ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ চাইলেই কাউকে আর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা এমডি পদ থেকে বাদ দিতে পারবে না। বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হলে সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হবে। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক যে সিদ্ধান্ত দেবে, তাই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। অন্যদিকে ব্যাংকে এমডি নিয়োগের আগে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর্ম অভিজ্ঞতাসহ প্রস্তাব পাঠাতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকে। ব্যাংকের মনোনীত ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি কমিটি। ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক এমডি নিয়োগে অনুমোদন দেবে। এ রকম বিভিন্ন বিষয় যুক্ত করে গতকাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগসংক্রান্ত নতুন নীতিমালা জারি করা হয়েছে।
ব্যাংকের এমডি নিয়োগে আগে থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের নিয়ম রয়েছে। তবে অপসারণের ক্ষেত্রে কেবল এক মাস আগে অবহিত করতে হতো। গত বছর পরিচালনা পর্ষদের একটি অংশের চাপের মুখে বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল, পদ্মা, এসবিএসি এবং ব্যাংক এশিয়ার এমডি পদত্যাগে বাধ্য হন। এরপর প্রতিটি ব্যাংকের এমডি এবং চেয়ারম্যানকে ডেকে পাঠান গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক শেষে ব্যাংক এশিয়া ছাড়া বাকি তিন ব্যাংকের এমডিকে ব্যাংকে ফেরাতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, চরম স্খলন বা বিচ্যুতিপূর্ণ কাজ না করলে চুক্তির মেয়াদপূর্তির আগে কাউকে এমডি পদ থেকে অপসারণ বা চুক্তি বাতিল করা যাবে না। কারও চুক্তি বাতিল বা অপসারণ করতে চাইলে সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হবে। সার্বিক বিষয় বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক এরূপ প্রস্তাব অনুমোদন করলে এক মাস পর তা কার্যকর হবে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক নাকচ করলে মেয়াদের অবশিষ্ট সময় এমডি স্বপদে বহাল থাকবেন। চুক্তির মেয়াদ শেষের আগে কেউ পদত্যাগ করতে চাইলে পরিচালনা পর্ষদের সুপারিশসহ বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ব্যক্তিগত শুনানির পর যে সিদ্ধান্ত দেবে, তা কার্যকর হবে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়, এমডি নিয়োগ বা পুনর্নিয়োগের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের লিখিত পূর্বানুমোদন নিতে হবে। এ জন্য নিয়োগের দুই মাস আগে প্রয়োজনীয় নথি, তথ্যসহ মনোনীত ব্যক্তির বিস্তারিত তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হবে। তাঁর যোগ্যতা, উপযুক্ততা, দায়িত্বের প্রতি অঙ্গীকার, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের গুণাবলির বিষয় নিয়োগসংক্রান্ত কমিটির কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে নিয়োগে অনুমোদন না দেওয়ার কারণ উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে চিঠি দেওয়া হবে। আর এমডি নিয়োগের আগে বিভিন্ন বিষয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা দিতে হবে। পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দাখিল করতে হবে। সেখানে খেলাপি ঋণ আদায়ে পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, অবলোপন করা ঋণ আদায়, আর্থিক, ব্যবসায়িক ও ব্যবস্থাপনাগত উন্নতি অর্জন এবং ব্যাংকের মুখ্য আর্থিক সূচকের উন্নতির বিবরণ দিতে হবে।
এতে আরও বলা হয়েছে, ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের আগে চারিত্রিক ও নৈতিক বিশুদ্ধতার বিষয়টি দেখতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে বিরূপ পর্যবেক্ষণ থাকা ব্যক্তিকে এমডি করা যাবে না। অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি, জাল-জালিয়াতি ও নৈতিক স্খলনজনিত কারণে কোনো পদ থেকে অপসারণ হলে তাঁকে এ নিয়োগ দেওয়া যাবে না। ফৌজদারি আদালত কর্তৃক দণ্ডিত, জাল-জালিয়াতি, আর্থিক অপরাধ বা অন্য কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডে কিংবা কোনো নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের নিয়ম লঙ্ঘনজনিত কারণে দণ্ডিত হলেও এমডি নিয়োগ দেওয়া যাবে না। ঋণ ও করখেলাপি ছাড়াও ব্যক্তিগত পাওনা পরিশোধ না করলেও তিনি এমডি হতে পারবেন না। এমডির বেতন নির্ধারিত হবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, পরিধি, ব্যক্তির যোগ্যতা ও অতীত কর্ম সফলতা, বয়স ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। এমডিকে দুটি উৎসব বোনাসের বাইরে উৎসাহ বোনাস দেওয়া যাবে। তবে তা ১৫ লাখ টাকার বেশি হবে না।
শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান, ফাইন্যান্স, ব্যাংকিং, ব্যবস্থাপনা কিংবা ব্যবসায় প্রশাসন বিষয়ে ডিগ্রিধারি অগ্রাধিকার পাবেন। শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ থাকতে পারবে না। এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং পেশায় কমপক্ষে ২০ বছরের অভিজ্ঞতাসহ এমডির নিচের পদে অন্তত দুই বছর চাকরি করতে হবে। বয়সসীমা ঠিক করা হয়েছে ৪৫ থেকে ৬৫ বছর। প্রতি মেয়াদে তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যাবে। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দুইস্তর অধস্তন ছাড়া অন্য সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রধান নির্বাহীর ওপর ন্যস্ত থাকবে। দায়িত্ব পালনকালে তিনি আবেগের বশবর্তী হয়ে অথবা স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে কোনো কর্ম সম্পাদন বা সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না।