প্রাণঘাতী ডেঙ্গু মশার আক্রমণ ব্যাপক বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছে সরকার। এই অর্থে তৈরি করা প্রকল্পে নানা খাতের অত্যধিক ব্যয় প্রস্তাবের চিত্র খুঁজে পায় পরিকল্পনা কমিশন।
এ পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি করা যুক্তিযুক্তকরণ কমিটির চাপাচাপিতে কমছে প্রায় ১৭ খাতের ব্যয়। এতে অতিরিক্ত খরচের হাত থেকে বেঁচে যাবে শতকোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে স্থানীয় ও বৈদেশিক প্রশিক্ষণ এবং পরামর্শক খাতের ব্যয়ও রয়েছে। ‘ইমপ্রুভমেন্ট অব আরবান পাবলিক হেলথ প্রিভেনটিভ সার্ভিস’ শীর্ষক প্রকল্পে এসব ব্যয় প্রস্তাব করেছিল স্থানীয় সরকার বিভাগ। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৮৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ২১৪ কোটি ৭৪ লাখ এবং বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে ১ হাজার ৭৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। দ্রুত প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু করার জন্য প্রস্তাব পাওয়ার পর ২৫ জুলাই আয়োজন করা প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা। সেখানে বিভিন্ন ব্যয় প্রস্তাবে অসঙ্গতি ধরা পড়ে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে একটি ব্যয় যুক্তিযুক্তকরণ কমিটি গঠন করা হয়। ১০ সেপ্টেম্বর এ কমিটির আহ্বায়ক পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মাহবুবুল ইসলাম প্রধানের সভাপতিত্বে একটি সভা হয়েছে। এতে বিভিন্ন খাতের প্রাক্কলিত ব্যয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ বৃহস্পতিবার বলেন, প্রকল্পের আওতায় যেসব কম্পোনেন্ট আছে সেগুলো ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করলে অনেক বেশি অপব্যয় কমানো সম্ভব ছিল। এছাড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিল যেততেনভাবে প্রস্তাব না করে যুক্তিযুক্তভাবেই ব্যয় প্রস্তাব করা। সেটি যখন হয়নি, তখন পিইসি সভাতেই আলোচনা করে অনেক অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত ব্যয় কমানো যেত। এজন্য ব্যয় যুক্তিযুক্তকরণ কমিটির কোনো প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয় না। এছাড়া এ কমিটিও অনেক ব্যয় সুনির্দিষ্টভাবে না কমিয়ে যুক্তিযুক্তকরণ করতে বলেছে। এটিও ঠিক হয়নি।
ব্যয় যুক্তিযুক্তকরণ কমিটির সভা সূত্র জানায়, প্রকল্পে বাল্ক এসএমএস খরচই ধরা হয়েছিল ৫ কোটি টাকা। কিন্তু কমিটি বলেছে এ খাতে ২ কোটি টাকা রাখতে হবে। ফলে বেঁচে যাচ্ছে ৩ কোটি টাকা। এছাড়া এফএম রেডিওতে প্রচার খাতে ধরা হয় ১০ কোটি টাকা। এখানে ৫ কোটি কমিয়ে ৫ কোটি বরাদ্দ ধরতে বলা হয়েছে। ম্যাস নোটিশ সার্কুলেশন খাতে চাওয়া হয় ১২ কোটি টাকা। এখানে ৮ কোটি কমিয়ে ৩ কোটি টাকা রাখতে বলা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় রিপিয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স খাতে সাড়ে ১২ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু পরে সাড়ে ৫ কোটি টাকা কমিয়ে ধরা হয়েছে ৭ কোটি টাকা। প্রকল্পে নতুনভাবে কেনা কম্পিউটার, আসবাবপত্র ও অফিস সরঞ্জামাদির বিপরীতে মেরামত বাবদ যে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে তা কমানোর প্রয়োজন বলে সভায় মত দেওয়া হয়।
সভায় স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিনিধি জানান, মূলধন ও রাজস্ব খাতে বিভিন্ন আইটেমের বিপরীতে ভ্যাট ও আইটি বাবদ প্রস্তাব করা হয়েছে ১১৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এ খাতে ৭৩ কোটি ৪ লাখ টাকা কমিয়ে ৪৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা ধরতে বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে ৩টি জিপ কিনতে অর্থ বিভাগের অনুমতি পাওয়া গেলে সেক্ষেত্রে গ্যাস বা ফুয়েল বাবদ প্রস্তাবিত সাড়ে ৩ কোটি টাকা যৌক্তিক পর্যায়ে কমাতে হবে। অথবা এ খাতের ব্যয় প্রস্তাব বাদ দিতে বলা হয়েছে।
সভায় অংশ নিয়ে একজন উপপ্রধান বলেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্প ঋণে রাজস্ব ও মূলধন খাতে বিভিন্ন অঙ্গের বিপরীতে প্রস্তাবিত ব্যয় অত্যধিক ধরা হয়েছে। আবার কোনো কোনো খাতের ব্যয় যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।
সভা সূত্র আরও জানায়, স্থানীয় প্রশিক্ষণ খাতে চাওয়া হয়েছে ৯৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এ খাতে ব্যয় অত্যধিক ধরা হয়েছে। তাই প্রশিক্ষণের ধরন বা প্রকৃতি, প্রশিক্ষণার্থীদের সংখ্যা এবং বিধি অনুযায়ী প্রশিক্ষণার্থীদের ভাতা দেওয়াসহ এ খাতে ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে কমাতে বলা হয়েছে। বৈদেশিক প্রশিক্ষণের জন্য চাওয়া হয়েছে ১০ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে বলা হয়েছে, প্রকল্পের উদ্দেশ্যের সঙ্গে মিল রেখে নতুন প্রযুক্তি বা জ্ঞান আহরণের জন্য মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রাজিল বা আফ্রিকার কোনো দেশে বৈদেশিক প্রশিক্ষণ হতে পারে। কিন্তু এ খাতে যে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে তা যৌক্তিক পর্যায়ে কমাতে হবে।
এছাড়া মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন স্পেশালিস্ট হিসেবে ২ জনের পরিবর্তে একজনসহ মোট ১২ জন পরামর্শক রাখতে বলা হয়েছে। তবে এ খাতে প্রস্তাবিত ব্যয়ও যৌক্তিক করতে হবে। যুক্তিযুক্তকরণ কমিটি বলেছে, প্রশাসনিক বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাবদ ধরা হয়েছে ১৭৯ কোটি ১০ লাখ টাকা, যা অত্যধিক। এই খাতের ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে কমাতে হবে। আরও আছে মশা ব্যবস্থাপনার জন্য চাওয়া ১০ কোটি টাকা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি খাতে ২৫ কোটি টাকা, যা অত্যধিক।
এছাড়া বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ক্রয় খাতে ২০ কোটি, মশা মারার ওষুধ বাবদ ১০ কোটি, মশা নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত যন্ত্রপাতির জন্য ২২ কোটি ১০ লাখ এবং বায়ু ও শব্দদূষণ কমানো খাতে ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের বিশেষজ্ঞের মতামত নিয়ে যৌক্তিকতার ভিত্তিতে ব্যয় পূর্ণ নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে।