বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ০১:১২ অপরাহ্ন




দিনাজপুরে জমে উঠেছে লিচুর বাজার, দাম দ্বিগুণ

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৯ মে, ২০২৩ ১১:২৫ am
Lychee Plant Litchi chinensis লেচু সোপবেরি সেপিন্ডাসিয়ার লিচি লিচু
file pic

‘লিচুর রাজ্য’ খ্যাত দিনাজপুরে জমে উঠেছে বেচাকেনা। এরই মধ্যে বাজারে এসেছে মাদ্রাজি, বেদানা, বোম্বাই ও চায়না-থ্রি জাতের লিচু। বর্তমানে ১০০ লিচু সর্বনিম্ন ৪০০ ও সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। শুরুতেই ভালো দাম পেয়ে খুশি চাষিরা। তবে দাম বেশি হওয়ায় অস্বস্তিতে ক্রেতারা।

চাষিরা বলছেন, দাম ভালো পাচ্ছেন। পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার দাম অনেক বেশি। ক্রেতারা বলছেন, গতবারের চেয়ে দাম দ্বিগুণের বেশি। এত দাম দিয়ে লিচু কিনে খাওয়া সাধ্যের বাইরে।

জেলার সবচেয়ে বড় লিচুর বাজার বসে শহরের কোতোয়ালি থানার সামনে নিউমার্কেটে। এই মার্কেটের পুরোটাই এখন ভরে উঠেছে লিচুতে। প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দোকানগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় থাকে। সবুজ পাতা বিছিয়ে তার ওপর স্তূপ করে বিভিন্ন লিচু সাজিয়ে রেখেছেন চাষি ও বাগানিরা।

রবিবার (২৮ মে) সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, সারি সারি ঝুড়িতে লিচু সাজিয়ে রাখা হয়েছে। একদিকে চলছে ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাক। অপরদিকে চলছে দর-কষাকষি। বাজারে মাদ্রাজি, বেদানা ও বোম্বাই জাতের লিচু বেশি দেখা গেলেও খুচরা বাজারে অল্প পরিমাণ দেখা মিলেছে চায়না-থ্রি লিচু।

ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাইকারিতে মাদ্রাজি লিচুর হাজার বিক্রি হচ্ছে ২২০০-২৫০০ টাকা। বেদানার হাজার সাত-১০ হাজার, চায়না থ্রি সাত-আট হাজার এবং বোম্বাই ২২০০-২৫০০ টাকা।

নিউমার্কেটে লিচু কিনতে এসেছেন শহরের বাসিন্দা তাফিক শিশির। দাম শুনে কিছুটা বিব্রত হয়ে তিনি বলেন, ‘ছোট আকারের ১০০ বেদানা লিচুর দাম ৫০০-৭০০ টাকা। বড়গুলোর দাম ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা। অন্যান্য লিচুর দাম আরও বেশি। সবমিলিয়ে এই দামে লিচু কেনা আমার সাধ্যের বাইরে।’

দিনাজপুরে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে আসা ইমন হোসেন বলেন, ‘এখানের লিচুর খ্যাতি দেশজুড়ে। এ জন্য কিনতে এসেছি। চায়না-থ্রি ১০০ লিচু এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০, বেদানা ৭০০-৮০০ টাকা। এ বছর দাম অনেক বেশি। এত দাম দিয়ে লিচু খাওয়ার সামর্থ্য নেই আমার।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেকে দর-কষাকষি করে ফিরে যাচ্ছেন। আবার যারা কিনছেন তারা অল্প পরিমাণ বেশি দামে কিনছেন। অনেকে দাম নিয়ে আছেন অস্বস্তিতে। কারণ গতবার যেসব লিচুর শ’ ২০০-৩০০ বিক্রি হয়েছিল, এবার যেসব লিচু ৫০০-৬০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।

শহরের বাসিন্দা আলামিন বলেন, ‘এবার লিচুর দাম চড়া। এই দাম দিয়ে আমাদের মতো মধ্যবিত্তরা লিচু কিনে খেতে পারবে না। এক পিস লিচুর দাম পড়ছে পাঁচ টাকার ওপরে। অন্যান্য বছর দুই টাকা ছিল, এবার দ্বিগুণেরও বেশি।’

আমার তিনটি বাগান আছে জানিয়ে সদরের উলিপুরের বাসিন্দা রুবেল আলী বলেন, ‘বর্তমানে যে দাম, এতে লাভ হবে। এবার বাগানে উৎপাদন কম হয়েছে। এজন্য দাম বেশি। আবার শ্রমিক খরচও বেশি। ফলে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’

সদরের মাসিমপুরের লিচু চাষি মো. আলম বলেন, ‘আমার বাগানে মাদ্রাজি ও বোম্বাই লিচু আছে। এবার দাম ভালো পাচ্ছি।’

নিউমার্কেটের খুচরা বিক্রেতা খুরশেদ আলম বলেন, ‘ছোট আকারের ১০০ বেদানা লিচু ৫০০-৭০০ টাকা বিক্রি করছি। তবে বড়গুলোর দাম বেশি। আমাদের লাভ সীমিত। ১০-১৫ টাকা লাভ হলে বিক্রি করে দিচ্ছি। তবে অন্যান্য বারের তুলনায় এবার দাম বেশি। কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।’

শহরের আদর্শ ফল ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী মনির হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে বাজারে চায়না, বেদানা, বোম্বাই ও মাদ্রাজি লিচু আছে। ১০০ মাদ্রাজি লিচু ৪০০, বেদানা ৫০০-৯০০, চায়না-থ্রি ৮০০-৯০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। তবে দাম বেশি হওয়ায় ক্রেতা কম।’

গতবারের তুলনায় মাদ্রাজির ফলন কম হওয়ায় দাম বেশি উল্লেখ করে মনির হোসেন বলেন, ‘এ বছর চায়না-থ্রির ফলন ভালো হয়েছে। তবে সব লিচুর দামই গতবারের তুলনায় বেশি। কয়েকদিন পর বাজারের পরিস্থিতি বোঝা যাবে।’

চাঁদপুর থেকে নিউমার্কেটে লিচু কিনতে আসা মোস্তাফা মিয়া বলেন, ‘এখান থেকে নিয়ে চাঁদপুরে বিক্রি করি। চাঁদপুরে মাদ্রাজি লিচুর হাজার ২৬০০-২৭০০ টাকা, বেদানা ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার, বোম্বাই ২৭০০-২৮০০ টাকা বিক্রি করি। কেনার পর পরিবহন, শ্রমিক ও ক্যারট খরচ আছে। এক ট্রাকে লিচু পাঠাই ৩০০ ক্যারট। ক্যারটে খরচ হয় ৩৮ টাকা। গাড়ি ভাড়া দিতে হয় ৩০ হাজার টাকা। সবমিলিয়ে তেমন লাভ হয় না।’

এ বছর কৃষকরা লিচুর দাম ভালো পেয়ে খুশি উল্লেখ করে জেলা ফল আড়তদার সমবায় সমিতির সভাপতি রোস্তম আলী বলেন, ‘কয়েকদিন পর বাজারে ভরপুর লিচু থাকবে। এখনও চায়না-থ্রি ঠিকমতো আসেনি। সামনের দিনগুলোতে মাদ্রাজির হাজার ২৭০০-২৮০০ টাকা, বেদনা ১০ থেকে ১২ হাজার এবং বোম্বাই তিন হাজার থেকে তিন হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হবে।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, জেলায় পাঁচ হাজার ৪৯০ হেক্টর জমিতে লিচুর বাগান আছে পাঁচ হাজার ৪১৮টি। এর মধ্যে বোম্বাই লিচু তিন হাজার ১৭০ হেক্টর, মাদ্রাজি এক হাজার ১৬৬ হেক্টর, চায়না-থ্রি ৮০২ হেক্টর, বেদানা ২৯৫ দশমিক ৫ হেক্টর, কাঁঠালি ৫৬ হেক্টর ও মোজাফফরপুরী ১ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। পাশাপাশি বসতবাড়ির উঠান, বাগানসহ লিচুগাছ আছে প্রায় সাত লাখ। এবার লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১ হাজার ৭৯০ মেট্রিক টন।

গত বছর ২৮ মেট্রিক টন লিচুর ফলন হয়েছে জানিয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক নুরুজ্জামান বলেন, ‘গতবার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ মেট্রিক টন। তবে এবার বোম্বাই ও চায়না-থ্রি জাতের লিচুর ফলন কিছুটা কম। খোঁজ নিয়ে দেখেছি, বাজারে ভালো দাম পাচ্ছেন কৃষকরা।’




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD