প্রথমে শরীরের অবাঞ্চিত লোম, নখ ইত্যাদি কেটে গোসল করে, পুরুষের জন্য শরীরে আতর লাগিয়ে ইহরামের কাপড় পরিধান করা। ইহরামের কাপড় পরিধানের পর আর আতর লাগানো যাবেনা। টুপি পরা যাবে না। পায়ের পেছনে গোড়ালি ঢাকা থাকে এমন কোনো জুতা পরা যাবে না। বিবাহ সম্পর্কিত কোনো আলাপ আলোচনা করা যাবে না। কোনো প্রাণী শিকার বা হত্যা করা যাবে না। ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হওয়া যাবে না। কোনো তর্ক করা যাবে না।
উমরাহ’র প্রথম কাজ ইহরাম বাঁধা। যেখান থেকে ইহরাম বাঁধতে হবে, তাকে ‘মিকাত’ বলে। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিকাত নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। ৫টি মিকাত রয়েছে। এর কোনো একটি হতে ইহরাম বাঁধতে হবে। প্লেনে গেলে মিকাত এলে ঘোষণা দেয়া হবে। তখন পুরুষরা শব্দ করে বলবে আর আর মহিলারা নিঃশব্দে বলবে-
‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা উমরাতান’।
এর মাধ্যমেই উমরাহ’র কাজে আনুষ্ঠানিক প্রবেশ শুরু। উমরাহ’র প্রথম ফরজ এটিই। এরপর থেকে তালবিয়া অর্থাত নিচের দোয়া পাঠ শুরু হবে।
(লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারিকা লাক)।
অর্থ: ‘আমি হাজির, হে আল্লাহ, আমি হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয় যাবতীয় প্রশংসা, নিয়ামত এবং রাজত্ব আপনার, আপনার কোনো শরিক নেই।
এই দোয়া পুরুষরা শব্দ করে পাঠ করবে আর মহিলারা নিঃশব্দে। তাওয়াফ করার আগে তালবিয়া পাঠ বন্ধ করতে হবে। অর্থাত কাবা ঘরে ডান পা দিয়ে প্রবশের পর তালবিয়া পাঠ বন্ধ করতে হবে। যে কর্নার বা কোণায় হাজারে আসওয়াদ আছে, সে কর্নারে গিয়ে পুরুষরা ডান কাঁধ খোলা রেখে হাজারে আসওয়াদ চুম্বন করে বা স্পর্স্ব করে, তাও সম্ভব না হলে সেদিকে ডান হাতে ইশারা করে বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবর বলে কাবাকে বামদিকে রেখে তাওয়াফ শুরু করতে হবে।
৭ চক্করে ১ তাওয়াফ। ১ম ৩ চক্করে সৈনিকের মতো দৌড়ানোর ভান করে কাবা প্রদক্ষিণ করতে হয়। তাওয়াফ কালে যেকোনো দোয়া করা যায়। প্রতিটি চক্করে হাজারে আসওয়াদের আগের কর্নারে (রুকনে ইয়ামানি) হাত দিয়ে স্পর্ষ করা সুন্নাত। সম্ভব না হলে তাওয়াফ চালিয়ে যেতে হবে। রুকনে ইয়েমানি হতে হাজারে আসওয়াদ পর্যন্ত প্রতিটি চক্করে এই দোয়া করা সুন্নাত-
‘রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়াকিনা আজাবান্নার।’
অর্থ: হে আমার প্রভু! আমাকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন, আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচান।
বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করলে একটি গোলাম আযাদের নেকি পাওয়া যাবে। প্রত্যেক পদক্ষেপে একটি পাপ মিটে যাবে এবং ১টি নেকি লেখা হবে।
প্রতিটি চক্করের শুরুতেই হাজারে আসওয়াদ বরাবর ডান হাতে ইশারা করে বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবর বলে চক্কর শুরু করতে হয়। ৭ম চক্করের শেষে আর ইশারা নয়, কারণ চক্করের শুরুতেই এটি হয়ে গেছে। ৭ম চক্কর শেষ হয়েছে মানে তাওয়াফ শেষ হয়েছে। এটি উমরাহ’র ২য় ফরজ কাজ।
এবার ওই যে তাওয়াফ শুরুর আগে ডান কাঁধ খোলা রেখেছিলেন, সেইটা এবার আবৃত করে কাবা ও মাকামে ইব্রাহীমকে সামনে রেখে ২ রাকায়াত নামাজ আদায় করা ওয়াজিব। ভীড়ের কারণে ওখানে আদায় সম্ভব না হলে কাবা ঘর অর্থাত মাসজিদুল হারামের যেকোনো জায়গায় আদায় করলেই চলবে। ১ম রাকায়াতে সূরা ফাতিহার সাথে সূরা কাফিরুন ও ২য় রাকায়াতে সূরা ফাতিহার সাথে সূরা ইখলাস। এরপর দাঁড়িয়ে জমজমের পানি পান করা সুন্নাহ। পানি পানের পর কিছু পানি মাথায়, মুখে ও গায়ে মাখা উত্তম।
এরপর সাফা পাহাড়ের দিকে যেতে হবে। সাফা পাহাড়ের দিকে যাবার পূর্বে হাজারে আসওয়াদ চুম্বন উত্তম। সম্ভব না হলে হাত দিয়ে ইশারারা প্রয়োজন নেই। সাফা পাহাড়ে উঠার সময় এই দুয়া পড়তে হয়-
“ইন্নাস সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন শা’আয়িরিল্লাহ, আবদাউ বিমা বাদাআল্লাহু বিহি”। অর্থ: “নিশ্চয় সাফা ও মারওয়াহ আল্লাহর নিদর্শন সমূহের অন্যতম।
সাফা পাহাড়ে পৌঁছানোর পর কাবার দিকে মুখ করে মুনাজাতের ন্যায় দুই হাত তুলে দুয়া করা। এটি দুয়া কবুলের গুরত্বপূর্ণ জায়গা।
দোয়া করার নিয়ম হচ্ছে প্রথমে তিনবার আল্লাহু আকবার বলে এই দুয়া পড়তে হয়-
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওআহদাহু লা শারিকালাহ, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদ্, ইয়ুহয়ী ওয়া ইয়ুমিতু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শায়য়িন ক্বদীর। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওআহদাহু লা শারিকালাহু, আনজাযা ওয়া’দাহু ওয়ানাসারা আবদাহু ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদাহু”।
অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি মহান। তিনি একক, তার কোনো শরিক নেই। সকল সার্বভৌমত্ব ও প্রশংসা একমাত্র তারই। তিনিই জীবন দান করেন, তিনিই মৃত্যু দেন। তিনি সর্বশক্তিমান। আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তার কোনো শরিক নেই। তিনি তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন এবং তার বান্দাদের সাহায্য করেছেন এবং দুষ্কর্মের সহযোগিদের পরাস্ত করেছেন”
তারপর নিজ নিজ প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো দোয়া। তারপর আবার ৩ বার আল্লাহু আকবার বলে আগের দুয়া। এরপর আবার নিজ প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো দোয়া। তারপর আবার আল্লাহু আকবর ৩ বার বলে আগের দুয়া। অর্থাৎ উক্ত দোয়াটি মোট ৩ বার পাঠ করা।
এরপর মারওয়া পাহাড়ের দিকে যেতে হবে। এসময় নিজের পছন্দ মতো যেকোনো দোয়া করা যায়। সবুজ বাতির জায়গাটিতে একটু জোরে হাঁটতে হবে (আস্তে আস্তে জগিং করার মতো)। যতবারই এ সবুজ আলোর জায়গার মধ্য দিয়ে যাবেন ততবারই জগিং করার মতো দৌড়াবেন। এ সময় এই দোয়া করা উত্তম-
“রাবিবগফির ওয়ারহাম ইন্নাকা আনতাল আ’আযযুল আকরাম”
অর্থ: “হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন রহম করুন। নিশ্চয় আপনি সমধিক শক্তিশালী ও সম্মানিত।”
মারওয়া পাহাড়ে পৌঁছানোর পর সাফা পাহাড়ের ন্যায় আবার কা’বা ঘরের দিকে মুখ করে দুই হাত উঠিয়ে দোয়া করা। সাফা থেকে হেঁটে মারওয়া পাহাড় এসে পৌছলে ১ চক্কর সম্পন্ন হলো। মারওয়া থেকে হেঁটে সাফা পাহাড়ে পৌঁছলে ২ চক্কর সম্পন্ন হলো। এভাবে আরও ৫ চক্কর সম্পন্ন করার পর (২+৫=৭ চক্কর) মারওয়া পাহাড়ে এসে সা’ঈ শেষ হবে।
৭ চক্কর তওয়াফ শেষ করার পর ডান কাঁধ ঢেকে মাকামে ইব্রাহিমে এসে পড়তে হবে-
(অর্থ- আর তোমরা মাকামে ইব্রাহিমকে তথা ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাযের জায়গা বানাও।) [সূরা বাকারা, আয়াত: ১২৫]
সা’ঈ করার সময় এদিক ওদিক তাকানো ও ঘুরাঘুরি না করে একাগ্রচিত্তে বিনয়ের সাথে সাঈ করাই উত্তম। খুব বেশি প্রয়োজন ব্যাতিরেকে সা’ঈ করার সময় কথা না বলাই শ্রেয়।
সাঈ করা শেষ হলে উমরাহ’র ৩য় ফরজ কাজ শেষ হলো। এরপর মাথা মুণ্ডন করার মাধ্যমে উমরাহ’র কাজ সমাপ্ত হলো।
এরপর ইহরামের কাপড় পরিবর্তন করে গোসল করে মক্কায় যতোদিন থাকা হবে শুধু তাওয়াফ ও নামাজ আদায় করা। হাজারে আসওয়াদ থেকে কাবা শরিফের দরজা পর্যন্ত জায়গাকে মুলতাজাম বলে। সাহাবারা এখানে ২ হাতের তালু, ২ হাত, চেহারা ও বক্ষ রেখে দোয়া করতেন। তাই সম্ভব হলে একাজ করা যেতে পারে।
১. বিসমিল্লাহ বলুন, ২. ক্বিবলামুখী হোন, ৩. দু’আ করুন, ৪. তিন নিশ্বাসে পান করুন, ৫. তৃপ্তি সহকারে পেট ভরে পান করুন, ৬. পানি পান শেষে আল’হামদুলিল্লাহ বলুন। ৭.জমজমরে পানি দাঁড়য়িওে পান করা যায় তবে বাধ্যতামুলক নয় ।
আমরা আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেন আমাদেরকে নেক আমল করার তাওফিক দেন। তিনি যেন আমাদের আমলগুলো কবুল করে নেন। নিশ্চয় তিনি নিকটবর্তী ও প্রার্থনা কবুলকারী।
মদীনায় আসার পর করণীয়
মদীনায় মসজিদে নববীতে নামাজ আদায়ের নিয়্যতে যেতে হবে। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর যিয়ারতের নিয়্যতে নয়। আগে মসজিদে নববীতে নামাজ আদায় করতে হবে। তারপর রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের কাছে গিয়ে সালাম দিতে হবে।
হাদিস অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে সালাম দিলে আল্লাহ তায়ালা তার রুহ ফেরত দেন এবং তিনি সালামের জবাব দেন। এরপর আবু বকর, উমর প্রমুখের কবরে সালাম দিতে হবে। তারপর জান্নাতুল বাকী কবরস্থান যিয়ারত এবং ওহুদ যুদ্ধে শহীদদের কবর যিয়ারত।
মদীনায় আরেকটি গুরত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে হোটেল থেকে ওজু করে মসজিদে কুবায় ছালাত আদায় করতে যাওয়া। এতে একটি পূর্ণ উমরাহ’র নেকি পাওয়া যাবে।