রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৬ পূর্বাহ্ন




ডেঙ্গুর ভরা মৌসুমে রক্তের ব্যাগের জন্য হাহাকার

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৩ ১:১৭ pm
blood আইসিইউ রক্ত দান blood donation Cells Plasma Circulation circulating fluid nutrition oxygen রক্ত দান হিমোগ্লোবিন রক্তশূন্যতা হৃৎপিণ্ড ধমনী শিরা তরল যোজক কলা অক্সিজেন কার্বন ডাই অক্সাইড
file pic

ঢাকার রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী সৌরদ্বীপ চারদিন আগে ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে উত্তরার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ভর্তি হন। প্লেইটলেট ২৫ হাজারের নিচে নেমে যাওয়ায় চিকিৎসকদের পরামর্শে রক্ত জোগাড় করতে গিয়ে বিপাকে পড়েন তার স্বজনরা।

সৌরদ্বীপের ভাই সজীব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, অনেক জায়গায় খুঁজেও রক্তের ব্যাগ পাননি তারা। পরে তার বন্ধুরা বিষয়টি কলেজের শিক্ষকদের জানান। তারা পুলিশ হাসপাতাল থেকে রক্তের একটি ব্যাগ যোগাড় করে দিয়েছেন।

“উনাদের সহযোগিতা না পেলে আমার ভাইয়ের জন্য হয়ত রক্ত ম্যানেজ করা সম্ভব হত না,” বলেন সজীব। যাদের ডাবল বা ট্রিপল ব্লাড ব্যাগ লাগবে, তারা রক্ত সংগ্রহে বিপাকে পড়ছেন বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাস্টার্স শেষ করা আবদুল্লাহ অর্পণ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ওয়ারীর শহীদ খালেক-ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তার ভাগ্নে আনিসুর রহমান জানান, অর্পণের অবস্থা সংকটাপন্ন। তার প্লেইটলেট ১১ হাজারে নেমে এসেছে।

“গতকালও প্লেইটলেট ৪৮ হাজার ছিল। আমাদের প্লেইটলেট ম্যানেজ করতে বলল। আমরা ডোনার পেলাম, কিন্তু সমস্যা হল ব্লাড ব্যাগ পেলাম না। নানা জায়গায় খোঁজ করেও পেলাম না। পরে আমাদের বিএসএমএমইউ (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল) থেকে বলল, যদি চারজন ডোনার আমরা দিতে পারি, তবে তারা এক ব্যাগ প্লেইটলেট দিতে পারবে। সে অনুযায়ী ডোনার ম্যানেজ করে কোনোমতে আমরা এক ব্যাগ সংগ্রহ করতে পেরেছি।”

দেশে ডেঙ্গু রোগী বাড়ার মধ্যে ব্যাগ সংকটে রক্ত যোগাড় ও সরবরাহ কমায় চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হওয়ার তথ্য আসছে। ঢাকার ব্লাড ব্যাংকগুলো বলছে, ডেঙ্গু মৌসুমে ব্লাড ব্যাগের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়েছে। এ অবস্থায় ব্যাগ পাওয়া না যাওয়ায় রোগীরা বিপদে পড়ছেন।

ডাবল ও ট্রিপল ব্যাগের জন্য হাহাকার

চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। আট মাসেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক লাখের বেশি, যাদের বেশিরভাগ আবার গত দুই মাসে।

চিকিৎসকরা বলছেন, এ বছর যারা ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের অনেকেই আগেও আক্রান্ত হয়েছেন। ফলে তাদের জন্য ডেঙ্গু জটিল রূপ নিচ্ছে। রোগীরা যেসব জটিলতার মধ্যে পড়েন তার অন্যতম হল রক্তের প্লেইটলেট কমে যাওয়া। আরও কিছু গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে ডেঙ্গু রোগীর জন্য রক্তের প্রয়োজন হয়।

রক্ত সংগ্রহ ও পরিসঞ্চালনে তিন ধরনের (সিঙ্গেল, ডাবল ও ট্রিপল) ব্যাগ ব্যবহার হয়। এর মধ্যে প্লেইটলেট ও প্লাজমা আলাদা করে দিতে প্রয়োজন হয় ডাবল ও ট্রিপল ব্যাগ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আসাদুল ইসলাম বলছেন, ডাবল ও ট্রিপল ব্যাগের সংকট চিকিৎসা সেবা ব্যাহত করছে। “সিঙ্গেল ডোনার থেকে প্লেইটলেট নেওয়ার যে ব্যাগ, সেটার খুব সংকট রয়েছে। আমদানিকারকরা বলছে, তারা ব্যাগ পাচ্ছে না। এখন যেহেতু ব্যাগ নাই, তাই আমরা সেভাবে রক্ত বা প্লেইটলেট দিতে পারছি না।

“এমনিতে আমাদের প্রতিদিন ৫-৬ ব্যাগ প্লেইটলেট লাগে, এখন দরকার হচ্ছে প্রায় ২০ ব্যাগ। আমরা হয়ত ডোনারদের দিয়ে ১০-১২ ব্যাগ দিতে পারছি, বাকিগুলা পারছি না।”

রেড ক্রিসেন্ট ব্লাড ব্যাংকের ইনচার্জ জাহিদুর রহমান জানিয়েছেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার পর ব্লাড ব্যাগের চাহিদা ৪ থেকে ৫ গুণ বেড়ে গেছে। পরিস্থিতি এখন ‘খুব খারাপ পর্যায়ে আাছে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমাদের গতকাল (মঙ্গলবার) একেবারে ব্যাগ ছিল না, অনেককেই ফিরিয়ে দিয়েছি। আমরা ব্যাগ জোগাড় করতে পারলে রক্ত দিতে পারছি, নইলে না। একেবারেই অনিশ্চিত অবস্থা।

“ব্যাগের সংকটের কারণে টাইমলি যখন রক্ত বা রক্তের উপাদান সরবরাহ করা যাচ্ছে না, তখন তো রোগী বিপদে পড়ছে। কারণ, রক্তটা তো জরুরি বিষয়।” বেশ কিছুদিন ধরেই সংকটের মধ্যে আছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “বাজারে আমরা ট্রিপল ব্যাগ অনেক আগে থেকেই পাচ্ছি না। ভাবছিলাম পরে পাব। কিন্তু এখন যে ডাবল ব্যাগ দিয়ে প্লাটিলেট তৈরি করে দিচ্ছিলাম, তাও পাচ্ছি না।” তার ধারণা, বড় সরবরাহকারীরা বেশি দামে অন্যদেরকে এসব ব্যাগ দিচ্ছে। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন ব্লাড ব্যাংকের ল্যাবের সংগঠক শামীমা নাসরিন জানান, নিয়মিত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাগ না পাওয়ায় এখন তারা বিকল্প উপায়ে ব্যাগ সংগ্রহ করে চাহিদা মেটাচ্ছেন।

সরবরাহ সংকটে দামে লাফ

বাংলাদেশ ব্লাড ব্যাংকের ম্যানেজার আজিজ উল্লাহ বলেন, “মাসে ৪০০-৫০০ ব্যাগের প্রয়োজন হয়। গত মাসে কিছু কেনা ছিল, না হলে চলাটা কঠিন হয়ে যেত। তখনই দ্বিগুণের বেশি দাম নিয়েছে; ২৫০ টাকার ডাবল ব্যাগ ৪৫০ টাকা, ৩২০ টাকার ট্রিপল ব্যাগ ৬৫০-৭০০ টাকায় ওঠে গেছে। “ভালো মানের ১৪০ টাকার সিঙ্গেল ব্যাগ ২৪০-২৭০ টাকায় চলে গেছে, কিন্তু এটা পাওয়াই যাচ্ছে না এখন। আরও বিভিন্ন কোয়ালিটির আছে, ১৩০-১৪০ টাকায়। কিন্তু সেগুলো একেবারে নরমাল ব্যাগ। মানটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।”

মেডিকেল সামগ্রীর পাইকারি বাজার পুরান ঢাকার মিটফোর্ডের নাহার হেলথকেয়ারের বিক্রয়কর্মী শাকিল বলেন, “বর্তমানে বাজার প্রতিদিনই চেইঞ্জ হচ্ছে। আজকে চায়না ব্যাগ ৯৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, পরদিন হয়ত ১২০ টাকায় যাচ্ছে; কোনোদিন পাওয়া যাচ্ছে না। ১৪৫ টাকার জেএমএস ব্যাগ এখন ২১০ টাকায় বিক্রি করছি।” নিপা ড্রাগসের মালিক তপন তালুকদার বলেন, “যারা ইমপোর্ট করে তারা হয়ত ইমপোর্ট করতে পারছে না বা শেষ হয়ে গেছে- তাই ডাবল ব্যাগ পাওয়া যাচ্ছে না। যারা ইমপোর্ট করছে তারাই রেট বাড়াচ্ছে।”

কেন এই পরিস্থিতি

বুধবার মিটফোর্ডে গিয়ে দেখা যায়, বেশি দামে সিঙ্গেল ব্যাগ মিললেও ব্যবসায়ীরা ডাবল ও ট্রিপল রক্তের ব্যাগের মজুদ না থাকার কথা বলছেন। ব্যবসায়ী ইমরান রহমান সুমন বলছেন, সিঙ্গেল ব্যাগের চাহিদা বেশি থাকায় সবসময় এটির পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকে। স্বাভাবিক সময়ে ডাবল ও ট্রিপল ব্যাগের চাহিদা খুব কম থাকায় এর আমদানিও কম হয়।

“রক্তের প্লেটলেটের জন্য ডাবল আর ট্রিপল ব্যাগ ব্যবহার হয়, যেগুলো আমাদের কাছে এখন একটাও নাই। হঠাৎ করে ডেঙ্গু বাড়ায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। যেহেতু তেমন প্রয়োজন হয় না, সে কারণে এ ব্যাগগুলো বেশি আনা হয় না। “যখন প্রয়োজন পড়েছে- তখন ডলার সংকটে এলসি খুলতে পারে নাই আমদানিকারকরা। আবার ঔষধ প্রশাসনের অনুমোদন নিতে হয়- সব মিলিয়ে সংকটটা এসেছে।”

আই আর এন্টারপ্রাইজের এই স্বত্তাধিকারী জানান, দেশে মূলত মানসম্মত রক্তের ব্যাগের চাহিদা মেটে জাপানি কোম্পানি জেএমএসের মাধ্যমে। এসব ব্যাগ সিঙ্গাপুর থেকে আমদানি করা হলেও এখন তা বন্ধ।

“যেসব প্রতিষ্ঠান আমাদের থেকে ব্যাগ নিত তাদের আমরা সাপ্লাই দিতে পারছি না। হাসপাতাল থেকে রোগীর স্বজনরাও জরুরি ভিত্তিতে এসে কান্নাকাটি করে, আমরা দিতে পারি না। নিজেদেরও খারাপ লাগে।”

হেলথওয়ের বিক্রেতা গোবিন্দ সাহাও বলেন, “যা আনা হয়েছে সব বিক্রি হয়ে গেছে। এত মানুষ তো কাভার করা সম্ভব না।” তিনি জানান, চাহিদা বাড়ায় ১৯০ টাকার জেএমএস সিঙ্গেল ব্যাগ এখন বিক্রি হচ্ছে ২৩০ টাকায়।

আমদানি নির্ভরতায় ক্ষোভ

বাংলাদেশ মেডিকেল ইকুয়েপমেন্ট ইমপোর্টার্স অ্যান্ড সাপ্লাইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক আরশেদ আলম পুলক বলেন, “আমাদের আমদানির জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদন নিতে হয়, এটা একটা দীর্ঘমেয়াদী ব্যাপার। আরেকটি হচ্ছে- ডলার সংকট, এলসি করা যাচ্ছে না। আবার দামও বেড়ে গেছে। যার কারণে এই প্রসেসটা দীর্ঘায়িত হচ্ছে।”

রক্তের ব্যাগের আমদানিনির্ভরতায় ক্ষোভ প্রকাশ করে রেড ক্রিসেন্ট ব্লাড ব্যাংকের জাহিদুর রহমান বলেন, “৫০ বছরেও আমরা ব্লাড ব্যাগের মত জরুরি বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারলাম না। এখন এলসি করতে পারে না, আনতে পারে না, এয়ারপোর্টে আটকে দেয়- কত কিছু আমাদের বোঝায়! আমার মনে হয়, আমাদের এখন থেকে প্রস্তুতি নেয়া উচিত যেন ব্লাড ব্যাগের জন্য ঝামেলা না হয়।”

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের একজন পরিচালক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন চলমান সংকটের জন্য ব্যবসায়ীদেরই দায় দিচ্ছেন। ‘সংকট তৈরি করা হয়’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “ব্যবসায়ীরা যদি বলে থাকে অনুমোদনের জন্য রক্তের ব্যাগ পাচ্ছে না, তাহলে সেটি ভুল। আমরা শুধু মানের বিষয়টি দেখি। এর সঙ্গে কিছু বিষয় বিবেচনা করে আমদানির অনুমোদন দিই।”

মোজাম্মেল হোসেন বলেন, “এ অবস্থা তৈরি হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার দরকার ছিল। আমাদের দেশে আসলে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কাজ করা হয় না।”




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD