সাইয়িদুল ইস্তিগফারের অর্থ জানুন এবং মনের সবটুকু আবেগ একত্র করে বুঝে পড়ুন, মানসিক তৃপ্তি আপনার মন ও মানসকে ভরে দেবে। সাইয়িদুল ইস্তিগফারে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং খুবই আকর্ষণীয়। এর মর্যাদাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসে উল্লেখ আছে ‘যে ব্যক্তি দিনে (সকালে) দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে এ ইস্তিগফার পড়বে আর সন্ধ্যা হওয়ার আগেই মারা যাবে, সে জান্নাতি হবে। আর যে ব্যক্তি রাতে (প্রথম ভাগে) দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে এ দোয়া পড়বে আর সে ভোর হওয়ার আগেই মারা যাবে সে জান্নাতি হবে।’ আরবি দোয়া বঙ্গানুবাদসহ পূর্ণ হাদিসটি নিচে আপনাদের সৌজন্যে পেশ করা হলো। তবে সঠিক আরবি উচ্চারণের জন্য সংশ্লিষ্ট হাদিস বা অন্য কোনো দোয়ার কিতাব থেকে দেখে নেবেন।
শাদ্দাদ ইবনে আউস রা: থেকে বর্ণিত- নবী সা: বলেন, সাইয়িদুল ইস্তিগফার হলো- আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বি, লা-ইলা-হা ইল্লা আনতা খালাক্বতানি, ওয়া আনা আবদুকা, ওয়া আনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়াদিকা মাসতাত্বাতু, আউজুবিকা মিন শাররি মা ছানাতু। আবুউ লাকা বিনিমাতিকা আলাইয়া ওয়া আবুউ বিজাম্বি, ফাগফিরলি ফাইন্নাহু লা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা। অর্থাৎ- ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার রব।
তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তুমিই আমাকে সৃষ্টি করেছ আর আমি তোমার গোলাম। আমি আমার সাধ্যমতো তোমার সাথে কৃত প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গীকারের ওপর দৃঢ়ভাবে কায়েম আছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমি আমার ওপর তোমার দেয়া অনুগ্রহের কথা স্বীকার করছি এবং আমি আমার গুনাহের কথা স্বীকার করছি। অতএব তুমি আমাকে ক্ষমা করো। কেননা তুমি ব্যতীত পাপগুলো ক্ষমা করার কেউ নেই।’ ‘যে লোক সন্ধ্যা বেলায় এ দোয়া পড়বে, আর এ রাতেই মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। রাবি বলেন, অথবা তিনি বলেছেন, সে হবে জান্নাতি। আর যে লোক সকালে এ দোয়া পড়বে আর এ দিনই মারা যাবে সেও তেমনি জান্নাতি হবে’ (বুখারি-৬৩২৪, ৬৩০৬)।
দোয়াটিতে গোলাম-মালিকের সম্পর্ক অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় পরিস্ফুট হয়েছে। আল্লাহকে নিজের রব এবং নিজেকে তাঁর নগণ্য একজন গোলাম বা দাস ভেবে যখন অত্যন্ত মনোনিবেশসহকারে দোয়াটি পড়া হয় তখন নিজের মধ্যে বিশেষ একটি ভাব সৃষ্টি হয়। এ জন্য রাসূলুল্লাহ সা: এটিকে ‘সাইয়িদুল ইস্তিগফার’ তথা ক্ষমা প্রার্থনার প্রধান দোয়া হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। প্রত্যেক মুসলমানকে অর্থসহকারে দোয়াটি মুখস্থ করা প্রয়োজন এবং অর্থের দিকে লক্ষ রেখে নিজের মধ্যে সব আবেগকে জড়ো করে সকাল-বিকাল তা পড়া উচিত।
ইস্তিগফার মানে ক্ষমা প্রার্থনা করা। ইস্তিগফারের বিভিন্ন দোয়া কুরআন ও হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি। সালাত শেষ করার সাথে সাথে তিনবার ‘আসতাগফিরুল্লাহ’ বলা সুন্নাহ কর্তৃক স্বীকৃত। প্রথম সাজদা থেকে মাথা তুলে দ্বিতীয় সাজদায় যাওয়ার আগে দুইবার রাব্বিগফিরলি, ইগফিরলি’ বলা সুন্নাহ। এভাবে বিভিন্ন সময় আমরা ইস্তিগফার করে থাকি। এসব ইস্তিগফারের প্রধান ইস্তিগফার হলো- সাইয়িদুল ইস্তিগফার। আল-কুরআনের বিভিন্ন স্থানে ইস্তিগফার করার নির্দেশ এসেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘আমি বলেছি তোমরা নিজেদের রবের কাছে ইস্তিগফার করো বা ক্ষমা চাও। নিঃসন্দেহে তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল। তিনি আকাশ থেকে তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষাবেন। সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন, তোমাদের জন্য বাগান সৃষ্টি করবেন আর নদী-নালা প্রবাহিত করে দেবেন’ (সূরা নূহ : ১০-১২)।
আব্দুল্লাহ ইবনে বিসর রা: থেকে বর্ণিত- তিনি রাসূলুল্লাহ সা: থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘ধন্য সেই ব্যক্তি, যার রেকর্ডে অনেক ইস্তিগফার পাওয়া যায়’ এবং রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ভালোবাসে যে কিয়ামতের দিন তার রেকর্ড তাকে খুশি করুক, সে যেন বেশি করে ইস্তিগফার করে’ (ইবনে মাজাহ ও নাসায়ি, উভয়ে হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন)। বেশি বেশি ইস্তিগফার বা ক্ষমা চাওয়া নবী, আসহাবে রাসূল সা: এবং রাসূলদের বৈশিষ্ট্য। নবী সা: আমাদেরকে বেশি বেশি ইস্তিগফার করার তাগিদ দিয়েছেন। এটি দুঃখ-কষ্ট ও দুশ্চিন্তা দূর করার একটি বড় মাধ্যম। ঘন ঘন ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করলে সন্তানদের রিজিক ও বরকত বৃদ্ধি পায়। আর রাসূল সা: বলতেন, ‘হে লোক সকল! তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তাওবাহ করো, কারণ আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং প্রতিদিন ১০০ বার তাঁর কাছে তাওবাহ করি।’
উপরের আয়াতে মহান দাতা আল্লাহ সেই নিশ্চয়তা দিয়েছেন, ‘তিনি আকাশ থেকে তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষাবেন। সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন, তোমাদের জন্য বাগান সৃষ্টি করবেন আর নদী-নালা প্রবাহিত করে দেবেন।’ কুরআন মাজিদের বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে, আল্লাহদ্রোহিতার আচরণ মানুষের জীবনকে শুধু আখিরাতেই নয় দুনিয়াতেও তার জীবন সঙ্কীর্ণ করে দেয়। অপরপক্ষে কোনো জাতি যদি অবাধ্যতার বদলে ঈমান, তাকওয়া ও আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার পথ অনুসরণ করে তাহলে তা শুধু আখিরাতের জন্যই কল্যাণকর হয় না, দুনিয়াতেও তার ওপর আল্লাহর অশেষ নিয়ামত বর্ষিত হতে থাকে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘আহলে কিতাব যদি তাদের রবের পক্ষ থেকে প্রেরিত তাওরাত, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাবের বিধানাবলি মেনে চলত তাহলে তাদের জন্য ওপর থেকেও রিজিক বর্ষিত এবং নিচ থেকেও ফুটে বের হতো’ (সূরা মায়িদা-৬৬)। ‘জনপদের লোকেরা যদি ঈমান আনত এবং তাকওয়ার নীতি অনুসরণ করত তাহলে আমি তাদের জন্য আসমান ও জমিনের দরজাগুলো খুলে দিতাম’ (সূরা আরাফ-৯৬)। একবার দুর্ভিক্ষের সময় হজরত উমর রা: বৃষ্টির জন্য দোয়া করতে বের হলেন এবং শুধু ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করেই শেষ করলেন। সবাই বলল, ‘হে আমিরুল মু’মিনিন আপনি তো আদৌ দোয়া করলেন না। তিনি বললেন, আমি আসমানের ওই সব দরজায় করাঘাত করেছি যেখান থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হয়। এ কথা বলেই তিনি সূরা নূহের ১০, ১২ ও ১৩ নম্বর আয়াত পাঠ করে শোনালেন (ইবনে জারির ও ইবনে কাসির)।
আল্লাহ তাঁর বান্দাকে এ শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছেন, কোনো মানুষের দ্বারা দ্বীনের যত বড় খিদমতই সম্পন্ন হোক না কেন, তাঁর পথে যত ত্যাগ ও কোরবানি স্বীকার করুক না কেন এবং তার ইবাদত-বন্দেগি করার ব্যাপারে যতই প্রচেষ্টা ও সাধনা চালাক না কেন, তার মনে কখনো এ ধরনের চিন্তার উদয় হওয়া উচিত নয় যে, তার ওপর তার রবের যে হক ছিল তা সে পুরোপুরি আদায় করে দিয়েছে; বরং সবসময় তার মনে করা উচিত যে, তাঁর হক আদায় করার ব্যাপারে যেসব দোষ-ত্রুটি সে করেছে তা মাফ করে দিয়ে যেন তিনি তার এ নগণ্য খিদমতটুকু কবুল করে নেন। এ আদব ও শিষ্টাচার আল্লাহ তাঁর রাসূলের মাধ্যমে অনাগত আল্লাহর বান্দাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। তাই কোনো মুসলিম নিজের আমলকে যথেষ্ট মনে করার কোনো অবকাশ নেই। আল্লাহর যে হক তার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল তা সে আদায় করে দিয়েছে এ অহঙ্কারে মত্ত হওয়ার কোনো সুযোগই কি তার থাকে। কোনো সৃষ্টিই আল্লাহর হক আদায় করতে সক্ষম হবে, এ ক্ষমতাই তার নেই। অবশ্যই তাকে আল্লাহর অনুগ্রহ ও ক্ষমার মুখাপেক্ষী হতেই হবে। এতক্ষণ এ আলোচনা থেকে এ কথা প্রতিষ্ঠিত হলো, যারাই এ পথের সংগ্রামে নিয়োজিত থাকবেন তাদেরকে হরহামেশাই ইস্তিগফার, তাসবিহ, তাহলিল করতে হবে। কারণ যার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এ মিশনের পথ চলা হচ্ছে, যে পথে অসংখ্য কাঁটার আঘাত রয়েছে, যে পথটি কণ্টকাকীর্ণ, যে পথ অবশ্যই মসৃণ নয়, সে পথের অনুসারী তার মালিকের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকবে না, তা কী করে হয়। যে পথ উত্তাল তরঙ্গমালার ভেতর দিয়ে গেছে, যে পথের প্রতিটি পয়েন্টে পয়েন্টে শয়তান তার অনুসারীদের পাহারায় নিয়োজিত করে রেখেছে, সেই পথ পাড়ি দিতে আপনার মাঝিমাল্লার প্রাচুর্য ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত যত সমর্থনই থাকুক না কেন, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া আপনি এ পথ পাড়ি দিতে পারবেন না। যেকোনো পয়েন্টে শয়তানের সাথে আপনার সাক্ষাৎ হবেই এবং সে আপনাকে যেকোনো প্রকারেই হোক পদচ্যুত করতে চাইবে। সে সময় আল্লাহর সাথে আপনার গভীর সম্পর্কই আপনাকে মুক্তি দিতে পারে। বেশি বেশি ইস্তিগফার দ্বারা আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।
যখনই কোনো বিজয় লাভ হবে তখন এ বিজয়কে নিজেদের কৃতিত্ব মনে করা গর্ব-অহঙ্কারেরই নামান্তর। জয়-পরাজয়, শক্তি-সামর্থ্য ও অন্যান্য উপায়-অবলম্বন সবই আল্লাহর দান। এ জন্য কোনো গর্ব-অহঙ্কারে মত্ত না হয়ে বরং রবের সামনে দীনতার সাথে মাথা নত করে হামদ, সানা ও তাসবিহ পড়তে এবং তাওবাহ ও ইস্তিগফার করতে থাকবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘যখন আল্লাহর সাহায্য এসে যায় এবং বিজয় লাভ হয়। আর (হে নবী) যদি তুমি দেখো মানুষ দলে দলে আল্লাহর দ্বীন গ্রহণ করছে। তখন তুমি তোমার রবের হামদ-সহকারে তাঁর তাসবিহ পড় এবং তাঁর কাছে ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করো। অবশ্যই তিনি বড় তাওবাহ কবুলকারী’ (সূরা নাসর)। হামদ মানে মহান আল্লাহর প্রশংসা করা এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। আর তাসবিহ মানে আল্লাহকে পাকপবিত্র ও পরিচ্ছন্ন এবং দোষ-ত্রুটিমুক্ত গণ্য করা। আর ইস্তিগফার মানে আল্লাহর কাছে নিজের ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা।
জাফর আহমাদ