মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১২ অপরাহ্ন




মদীনা শহর ও মসজিদে নববীর ইতিহাস

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: রবিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৩ ২:৩২ pm
মসজিদে নববী মসজিদ নববী Kings Princes World Leaders Visits Prophet Muhammad Masjid Nabawi Madinah Munawwarah Riyadhul Jannah Madina Saudi Arabia Rashol sw Rawja mubarak madinah jannatul baqi Madina Sharif মদিনা শরিফ মদিনা المدينة المنورة আল-মদিনা রওজা শরীফ মদিনা শরীফ
file pic

পবিত্র মসজিদে নববি। সৌদি আরবের মদিনা মুনাওয়ারায় এর অবস্থান। রাসুল (স.)-এর পবিত্র রওজা সংযুক্ত এই মসজিদকে কেন্দ্র করেই ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার দ্বার উন্মোচিত হয়েছিলো। হিজরতের পর রাসুল (স.)-এর নিজ হাতে তৈরি এই মসজিদের সঙ্গে মিশে আছে সারাবিশ্বের মুসলমানের শ্রদ্ধা ও আবেগ।

এই মসজিদ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অবশ্যই যে মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাকওয়ার ওপর প্রথম দিন থেকে তা বেশি হকদার যে, তুমি সেখানে সালাত কায়েম করতে দাঁড়াবে। সেখানে এমন লোক আছে, যারা উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করতে ভালবাসে। আর আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালবাসেন।’ (সুরা তাওবা: ১০৮)

মদীনা প্রসিদ্ধ শহর। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিকট প্রিয় এ শহর, যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করেছেন, বসবাস করেছেন, ইসলামি রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাঁর মসজিদ আছে ও তিনি কবরস্থ হয়েছেন। এ পবিত্র শহর আরও কয়েকটি নামে পরিচিত; ইয়াসরিব, তা-বা, তাইবা, মদীনা ইত্যাদি।

হিজরতের বছর ৬২২ সালে শুরু হয় মসজিদে নববির নির্মাণকাজ। ৬২৩ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সাত মাস সময় লেগেছে কাজ শেষ হতে। মদীনায় প্রবেশের পর রাসুল (স.)-এর উটনি ‘কাসওয়া’ যে স্থানটিতে বসে পড়েছিল, সেই স্থানেই তৈরি করা হয় ঐতিহাসিক মসজিদে নববি। মদিনার দুই এতিম বালক সাহল ও সোহাইলের কাছ থেকে ১০ দিনারের বিনিময়ে জায়গা কিনে নেওয়া হয়, যা হযরত আবু বকর (রা.) পরিশোধ করেন। জমির ছোট এক অংশে রাসুল (স.)-এর জন্য বাসস্থান এবং বাকি পুরো অংশে তৈরি করা হয় মসজিদ।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন; ‘‘হে আল্লাহ! মক্কার ন্যায় অথবা তার চেয়ে অধিক মদীনার মুহাব্বত আমাদের অন্তরে সৃষ্টি করুন। হে আল্লাহ আমাদের খাদ্যে ও উপাদানে বরকত দিন এবং তার আবহাওয়া আমাদের স্বাস্থ্যের উপযোগী করুন”।[1]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় মক্কার চেয়ে দ্বিগুণ বরকত দানের কথা বলে আল্লাহর কাছে দো‘আ করেছেন। এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘ঈমান (শেষ যামানায়) মদীনার পানে ফিরে আসবে যেমন: সাপ নিজ আশ্রয় গর্তে ফিরে আসে’’।

অপর এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি দুঃখ কষ্ট সহ্য করে মদীনায় অবস্থান করবে এবং মদীনায় মৃত্যুবরণ করবে, আমি কিয়ামতের দিবসে তার জন্য সুপারিশ অথবা সাক্ষ্য প্রদানকারী করব”।[2]

মদীনায় বসবাস উত্তম, মদীনার একটি বড় ফযীলত হচ্ছে; নিকৃষ্ট লোকেরা সেখানে অবস্থান করতে পারবে না আর সৎ ব্যক্তিরা সেখানে স্থায়ীভাবে অবস্থান করতে পারে।

মদীনাকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। মদীনায় মহামারী/প্লেগ রোগ ছড়াবে না, মদীনায় দাজ্জাল প্রবেশ করতে পারবে না। মদীনায় সকল রাস্তায় আল্লাহর ফিরিশতাগণ রক্ষী হিসেবে অবস্থান করছেন।[3]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আইর’ ও ‘সাউর’ এর মধ্যস্থলকে মদীনার হারাম বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। মক্কার হারামের মতো এখানকার হারামের অভ্যন্তরে কিছু কাজের বিধি-নিষেধ প্রযোজ্য। মদীনায় প্রচুর পরিমাণে খেজুরের বাগান ও কিছু সমতল ভূমি লক্ষ্যনীয়।[4]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি মসজিদ নির্মাণের নিমিত্তে প্রথমে বনু নদ্বীরের সর্দারের কাছ থেকে খেজুর বাগান ও পরে সুহাইল ও সাহল-এর কাছ থেকে মসজিদের জন্য জায়গা করেন এবং নিজে মসজিদ নির্মাণে অংশ নেন।

আব্দুল্লাহ ইবন উমরের বর্ণনা অনুযায়ী রাসূলের যুগের মসজিদের ভিত্তি ছিল ইটের, ছাদ ছিল খেজুরের ডালের এবং খুঁটি ছিল খেজুরের গাছের কাণ্ডের। সে সময় মসজিদের পরিধি ছিল আনুমানিক ২৫০০ মিটার।

এরপর উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর যুগে এবং ওসমান ইবন আফফান-এর যুগে মসজিদের সম্প্রসারণ ঘটে। পরবর্তীতে বেশ কয়েকজন মুসলিম শাসকের আমলে মসজিদের উন্নয়ন ও সম্প্রসারন ঘটে।

এরপর সৌদি সরকার যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন মসজিদের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়। ১৯৫১ ইং সালে বাদশাহ আব্দুল আযীয মসজিদের উত্তর-পূর্ব ও পশ্চিম দিকের আশেপাশের ঘর-বাড়ি খরিদ করে ভেঙে ফেলেন।

মসজিদের দৈর্ঘ্য ১২৮ মিটার ও প্রস্থ ৯১ মিটার করা হয় এবং আয়তন ৬২৪৬ বর্গ মিটার থেকে বাড়িয়ে ১৬৩২৬ বর্গমিটার করা হয়। মসজিদের মেঝেতে ঠান্ডা মার্বেল পাথর লাগানো হয়। মসজিদের চার কোনায় ৭২ মিটার উচুঁ চারটি মিনার তৈরি করা হয়। এ সম্প্রসারণে ৫ কোটি রিয়াল খরচ হয় ও কাজ শেষ হয় ১৯৫৫ সালে।

বাদশাহ ফয়সাল এর আমলে ক্রমবর্ধমান হাজীদের জায়গার সংকুলান করার জন্য পশ্চিম দিকের জায়গা বৃদ্ধি করা হয় যার আয়তন ছিল ৩৫০০০ বর্গমিটার।

সর্বশেষ ১৯৯৪ সালে বাদশাহ ফাহাদ ইবন আব্দুল আযীয কর্তৃক মসজিদের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ উন্নয়ন ও বিস্তার সাধিত হয়। পূর্ববর্তী মসজিদের আয়তনের তুলনায় নয় গুণ আয়তন বৃদ্ধি করা হয়। মসজিদকে এত সুন্দর করা হয় যা মুসলিমদের অন্তর জয় করে। মসজিদের ছাদ এমনভাবে বানানো হয়েছে যে প্রয়োজনে দ্বিতল বানানো সম্ভব হবে। মূল গ্রাউণ্ড ফ্লোরের আয়তন ৮২০০০ বর্গমিটার হয়। মসজিদের চারপাশে ২৩৫০০০ বর্গমিটার খোলা চত্বরে সাদা শীতল মার্বেল পাথর বসানো হয়। এর ফলে মসজিদের ভিতরে ২৬৮০০০ মুসল্লি এবং মসজিদের বাইরের চত্বরে ৪৩০০০০ মুসল্লির সালাত আদায়ের জায়গা হয়। সম্পূর্ণ মসজিদে এসি, আন্ডারগ্রাউন্ডে ওয়াশরুম ও কার পার্কিং এর ব্যবস্থা করা হয়। মসজিদের কাজ শুরু হয় ১৯৮৫ সালে আর শেষ হয় ১৯৯৪ সালে।

মসজিদে নববীর ভিতরে বেশকিছু ঐতিহাসিক নিদর্শনসমূহ‎ সংরক্ষিত আছে; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর, রিয়াদুল জান্নাহ, আসহাবে সুফফা, নবিজীর মেহরাব ও মিম্বার।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘মসজিদে হারাম ব্যতীত আমার এ মসজিদে (মসজিদে নববী) সালাত অন্য স্থানে সালাতের চেয়ে ১ হাজার গুণ উত্তম, আর মসজিদে হারামে সালাত ১ লক্ষ সালাতের চেয়ে উত্তম”[5]

উসমানি খলিফা সুলতান সুলেমান গম্বুজ মেরামত করেন এবং তার উপর সোনায় মোড়ানো চাঁদ স্থাপন করেন। ১২৭৭ হিজরিতে ফাটল দেখা দিলে সুলতান আব্দুল মাজিদ মসজিদের সংস্কার করেন। তখন মসজিদের আয়তন বেড়ে ১০ হাজার ৩০৩ বর্গমিটার হয়। এসময় তিনি পাঁচটি নতুন দরজা সংযুক্ত করেন এবং ১১ মিটার পর্যন্ত প্রাচীরের উচ্চতা বৃদ্ধি করেন। তাছাড়া ১৭০টি গম্বুজ ও ৬০০টি তেলপ্রদীপ স্থাপন করেন।

১৯০৯ সালে এই মসজিদের মাধ্যমেই আরব উপদ্বীপের বিদ্যুতায়ন শুরু হয়। সৌদি যুগ শুরু হলে বাদশাহ আব্দুল আজিজ ১৯৫০ সালে মসজিদে নববীর পরিধি ১৬ হাজার ৩২৭ বর্গমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি করেন। এসময় মসজিদের স্তম্ভ ছিল ৭০৬টি ও গম্বুজ ছিল ১৭০টি।

বাদশাহ খালিদ বিন আব্দুল আজিজের পরে বাদশাহ ফাহাদের ১৪০৪ হিজরি থেকে দীর্ঘ ১০ বছরের সংস্কার ও সম্প্রসারণে তা নতুন অবকাঠামো লাভ করে। এতে মসজিদের আয়তন বৃদ্ধি পায় ৮২ হাজার মিটার। এসময় চলন্ত সিঁড়ি স্থাপন করা হয়।

সবশেষ এবং সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণের কাজটি করেন বাদশাহ আব্দুল্লাহ। ২০১২ সালে তাঁর সংস্কারের পরে মসজিদে নববী একসঙ্গে ১৮ লাখ মুসল্লির নামাজ আদায়ের জন্য প্রস্তুত হয়।

মসজিদের বর্তমান আয়তন সম্পর্কে সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী ইবরাহিম আসাফ জানান, মূল স্থাপনাটি অন্তত ৬ লাখ ১৪ হাজার ৮০০ বর্গমিটার জায়গাজুড়ে অবস্থিত। আর মসজিদ ও আঙ্গিনা মিলে আয়তন ১০ লাখ ২০ হাজার ৫০০ বর্গমিটার।

‘হজরত মুহাম্মদ ও মদিনার নগরায়ণ’ শীর্ষক এক অনুসন্ধানী রিপোর্টে জানানো হয়, মসজিদে নববির বর্তমান আয়তন নির্মাণকালীন আয়তনের চেয়ে প্রায় শত গুণ বড়। মসজিদের বর্তমান পরিধি প্রাচীন মদিনা নগরীর প্রায় সবটুকু অঞ্চল বেষ্টন করে নিয়েছে এমনকি মদীনা শহরের বাইরে থাকা জান্নাতুল বাকী মদিনার অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ার পাশাপাশি তা মসজিদের নিকটবর্তী হয়ে পড়ে।

উমাইয়া খলীফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের শাসনামলে সংস্কার ও সম্প্রসারণের সময় মসজিদের সঙ্গে রওজাকে সংযুক্ত করে ফেলা হয়। রাসলুল্লাহ (স.)-এর বাসস্থানের কাছেই ছিলো তাঁর মেয়ে হযরত ফাতেমা (রা.) এর বাসস্থান। পরবর্তীতে এটিও মসজিদ স্থাপনার অর্ন্তভুক্ত হয়ে পড়ে।

রাসুল (স.)-এর ইন্তেকালের ৬৫০ বছর পর্যন্ত তাঁর রওজার উপর কোনো প্রকার গম্বুজ ছিলো না। ১২৭৯ সালে মিসরের মামলুক সুলতান সাইফউদ্দীন কালাউনের শাসনামলে প্রথম একটি কাঠের গম্বুজ তৈরি করা হয়। ১৪৮১ সালে মসজিদে নববিতে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে গম্বুজ ধ্বসে পড়ে। এতে নবী (স.)-এর কবর উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। তৎকালীন মিসরের মামলুক সুলতান সাইফউদ্দীন আল-আশরাফ কাইতবে রওজার ওপরে কাঠের তৈরি গম্বুজটি নতুন করে তৈরি করেন এবং একে সীসার পাত দিয়ে ঢেকে দেন।

১৮১৮ সালে ওসমানি সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ কাঠের গম্বুজটির ওপর বর্তমান ইটের তৈরি সবুজ গম্বুজটি তৈরি করেন। বর্তমান গম্বুজটি তৈরি হলে তা-ও প্রথম সাদা রঙে রাঙানো হয়। পরে তা তৎকালীন হিজাজী আরবদের রুচি অনুযায়ী নীল-বেগুনী রঙে রাঙানো হতো। ১৮৩৭ সালে সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদের আদেশে প্রথম গম্বুজটি সবুজ রঙে রাঙানো হয়। সবুজ গম্বুজটি নিচে বর্গাকৃতি এবং উপরে অষ্টভূজ আকৃতিতে তৈরি করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, রাসুল (স.)-এর পাশে হজরত আবু বকর (রা.) এবং হজরত ওমর (রা.)-এর কবর এবং তৃতীয় একটি খালি কবর রয়েছে, যাতে কাউকে দাফন করা হয়নি। কোনো কোনো স্কলারের মতে, হজরত ঈসা (আ.) যখন পুনরায় পৃথিবীতে আসবেন, তখন তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু হওয়ার পর তাঁকে এখানেই দাফন করা হবে।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে মসজিদে নববিতে নামাজ পড়ার তাওফিক দান করুন। প্রিয়নবী (স.)-এর রওজার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর ওপর দরুদ ও সালাম পেশ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

মদীনা ও মসজিদে নববীর ইতিহাস বিস্তারিত জানতে ‘পবিত্র মদীনার ইতিহাস: শাইখ ছফীউর রহমান মোবারকপুরী’ বইটি পড়ুন।

[1] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৮৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩৭৬

[2] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৮৫; সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৭৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩৬৩

[3] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৮০

[4] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৭৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩৭২

[5] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৩৯৬

মসজিদে নববীর লাইব্রেরিতে যা আছে

জ্ঞান অন্বেষণ বা তলবুল ইলম নিঃসন্দেহে অতি মূল্যবান বিষয়। ইসলাম এই জ্ঞান অন্বেষণের মর্যাদা আরো কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সর্বপ্রথম যে ওহি অবতীর্ণ হলো- তা হচ্ছে, (তরজমা) ‘পড় তোমার প্রভুর নামে’। আর আল্লাহ রাসুল (সা.) বললেন, ‘জ্ঞান অন্বেষণ করা (ইলম তলব করা) সকল মুসলিমের উপর ফরজ।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২২৪)

ইলম তলব করা বা জ্ঞান অর্জন করা সব স্থান ও সময়ের জন্যই ফজিলতের এবং সমান বৈশিষ্ট্যের। তবে এর মর্যাদা একটু বেড়ে যায় যখন তা হয় মসজিদে নববীর মত পবিত্র ও মহিমান্বিত জায়গায়। আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ ব্যাপারে বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার এই মসজিদে আসবে কোনো ভালো বিষয় শিখতে বা শেখাতে সে আল্লাহর রাস্তার একজন মুজাহিদের সমতুল্য। আর যে এছাড়া অন্য কোনো কাজে আসবে সে ওই ব্যক্তির মতো যে অন্যের সম্পদের দিকে তাকিয়ে থাকে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২২৭; মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৯৪১৯)

মসজিদে নববীর মাকতাবা বা গ্রন্থাগার সে ধরনেরই একটি জ্ঞানকেন্দ্র। মদিনা মুনাওয়ারার এই মাকতাবা অসংখ্য গ্রন্থাগার ও মাকতাবার মাঝে উল্লেখযোগ্য। এখানে এই ঐতিহাসিক গ্রন্থাগারের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নিয়ে কিছু আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

মসজিদে নববীর লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা

‘খাযাইনুল কুতুবিল আরাবিয়্যাহ’ গ্রন্থের লেখক উল্লেখ করেন যে, মসজিদে নববীর গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ৮৮৬ হিজরির ১৩ রমজানের অগ্নিকাণ্ডের আগে। তাই সেই অগ্নিকাণ্ডে এর অনেক মূল্যবান কিতাব ভষ্মিভূত হয়। যে গ্রন্থাগারে এ সমস্ত নুসখা ছিল সেখানে এছাড়াও অসংখ্য মূল্যবান গ্রন্থ এবং বিশেষ করে অসংখ্য মাখতুতাত বা পান্ডুলিপি ছিল। তবে সেই সংগ্রহশালার জন্য গ্রন্থাগার বা মাকতাবার পরিবর্তে তখন অন্য আরেকটি পরিভাষা ব্যবহার করা হতো আর তা হচ্ছে ‘খিযানাতুল কুতুব’। এবং এর পর থেকে ওলামায়ে কেরামের হাত ধরে স্বাভাবিক ভাবে সামনে অগ্রসর হতে থাকে। পরবর্তীতে সৌদি শাসনামলে ১৩৫২ হিজরিতে তৎকালীন মদিনার ধর্ম ও ওয়াকফ বিষয়ক দায়িত্বশীল উবায়েদ মাদানির পরামর্শে ‘মাকতাবাতুল মাসজিদিন নববী’ নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় এই গ্রন্থাগারের মুদীর বা পরিচালক ছিলেন সাইয়্যেদ আহমাদ খায়্যারি।

তবে আগেই বলেছি, এ গ্রন্থাগার অনেক প্রাচীন। এ কারণে গ্রন্থাগারে এমন অনেক কিতাব রয়েছে যার ওয়াকফের তারিখ বর্তমান নামে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠারও অনেক পূর্বের। যেমন শায়খ মুহাম্মদ আল আজিজ আল-ওয়াজির-এর ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার, যা মসজিদে নববীর জন্য ওয়াকফ করা হয়েছে ১৩২০ হিজরি সনে। এছাড়া পবিত্র রওজা শরিফেও অসংখ্য ওয়াকফকৃত কিতাব ও পাণ্ডুলিপি এ গ্রন্থাগারে সংযোজন করা হয়েছে, যার ওয়াকফের তারিখও মাকতাবা প্রতিষ্ঠার অনেক আগের।

গ্রন্থাগারের অবস্থান

গ্রন্থাগারটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন স্থানে ছিল এর অবস্থান। ২০১০-এর আগ পর্যন্ত গ্রন্থাগারটি মসজিদে নববীর অভ্যন্তরে বাবে ওমর ও বাবে উসমান সংলগ্ন স্থানে দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। আর সে কারণে সাধারণের মুখে মুখে স্থানের কারণে মাকতাবাতু উমর ও মাকতাবাতু উসমান নামে প্রচলিত ছিল। তবে এর একটি সমস্যা ছিল, কিতাবগুলো দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। অর্থাৎ হাদিস, লুগাহ (ভাষা), তারিখসহ (ইতিহাস) কিছু বিষয় ছিল মাকতাবাতু উমারে আর ফিকহ, আদাবসহ অন্য বিষয়গুলো ছিল মাকতাবাতু উসমানে। এতে করে ছাত্র, শিক্ষক, গবেষকসহ সকলের একটু সমস্যা অনুভব হতো। তাই সকলের সুবিধার দিকে লক্ষ্য করে গ্রন্থাগারকে স্থানান্তর করত পশ্চিম দিকে ১২নং গেট সংলগ্ন ছাদের উপর নিয়ে আসা হয় এবং অত্যাধুনিক ব্যবস্থাপনায় সুশৃঙ্খল ও সুবিন্যস্তভাবে সাজানো হয়।

গ্রন্থাগারের বিভিন্ন বিভাগ

(ক) অধ্যয়নকক্ষ : মসজিদে নববীর গ্রন্থাগারের একটি বিভাগ হচ্ছে পুরুষদের জন্য অধ্যয়নকক্ষ। এটি ছাদের উপর অবস্থিত। এতে রয়েছে ৩৫৮টি অত্যাধুনিক সেলফ, ১০০,০০০ পরিমাণ গ্রন্থ এবং গবেষকদের জন্য তিনশত চেয়ার।

(খ) ডিজিটাল গ্রন্থাগার : এতে রয়েছে বিশেষ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কম্পিউটারে অধ্যয়নের সুব্যবস্থা। রয়েছে পান্ডুলিপিসহ অসংখ্য গ্রন্থের বিপুল সমাহার। আর রয়েছে শ্রুতি লাইব্রেরী। যাতে রয়েছে তেলাওয়াত, দুই হারামের জুমার খুৎবার বিশাল সংগ্রহের সাথে সাথে অসংখ্য আলোচনা, দরস ও নসিহত। আর এই ডিজিটাল লাইব্রেরীটি সকলের ব্যবহার উপযোগী করে অনেক পরিপাটি করে সাজানো হয়েছে।

(গ) নির্দিষ্ট অধ্যয়ন কক্ষ : এতে বিশেষ কিছু কিতাব রয়েছে যা একান্ত প্রয়োজনীয় এবং বিশেষ বিশেষ গবেষক ব্যতিত সকলের জন্য যাওয়ার অনুমতি নেই।

(ঘ) সাময়িকী সংগ্রহশালা : এ বিভাগে রয়েছে প্রায় তিন হাজারেরও বেশি সাময়িকী।

(ঙ) দুর্লভ গ্রন্থ বিভাগ : এতে দুর্লভ কিছু কিতাব ও পান্ডুলিপি রয়েছে।

(চ) নারীদের অধ্যয়নকক্ষ : মহিলাদের জন্য মোট ৫টি অধ্যয়নকক্ষ রয়েছে। তিনটি পূর্ব দিকের মহিলাদের নামাযের স্থানে উসমান বিন আফফান নামক ২৪নং গেট সংলগ্ন এবং দুইটি পশ্চিম দিকের নামাযের স্থান ওমর বিন খাত্তাব নামক ১৬নং গেট সংলগ্ন। এই বিভাগটির উদ্বোধন হয় ১৪১৬ হিজরীর জুমাদাল উলার ১ তারিখে।

বিশেষ সংগ্রহশালা

মসজিদে নববীর অভ্যন্তরে বাবে উসমান সংলগ্ন প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় রয়েছে বিশেষ সংগ্রহশালা। এতে রয়েছে কোরআনে কারীম ও অসংখ্য কিতাবের মূল পান্ডুলিপি। এ সমস্ত পান্ডুলিপি মূল নুসখার পাশাপাশি সাথে মাইক্রোফিল্ম ও ডিজিটাল পদ্ধতিতেও সংরক্ষিত রয়েছে। এ সমস্ত কিছুর ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার জন্য রয়েছে কম্পিউটার ও ফটোকপির আধুনিক যন্ত্রপাতি। রয়েছে পান্ডুলিপি সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। দর্শনার্থীদের দেখানোর উদ্দেশ্যে সাজানো আছে ডিসপ্লে টেবিল। যাতে রয়েছে কিছু চমৎকার পান্ডুলিপি এবং কোরআনে কারিমের হস্তলিখিত অতি চমৎকার ছবি। হজের সময় ছাড়াও বিভিন্ন সময় দর্শনার্থীদের জন্য এই সংগ্রহশালা দেখার সুব্যবস্থা আছে।

অডিও লাইব্রেরি বা শ্রুত গ্রন্থাগার

এটি মূলত মসজিদে নববীর ১৭নং দরজার সাথে অবস্থিত। এতে দুই হারামের ইমাম ও খতীব সাহেবদের তেলাওয়াত এবং খুৎবার বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। রয়েছে মসজিদে নববীর সমস্ত মাশায়েখের দরস-তাদরিসের (লেকচার) অডিও ভার্সন। এ সবগুলোই সংরক্ষিত আছে ক্যাসেট সিডিসহ আধুনিক সমস্ত মাধ্যমেই। দর্শনার্থী ও প্রদর্শনার্থীদের মসজিদে নববী কেউ যদি এ সমস্ত কিছু সংগ্রহ করতে চায় তাহলে তা কোনো বিনিময় ছাড়াই হাদিয়ার ব্যবস্থা আছে। তবে কেউ সিডি বা ভিডিওতে পেতে চাইলে অথবা হার্ডডিস্কে নিতে চাইলে তা নিজের পক্ষ থেকে সরবরাহ করতে হবে।

শিল্প ও কারিগরী বিভাগ

গ্রন্থাগারের এ বিভাগটি মূলত বিভিন্ন প্রকারের গ্রন্থ, পান্ডুলিপি ও পত্র পত্রিকার বাধাই, পুনঃবাধাই, মেরামতের কাজ করে থাকে। বাধাইয়ের উপর লেখার জন্য রয়েছে হস্তশিল্পীদের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা। ছাত্র-শিক্ষক এবং গবেষকদের সুবিধার জন্য যেকোনো কিতাব বা পান্ডুলিপির ফটোকপি বা পিডিএফও এই বিভাগ আঞ্জাম দিয়ে থাকে। এ বিভাগের অধীনে যে সমস্ত প্রকল্প রয়েছে তা হচ্ছে : * বিভিন্ন প্রকারের বাধাই প্রকল্প। * কিতাব ও পাণ্ডুলিপির মেরামত ও সংরক্ষণ প্রকল্প। * হস্ত ও মেশিনের মাধ্যমে কিতাবে লিখন প্রকল্প। * ফটোকপি প্রকল্প। এ বিভাগটি মসজিদে নববীর ৯নং গেটে মালিক সাউদ বিন আবদুল আজিজ গেট সংলগ্ন।

ক্যাটালগ ও সরবরাহ বিভাগ

এ বিভাগটিও মসজিদে নববীর ৯নং গেট সংলগ্ন। এখানে ক্যাটালগ বিভাগ মূলত সরবরাহকৃত সমস্ত কিতাবের ক্যাটালগ তৈরীর কাজ করে থাকে। এবং এ সমস্ত কিতাবকে কম্পিউটারাইজড করাসহ আধুনিক বিভিন্ন ব্যবস্থাপনায় পাঠকদের জন্য উপস্থাপনের চেষ্টা করে থাকে।

আর সরবরাহ বিভাগটি গ্রন্থাগারের কিতাব সংগ্রহের কাজ করে থাকে। গ্রন্থাগারের জন্য কিতাব সংগ্রহের পদ্ধতিগুলোর একটি হচ্ছে, তার নিজস্ব কিতাব কেনার বাজেটের মাধ্যমে কিতাব ক্রয় করা। তাছাড়া এমন অনেকেই আছেন যারা তার ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার অথবা নিজস্ব সংগৃহীত বই কিংবা পত্র-পত্রিকা মসজিদে নববীর জন্য জীবদ্দশায় অথবা মৃত্যু পরবর্তী সময়ে ওয়াক্ফ করে যান। এই বিভাগটি সেই সমস্ত কিতাব সংগ্রহ করে তা গ্রন্থাগারের অধীনে আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে।

আবার লেখক গবেষকরাও সরাসরি তাদের রচনা, লিখিত গ্রন্থ মসজিদে নববীর গ্রন্থাগারের জন্য হাদিয়া দিয়ে থাকেন। বাংলাদেশ থেকেও কয়েকজন আলেম ও গবেষকের আরবী ভাষায় লিখিত গ্রন্থ মসজিদে নববীর গ্রন্থাগারের জন্য সরবরাহ করার ব্যবস্থা করেছি। বিশেষত উস্তাযে মুহতারাম মাওলানা আব্দুল মালেক দামাত বারাকাতুহুম ও মাওলানা হিফজুর রহমান সাহেবের কিছু কিতাব সরবরাহ করেছি। এভাবে আরো গ্রন্থ সরবরাহ করার উদ্যোগ নিয়েছি।

মূলত এটি বিশ্বব্যপী নিজের কিতাবের মাধ্যমে তালিবে ইলমদের ফায়দা পৌঁছানোর একটি বিশাল সুযোগ। কিন্তু কেন যেন এ কাজটি এতদিন হয়ে উঠেনি। তাই ইচ্ছা আছে আল্লাহ কবুল করলে ইনশাআল্লাহ আমাদের দেশীয় আলেম গবেষকদের আরবী ভাষায় লিখিত সমস্ত গ্রন্থ সংগ্রহ করে মসজিদে নববীর এই মোবারক গ্রন্থাগারের জন্য সরবরাহ করা।

সংরক্ষণ ও বিতরণ বিভাগ

প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিতাব ছাড়াও একই কিতাবের অতিরিক্ত কপিগুলো সংরক্ষণের জন্য রয়েছে বিশেষ সংরক্ষণ বিভাগ। আবার এই বিভাগের অধীনেই বিশ্বব্যাপী মসজিদ-মাদরাসা ও ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য কিতাব ও কোরআনে কারিম বিতরণের সুব্যবস্থা রয়েছে।

কম্পিউটার বিভাগ

ক্যাটালগ তৈরীর পর কিতাব ও পান্ডুলিপির পরিচিতিকার্ড করে থাকে এই বিভাগ। এবং সাথে সাথে স্ক্যানার-এর মাধ্যমে কিতাব, পান্ডুলিপি ও পত্র-পত্রিকাকে কম্পিউটারে স্থানান্তর করা হয়। যাতে করে পাঠক খুব সহজেই এ থেকে উপকৃত হতে পারে। এছাড়াও রেকর্ডকৃত সমস্ত তেলাওয়াত, খুৎবা, দরস ও আযান এ বিভাগের মাধ্যমে কম্পিউটারে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

অনুবাদ ও গবেষণা বিভাগ

এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ও আধুনিক প্রসঙ্গের বিভিন্ন মাসআলার গবেষণা কার্য পরিচালনা করা হয়। অন্যান্য ভাষা থেকে প্রয়োজন অনুসারে আরবি ভাষায় অনুবাদ করা হয়। এ বিভাগ ওয়াকফ ও হাদিয়াকৃত কিতাবের যাচাই-বাছাইয়ের পর গ্রন্থাগারে রাখার অনুমতি প্রদান করে থাকে। এছাড়াও মসজিদে নববীর গ্রন্থাগারের আরো অনেক বিভাগ ও কার্যক্রম রয়েছে। প্রয়োজন অনুসারে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে।

মহিউদ্দীন ফারুকী। বিশিষ্ট আলেম ও প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, মারকাযুল লুগাতিল আরাবিয়্যাহ, বাংলাদেশ।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD