শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০৭:০৩ পূর্বাহ্ন




রমজানে ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্যতালিকা কেমন হবে?

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শনিবার, ১ মার্চ, ২০২৫ ৬:১৪ pm
Diabetes World Diabetes Day Diabetes World Day ডায়াবেটিস ইনসুলিন হরমোন নিঃসরণ
file pic

শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। এই মাসটি প্রতিটি মুসলমান নারী-পুরুষের খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বছরের বিভিন্ন সময়ে রোজা রাখলেও কেবল রমজান মাসের রোজা পালন করা ফরজ। তবে কিছু শারীরিক সমস্যার কারণে অনেকেই রোজা রাখতে পারেন না, যার মধ্যে ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিরা অন্যতম। তবে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলেও অনেকেই রোজা রাখেন। সেক্ষেত্রে তাদের খাদ্যতালিকা কেমন হবে এ বিষয়ে চ্যানেল 24 অনলাইনের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন রাজধানী ঢাকার মহাখালীর লাইফ কেয়ার মেডিকেল সেন্টারের নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েট কনসালটেন্ট ইসরাত জাহান ডরিন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে, ডরিন বলেন, যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদের নিয়ম মেনে খাবার খেতে হয় এবং ওষুধও নিতে হয়। তাই রমজান মাসে রোজা থাকার ক্ষেত্রে তাদের খাদ্যতালিকার দিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হয়। অন্যদিকে রমজান মাসে কমবেশি সব পরিবারের খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন আসে। সে কারণেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা রোজা না থাকেও তাদের উপযোগী খাবার তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে ডায়াবেটিসের পাশাপাশি যদি অন্য কোনো জটিলতা থাকে, তবে শরীরের অবস্থা বিবেচনা করে একজন পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকা প্রস্তুত করাটা গুরুত্বপূর্ণ।

রমজানে ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্যাভ্যাস কেমন হওয়া উচিত: নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েট কনসালটেন্ট ইসরাত জাহান ডরিন বলেন, যারা রোজা রাখতে চান, তাদের অন্তত তিন মাস আগেই রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। তা না হলে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। যাদের সুগার নিয়ন্ত্রিত থাকে, তারা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে রোজা রাখতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সারাদিনে কম করে হলেও ছয়বার খাবার গ্রহণ করতে বলা হয়। কিন্তু রোজায় সেটা সম্ভব হয় না। রমজান মাসে সেহরি করার পর সন্ধ্যায় ইফতার করতে হয়। যেহেতু এই সময় খাবার খাওয়ার সুযোগ নেই তাই কোনোভাবেই ডায়বেটিস রোগীরা সেহরি বা ইফতারে একবারে অতিরিক্ত খাবার খেয়ে ৬ বার খাবারের যে চাহিদা সেটা পূরণ করতে পারবেন না। কারণ এতে রক্তে শর্করার ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এজন্য সবসময় পরিমিত খাবার গ্রহণ করা জরুরি।

পানিশূন্যতা থেকে রক্ষা পেতে: সারাদিন রোজা রাখার ফলে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। তাই একবারে বেশি পরিমাণে পানি বা ঘন শরবতজাতীয় পানীয় পান করা ঠিক নয়, কারণ এগুলো শরীরে শোষিত হতে সময় নেয় এবং হজমে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তাই শরবত খেতে হলে তা পাতলা করে খাওয়া ভালো। ডায়াবেটিস রোগীরা ইফতারে পানিশূন্যতা রোধ করতে ডাবের পানি, ইসবগুলের ভুসির শরবত, তোকমা, টক দইয়ের লাচ্ছি, চিনি ছাড়া লেবুর শরবত, কাঁচা আমের জুস ইত্যাদি খেতে পারেন। তবে যাদের অ্যাসিডিটির সমস্যা আছে, তারা শুরুতে টকজাতীয় শরবত না খেয়ে সবজির স্যুপ বা সবজির জুস গ্রহণ করতে পারেন।

ইফতারের জন্য উপযুক্ত খাবার: ইফতারের খাবারের পরিমাণ সকালবেলার নাশতার সমান হওয়া উচিত, যা সারাদিনের মোট ক্যালরির এক-তৃতীয়াংশ হবে। স্বাস্থ্যকর ইফতারের জন্য কিছু বিকল্প খাবার হতে পারে—সেদ্ধ কাঁচা ছোলা, টমেটো, আদা, পুদিনা ও লবণ মিশিয়ে মুড়ি মাখানো; দই-চিড়া, দইবড়া, নরম খিচুড়ি, লাল আটার রুটি, লাল চালের ভাত, শসার রায়তা, ডিম সেদ্ধ, সাবুদানা মেশানো স্যুপ, মিশ্র ফল বা ফলের সালাদ। তবে ডালের তৈরি খাবার একের অধিক না খাওয়াই ভালো। যেমন—ডালের বড়া, ঘুগনি, খিচুড়ি, হালিম, চটপটি ইত্যাদির মধ্যে একবারে একটির বেশি খাওয়া উচিত নয়।

মিষ্টি ফলের মধ্যে কলা, আপেল, খেজুর, কমলা, আম, নাশপাতি, পেয়ারা, পেঁপে ইত্যাদির মধ্যে থেকে একটি বেছে নিতে পারেন, তবে টক ফল ইচ্ছেমতো খাওয়া যাবে। পাশাপাশি ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত তেল ও মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এতে অ্যাসিডিটি এবং বুক জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

রাতের খাবার: পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান ডরিন বলেন, ইফতারের পর রাতের সময় খুবই সীমিত থাকে। অনেকেই ইফতারে বেশি খেয়ে রাতের খাবার বাদ দেন, যা ভুল সিদ্ধান্ত। রাতের খাবারে হালকা খাবার গ্রহণ করা ভালো। হালকা মসলাযুক্ত ছোট মাছ, মুরগি, মাংস, সবজি, ডাল, শিমের বিচি, সামুদ্রিক মাছ খেতে পারেন। পাশাপাশি লাল আটার রুটি, চিড়া, মুড়ি, খই বা ওটসের মধ্যে একটি উপাদান পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে অবশ্যই ভুনা করা খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।

সেহরির জন্য উপযুক্ত খাবার: পুষ্টিবিদ সেহরি প্রসঙ্গে বলেন, রাতের শেষভাবে সেহরি খাওয়া হয়। সেহরি গ্রহণের পর দীর্ঘসময় না খেয়ে একবারে ইফতারে খেতে হয়। তাই সেহরিতে এমন খাবার রাখা উচিত যেগুলো পানির ঘাটতি পূরণ করবে। আর এ কারণে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের মধ্যে মাছ, মুরগি বা ডিম খাওয়া ভালো। তবে গরুর মাংস ও ডাল না খাওয়াই ভালো, কারণ এসব খাবার খেলে পানির চাহিদা বেড়ে যায়, যে কারণে পানির তেষ্টা লাগে। যাদের হজমজনিত সমস্যা আছে, তারা ডাল ও মাংস এড়িয়ে চলুন। সেহেরিতে দুধ পান করলে ডাল খাওয়ার প্রয়োজন নেই।

রমজান মাসজুড়ে ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় মানতে হবে: নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েট কনসালটেন্ট ইসরাত জাহান ডরিন রোজার মাসে সুস্থ থাকতে কিছু সতর্কতা মেনে চলতে হবে। এই নিয়মগুলো মানলে রমজান মাসে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির পাশাপাশি পরিবারের বাকি সদস্যরা রোজা থাকলেও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বেন না। এগুলো হলো:-

অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও মসলাযুক্ত খাবার পরিহার করুন।

প্রতিদিন সব আইটেম খাওয়ার পরিবর্তে এক দিন পরপর বিভিন্ন খাবার রান্না করুন।

রান্না করা খাবার অনেকদিন ফ্রিজে সংরক্ষণ না করে, টাটকা খাবার গ্রহণ করুন।

সারাদিন রোজা রাখার ফলে শরীরে পানিশূন্যতা বেড়ে যায়, তাই বেশি চা বা কফি পান করবেন না, কারণ এতে আরও পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে।

ভুনা করা খাবারের পরিবর্তে তরল বা পানিযুক্ত খাবার বেশি খান।

যাদের ডায়াবেটিসের পাশাপাশি ইউরিক অ্যাসিড বা বাতজনিত সমস্যা আছে, তারা বেসন ও ডালের তৈরি খাবার কম খাবেন বা সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলবেন।

যাদের ডায়াবেটিসের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তারা বাইরের কেনা প্রক্রিয়াজাত খাবার, মুড়ি, সামুদ্রিক মাছ, গরুর মাংস বা চপ থেকে দূরে থাকুন।

অতিরিক্ত ওজন ও হৃদরোগ আছে এমন ব্যক্তিরা ইফতার ও সাহ্‌রিতে ভাজা খাবার এড়িয়ে চলুন। যেমন আলুর চপ, বেগুনি, পুরি, ডালের বড়া ইত্যাদি। এসব খাবারে পুষ্টিগুণ কম থাকে এবং এগুলোতে ট্রান্সফ্যাট তৈরি হয়, যা বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

অতিরিক্ত ঝাল খাবার পরিহার করুন, কারণ এটি অ্যাসিডিটি বাড়িয়ে তোলে। এই নিয়মগুলো মেনে চললে ডায়াবেটিস রোগীরা রমজানে সুস্থভাবে রোজা রাখতে পারবেন এবং শরীরের সুগার লেভেলও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD