধ্যমের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। বাঁধন সর্বত্র আলগা হয়েছে। এ এক জটিল পরিস্থিতি তাতে সন্দেহ নেই, আদর্শ ও নীতির প্রশ্নে যারা খাঁটি থাকতে চান এ বাস্তবতা তাদের জন্য যেমন কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে তেমনি আবার অনেক ছদ্ম কিংবা ফাঁপা আদর্শিক সৈনিকও তৈরি করেছে। তিনি বলেন, গণমাধ্যমের বিশাল বিস্তারের এই সময়ে সরকারে দীর্ঘ সময় ধরে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, সঙ্গে আরও তেরটি দল থাকলেও সরকারের দিকে তাকিয়ে এমন কথা বলা অসঙ্গত হবে না। এই সময়েই দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে, অবকাঠামো ও যোগাযোগে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন, কৃষি ও শিল্পে উৎপাদন এবং বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনেও দেশ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছার মতো স্বপ্ন দেখার ভিতও রচিত হয়েছে। তবে সেই সাথে বৈষম্য, দুর্নীতি ও নানান অপরাধ বেড়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার ও জনজীবনে ভোগান্তি বেড়েছে। নৈতিক অবক্ষয়ের কথা আরেকবার বলতে হবে। এর মধ্যে রাজনীতি কি সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে? স্বাধীনতোত্তর কিংবা কালান্তরের নতুন রাজনীতির কোনো ইশারা কি মিলছে? বর্তমানে রাজনীতি যে জনবিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং ক্ষমতা যে জন-অংশগ্রহণের বিষয়ে উদাসীন তা বোঝা গেছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতার জম্মশতবর্ষ উদযাপন থেকে। দুটিই মূলত সরকারিভাবে বড় আকারে হয়েছে, সমাজ ও জনপরিসরে তেমন কোনো আয়োজন লক্ষ্য করা যায়নি। এসবই রাজনীতির অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়। এর মধ্যে ইউরোপের যুদ্ধের প্রভাবে অর্থনীতিতে চাপ বাড়লেও অন্তত গত এক যুগে ব্যাপক কর্মকাণ্ড ও উৎসব-উদযাপনে গণমাধ্যমসহ নানা স্তরের মানুষের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক গাঢ় হয়েছে। তার মধ্যে সংবাদকর্মীরা বাদ নেই। কিন্তু নীতি ও আদর্শ রক্ষা এবং সমাজে ন্যায়ের ভিত্তি রক্ষার জন্য, অন্তত স্বাধীন মত প্রকাশে যাদের অগ্রভূমিকা নেয়ার কথা সেই শিক্ষকসমাজ ও গণমাধ্যমকর্মীদের কি স্বতন্ত্র কন্ঠস্বর শোনা গেছে? যাচ্ছে?

সিনিয়র সাংবাদিক অজয় দাস গুপ্ত তার বক্তৃতায় বলেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে মতিউর রহমান চৌধুরী একটি অধ্যায়। এবিএম মূসা-সেতারা মূসা ফাউন্ডেশন এবার একজন যোগ্য মানুষকে সম্মানিত করেছে। তিনি বলেন, কাগজে রিপোর্টিংয়ে মতিউর রহমান চৌধুরী নতুন ধারা তৈরি করেছেন। তিনি এখনও একজন রিপোর্টার। এবং একজন আদর্শ রিপের্টার হয়ে থাকবেন তিনি। এবিএম মূসা আর মতিউর রহমান চৌধুরীর মধ্যে একটা মিল আছে। সেটা হলো- সংবাদপত্র আর ইলেক্ট্রনিক্স মাধ্যম দুটোই মানিয়ে নিয়েছেন তারা। এবিএম মূসার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, মূসা ভাই যখন টকশোতে থাকতেন তখন দর্শকরা একটা বার্তা পেতেন। তিনি সত্যের পথে সব সময় চলেছেন। সংবাদপত্রের বড় বিজ্ঞাপনতার বিরুদ্ধেও লিখতেন। ঝুঁকি আছে এমন বিষয়ও পত্রিকায় প্রকাশ করতেন।

সমকাল সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন বলেন, মতিউর রহমান চৌধুরী বাংলাদেশে একটি ট্যাবলয়েড দৈনিক প্রকাশনায় সফল হয়েছেন। আকারে ট্যাবলয়েড হলেও চরিত্রে মানবজমিন একটি গুরুত্বপূর্ণ দৈনিক। তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, সাহসী হতে হবে। পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তিনি বলেন, একদিকে সংবাদপত্রের চ্যালেঞ্জ বাড়ছে অন্যদিকে পাঠক কমছে। আবার সরকারের প্রবল চাপও আছে। তিনি বলেন, আামাদের অর্জন হলো- ওস্তাদ হিসেবে মূসা ভাইকে পেয়েছিলাম।

নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা হক মিনু বলেন, এবিএম মূসা ও সেতারা মূসা দুজনই সক্রিয় সাংবাদিক ছিলেন এবং আন্তরিক ছিলেন। মূসা ভাই ব্রত নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, আজ যিনি সমম্মাননা পেলেন তিনি আমার সাবেক সহকর্মী, মতি ভাই তার কাজের স্বীকৃতির মাধ্যমেই এই পুরুস্কার পেয়েছেন।

সভাপতির বক্তব্যে প্রফেসর গোলাম রহমান বলেন, এবিএম মূসা নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান ছিলেন। তিনি ছিলেন সাংবাদিকতার একজন শিক্ষক। তিনি যতটা বলতে পারতেন তার চেয়ে ভালো লিখতেন। পেশাদারিত্বের জায়গায় তিনি নিজেকে প্রমাণ করে গেছেন। তিনি বলেন, যোগ্যদের সম্মানিত করা সম্মানের কাজ। আমরা যেন যোগ্যদের সম্মান দিতে পারি সেই কাজটা করে যাবো।

সিনিয়র সাংবাদিক শফিকুল করিম সাবু তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, সাংবাদিক বন্ধু হিসেবে মতিউর রহমান চৌধুরীকে কাছে থেকে দেখেছি। তিনি কখনও আপস করেননি। সামনের দিনেও তিনি সাহসের সঙ্গে সংবাদ প্রকাশ করে যাবেন এটিই সবাই প্রত্যাশা করে।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট কবি ও সাংবাদিক হাসান হাফিজ বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় সত্য প্রকাশে নির্ভীক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন মতিউর রহমান চৌধুরী। ইতিহাসে তার অবদান লেখা থাকবে। প্রয়াত সাংবাদিক এবিএম মূসার টেলিভিশনে দেয়া বক্তব্যগুলোর একটি সংকলন প্রকাশের পরামর্শ দেন তিনি।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD