এক সময় বাংলাদেশের যেসব জেলায় রেলপথ ছিল না, টাঙ্গাইল ছিল তার অন্যতম। এরপর যমুনা সেতুর হাত ধরে এই জেলায় ট্রেন আসল। উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার এই জেলাটি ছিল মাঝপথে। ফলে সেখান থকে উত্তরবঙ্গগামী ট্রেনের টিকিট পাওয়া ছিল কঠিন। রেলস্টেশন শহরের এক প্রান্তে হওয়ায় সেখানে গিয়ে টিকিট করাও ছিল কঠিন। আসন পাওয়া ছিল ততোধিক কঠিন।
টাঙ্গাইল স্টেশনের জন্য টিকিট বরাদ্দও ছিল কম। সেই টিকিটও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। টিকিট ছিল মূলত কালোবাজারিদের হাতে। বেশি দাম দিয়েও অনেক সময় টিকিট মিলত না। কিন্তু ২০২৩ সালে রেলওয়ের ৭১ শতাংশ টিকিট অনলাইনে বিক্রি শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। এখন যাত্রার এক সপ্তাহে আগে রাজশাহী থেকে আসা সিল্কসিটি এক্সপ্রেস ট্রেনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামড়ার টিকিট অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। ফলে যারা কমলাপুরের কাছাকাছি থাকেন, এখন টাঙ্গাইল থেকে তাদের ট্রেনে আসা সম্ভব হচ্ছে, বা যারা রেলযাত্রা পছন্দ করেন, তারাও নির্ঝঞ্ঝাটে ট্রেনের টিকিট পাচ্ছেন।
দেশে ই-টিকিটিং শিল্পের দ্রুত বিকাশ ঘটছে। ট্রেনের পাশাপাশি এখন বাস, লঞ্চ ও বিমানের টিকিটও অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে।
বাসের টিকিট করার ঝক্কিও কম ছিল না। বড় বড় বাস কোম্পানির কাউন্টারে ফোন করে টিকিট বুকিং বা সংরক্ষণ করার নিয়ম আগে থাকলেও সহজে তাদের পাওয়া যেত না। অনেকবার ফোন ফোন করতে শেষ একবার পাওয়া গেলে ছিল রক্ষা। এখন অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে বাসের টিকিট করা সম্ভব হচ্ছে বলে সেই ঝক্কি অনেকটাই কমেছে। সবচেয়ে বড় কথা অনিশ্চয়তা কমেছে এখন কেউ চাইলে সহজেই রাতের বেলা ঘরে বসে অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে দেখে নিতে পারছেন, কাঙ্ক্ষিত বাসে নির্দিষ্ট দিনে টিকিট আছে কি না; থাকলে সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা ক্রেডিট/ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে টিকিট কেটে নিতে পারছেন। প্রয়োজন হলে সময়মতো বাতিলও করা যায়।
বিশেষ করে ঈদের আগে ট্রেন ও বাসের টিকিট করা ছিল দুঃসহ অভিজ্ঞতা। অতীতে ঈদের সময় দেখা যেত, ট্রেনের টিকিট করার জন্য ইফতারের পরে লাইনে দাঁড়িয়ে পরদিন সকাল পর্যন্ত অনেকে অপেক্ষা করেও টিকিট না পেয়ে মন খারাপ করে চলে গেছেন। তা ছাড়া একসঙ্গে কাউন্টারে হাজার হাজার মানুষের ভিড় সেখানে বড় ধরনের অস্থিরতারও জন্ম দিত। এই পরিস্থিতি এড়াতে অনলাইন টিকিট সবচেয়ে ভালো সমাধান।
এই ই-টিকিটিংয়ের কারণে সবচেয়ে উপকৃত হচ্ছেন নারীরা। তাঁদের পক্ষে চাইলেই কাউন্টারে গিয়ে টিকিট সংগ্রহ করা ছিল প্রায় অসম্ভব বিষয়, বিশেষ করে একক মা বা নারীদের পক্ষে। ই-টিকিটিংয়ের কল্যাণে তাঁরা এখন সহজেই টিকিট করতে পারছেন। ফলে নিঃসন্দেহে নারীদের যাতায়াতে গতি এনেছে এই শিল্প।
কত টিকিট বিক্রি হচ্ছে
প্রতি বছর অনলাইনে টিকিট বিক্রি বাড়ছে। ২০২০ সাল থেকে প্রতি বছর অনলাইনে টিকিট বিক্রির হার বাড়ছে ২০ শতাংশ। এখন ট্রেনের টিকিটের ৭০ শতাংশ এবং বাসের টিকিটের ২০ শতাংশের বেশি অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে। অথচ চার বছর আগে বাসের টিকিটের ৫ শতাংশেরও কম অনলাইনে বিক্রি হতো। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালের মধ্যে দেশের মোট আন্তজেলা (ট্রেন ও বাস) টিকিটের ৭৬ শতাংশ অনলাইনে বিক্রি হবে।
অনলাইনে টিকিট দ্রুত বিক্রি হয়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে সহজের ভাষ্য হলো, মানুষ এখন সুযোগ থাকায় অন্তত সাত দিন আগে টিকিট করছে। ফলে ঢাকা-কক্সবাজার, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন গন্তব্যের টিকিট দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়।
এই শিল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখন সবগুলো প্ল্যাটফর্ম সম্মিলিতভাবে প্রতি মাসে বাস-ট্রেন, লঞ্চ-বিমানের এক কোটির বেশি টিকিট বিক্রি করছে। ঈদের সময় প্রতিদিন এই সংখ্যা দাঁড়ায় এক লাখ ৬০ হাজার। মোবাইল ব্যাংকিং ও ব্যাংক কার্ডের মাধ্যমে ৭০ শতাংশ টিকিটের মূল্য পরিশোধ করা হয়।
আরও জানা যায়, অনলাইনে বিক্রি হওয়া এসব টিকিটের ৪০-৫০ শতাংশ বিক্রি করে সহজ ডটকম। সহজ এখন দেশের ১০০ টির বেশি বাস অপারেটরের সঙ্গে যুক্ত। সাধারণ সময়ে সহজ প্রতিদিন বাসের টিকিট বিক্রি করে ৮০ থেকে ৯০ হাজার, ঈদের সময় তা আরও বেড়ে যায়।
অনলাইনে টিকিট বিক্রির মাধ্যমে জালিয়াতিও রোধ করা সম্ভব হচ্ছে। সহজের অনলাইন ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত ৫০ হাজারের বেশিবার জালিয়াতির ঘটনা শনাক্ত করে টিকিট সংরক্ষণ বন্ধ করে দিয়েছে। এ ছাড়া লেনদেনের ধরনের ওপর ভিত্তি করে নিয়মিতভাবে অ্যাকাউন্ট কালো তালিকাভুক্ত করা হয়।
যেসব প্রতিষ্ঠান ই-টিকিটিং সেবা দিচ্ছে
বাংলাদেশ রেলওয়ে ই-টিকেটিং সার্ভিস (Bangladesh Railway) ২০১২ সালের ২৯ মে সরকারিভাবে চালু হয় অনলাইনে ট্রেনের টিকিট কেনাবেচার ব্যবস্থা। তারপর থেকে বিগত এক যুগে অনেকটা পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের ডিজিটাল টিকিট পদ্ধতি।
তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সর্বোচ্চ ১০ দিন আগে থেকে ট্রেনে আসন সংরক্ষণ করা যায়। এর জন্য প্রথমেই প্রয়োজন হয় সাইটটিতে নিবন্ধন করা। এই পর্যায়ে জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বর দিতে হয়। এরপরের কাজ স্টেশন, ভ্রমণের তারিখ, ট্রেনের শ্রেণি নির্বাচন। এখানে বিদ্যমান সিটের ভিত্তিতে প্রদর্শিত সিটের তালিকা থেকে এক বা একাধিক সিট বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে।
সবশেষে পেমেন্টের পদ্ধতিতে রয়েছে ক্রেডিট/ডেবিট বা বিকাশের মতো জনপ্রিয় মোবাইল পেমেন্ট গেটওয়েগুলো। পেমেন্ট শেষে প্রাপ্ত ই-টিকিটের প্রিন্ট নিয়ে রেল স্টেশনে পৌঁছতে হয়।
ওয়েবসাইট লিংক: eticket.railway.gov.bd;
আইফোন অ্যাপ: https://apps.apple.com/us/app/rail-sheba/id6499584782;
অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ: https://play.google.com/store/apps/details?id=com.shohoz.dtrainpwa
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস (Biman Bangladesh Airlines)
রাষ্ট্রায়ত্ত এই বিমান সংস্থাটির অনলাইন আসন সংরক্ষণ সুবিধা চালু হয় ২০১০ সালে। তাদের ওয়েবসাইটে গিয়ে ঘরে বসেই সম্পন্ন করা যায় টিকিট অর্ডার ও প্রাপ্তির কাজ। এখানে গন্তব্য, তারিখ, শ্রেণি নির্বাচন ও ইমেইল আইডি ও মোবাইল নম্বরসহ যাত্রীর বিস্তারিত তথ্য প্রদান করতে হয়।
তারপর ডিজিটাল ব্যাংকিং বা মোবাইল পেমেন্ট সিস্টেমের মধ্যে যে কোনোটির মাধ্যমে পরিশোধ করা যায় টিকিটের মূল্য। অবশেষে ই-টিকিট প্রদান করা হয় যাত্রীদের ই-মেইলে।
ওয়েবসাইট লিংক: https://www.biman-airlines.com/
অ্যান্ড্রয়েড এবং অ্যাপেল দুই ব্যবহারকারীদের জন্য Biman Bangladesh Airlines-এর রয়েছে বিমান অ্যাপ।
অ্যান্ড্রয়েড প্লে-স্টোর লিংক:
https://play.google.com/store/apps/details?id=com.BimanAirlines.Biman&hl=en&gl=US
অ্যাপল অ্যাপ-স্টোর লিংক: https://apps.apple.com/us/app/biman/id6444130555
সহজ (Shohoz)
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিবহন মাধ্যমগুলোর ই-টিকিট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এক নির্ভরযোগ্য নাম সহজ। ট্রেনের টিকিটগুলো বিআরআইটিএসের (বাংলাদেশ রেলওয়ে ইন্টিগ্রেটেড টিকেটিং সিস্টেম) সঙ্গে যৌথভাবে ইস্যু করে এই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি।
২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত সহজ বাস, ট্রেন, লঞ্চ, প্লেন সব পরিবহনকে একটি একক মঞ্চের আওতায় নিয়ে এসেছে। তাদের ওয়েবসাইটে প্রতিটি পরিবহন মাধ্যমের জন্য আলাদাভাবে রওনা হওয়ার স্থান, গন্তব্য, ও যাত্রার তারিখ দেওয়ার পদ্ধতি রয়েছে। এর জন্য অবশ্যই একটি সার্বক্ষণিক ব্যবহৃত ইমেইল ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর সরবরাহ করা জরুরি।
মোবাইল কিংবা ব্যাংক কার্ডের মাধ্যমে অর্থ প্রদানের পর টিকিটের সফট কপির লিংক পাওয়া যাবে ইমেইল বা এসএমএসের মাধ্যমে।
ওয়েবসাইট লিংক: https://www.shohoz.com/
এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা যাবে স্মার্টফোন থেকেও।
গুগল প্লে-স্টোর লিংক: https://play.google.com/store/apps/details?id=com.shohoz.rides
আইফোন অ্যাপ-স্টোর লিংক: https://apps.apple.com/us/app/shohoz-app/id1354321445?ls=1
গোজায়ান (GoZayaan)
বাংলাদেশের অগ্রগামী ওটিএর (অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি) মধ্যে গোজায়ান অন্যতম। দেশের ভেতরের ও বাইরের বিমান টিকিট কেন্দ্রিক টিকেটিং প্ল্যাটফর্মটির পথ চলা শুরু হয় ২০১৭ সাল থেকে। ই-টিকিটের পাশাপাশি গো জায়ান হোটেল, ট্যুর ও ভিসা সংক্রান্ত সুবিধাও দিয়ে থাকে।
সেখান থেকে টিকিটের অর্ডার করতে হলে প্রথমে অ্যাকাউন্ট খুলে নিতে হবে। এর অধীনে টিকিট প্রাপ্তিসহ ফ্লাইটের যাবতীয় আপডেট পাওয়া যাবে। ওয়েবসাইটে ফ্লাইট সার্চের পাশাপাশি একাধিক ফ্লাইটের মধ্যে তুলনা করারও ফিচার রয়েছে।
ব্যাংকিং ও মোবাইল পেমেন্ট সিস্টেমগুলোর মধ্যে প্রায় সবগুলোই থাকায় সব শ্রেণির গ্রাহকরাই অকপটেই ব্যবহার করতে পারেন।
ওয়েবসাইট লিংক: https://gozayaan.com/
এ ছাড়া আইওএস ও অ্যান্ড্রয়েড উভয় স্মার্টফোন গ্রাহকদের জন্য তাদের নিজস্ব অ্যাপও রয়েছে। আইওএস অ্যাপ লিংক: https://apps.apple.com/us/app/gozayaan/id1635126688
অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ লিংক: https://play.google.com/store/apps/details?id=com.gozayaan.app&hl=en
শেয়ার ট্রিপ (ShareTrip)
ট্রাভেল বুকিং বিডি নামের ছোট্ট ফেসবুক পেজটির উদ্দেশ্য ছিল বিমানের টিকিট বিক্রি করা। ২০১৩ সালের এই উদ্যোগের অঙ্কুরের পরের বছর জন্ম নেয় শেয়ার ট্রিপ। দেশে এটিই প্রথম একযোগে ন্যাশনাল ও ইন্টারন্যাশনাল অর্থাৎ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ধরনের বিমানের জন্য অনলাইন টিকিটিং পদ্ধতি চালু করে।
শেয়ার ট্রিপের ওয়েবসাইটের পাশাপাশি অ্যান্ড্রয়েড ও আইফোন অ্যাপ রয়েছে। এমনকি সব প্ল্যাটফর্মই ফ্লাইটগুলোর রিয়েল-টাইম মূল্য তালিকা প্রদর্শন করে। সাধারণ কর্মদিবস, সপ্তাহান্তে ও ছুটি বিশেষে অর্থ পরিশোধের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে গ্রাহক ইমেইলের মাধ্যমে ই-টিকিট পেয়ে যান।
বুকিংয়েরে জন্য অবশ্যই অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। আর এই অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরবর্তীতে ফ্লাইট বাতিল বা তারিখ পরিবর্তন সংক্রান্ত আবেদনগুলো রাখা যায়।
ওয়েবসাইট লিংক: https://sharetrip.net/
অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ: https://play.google.com/store/apps/details?id=net.sharetrip&hl=en
আইওএস অ্যাপ: https://apps.apple.com/us/app/sharetrip-flight-shop-voucher/id1469335892
ফ্লাইট এক্সপার্ট (Flight Expert)
মক্কা গ্রুপ অব কোম্পানির এই ট্রাভেল এজেন্সি ২০১৭ সালের ১ মার্চ নিয়ে আসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে টিকিটিং পদ্ধতি। অবশ্য এই প্রযুক্তিকে ঘিরে পূর্ণাঙ্গ একটি ওয়েবসাইটের আত্মপ্রকাশ ঘটে ২০২২ এর ৯ জুলাই। বর্তমানে দেশের প্রথম সারির ফ্লাইট বুকিং সাইটগুলোর মধ্যে Flight Expert অন্যতম।
অন্যান্য এজেন্সিগুলোর থেকে যে বিষয়টি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে রেখেছে তা হচ্ছে ‘বুক ন্যাউ (পে লেটার) ‘ ফিচার। এই প্রক্রিয়ায় অর্ডার নিয়ে কোনো পেমেন্ট ছাড়াই যাত্রীর জন্য টিকিট বুক করে রাখা হয়। পরে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে গ্রাহক টিকিটের অর্থ পরিশোধ করেন। সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রাহককে পেমেন্টের রিমাইন্ডার দেওয়া হয়।
সফল ভাবে অর্থ প্রদানপূর্বক এয়ারলাইনসের ইস্যুকৃত টিকিটের পিডিএফ ফাইল চলে যায় গ্রাহকের ইমেইল ঠিকানায়।
ওয়েবসাইট লিংক: https://flightexpert.com/
ওয়েবসাইট মোবাইল-বান্ধব হওয়া সত্ত্বেও এদের রয়েছে স্বতন্ত্র আইফোন ও অ্যান্ড্রয়েড।
অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ: https://play.google.com/store/apps/details?id=com.flightexpert.b2c&hl=en
আইফোন অ্যাপ: https://apps.apple.com/ag/app/flight-expert/id6457255223
বিডিটিকিটস (bdtickets)
ঘরে বসে বাসের টিকিট সংগ্রহের জন্য রবি আজিয়াটার এই টিকিটিং পোর্টালটি ব্যাপকভাবে সমাদৃত। ২০১৫ সালে আত্মপ্রকাশের পর থেকে এরা প্রধানত দেশের আন্তনগর বাসগুলো নিয়ে কাজ করে আসছে। বর্তমানে বিডিটকিটিস বিমান বা লঞ্চের টিকিটও সরবরাহ করে। তবে সে জন্য ১৬৪৬০ নম্বরে ফোন দিতে হবে।
অন্যান্য টিকিটিং সাইটগুলোর মতো তাদেরও রয়েছে নিবন্ধন, টিকিট অর্ডার, এবং পেমেন্ট সিস্টেম। তাদের মোবাইল অ্যাপ একটি; বিডিটিকিটস, যার অ্যান্ড্রয়েড এবং অ্যাপল দুই সংস্করণই আছে।
যাত্রার সময় পরিবর্তন বা বাতিলের যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পাদন করা যায় যাত্রীর অ্যাকাউন্ট থেকে।
ওয়েবসাইট লিংক: https://bdtickets.com/
স্মার্টফোন থেকে এই কার্য সম্পাদনের জন্য পৃথক অ্যাপও রয়েছে।
অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ:
https://play.google.com/store/apps/details?id=com.bluetech.bdtickets.launcher&hl=en
আইওএস অ্যাপ: https://apps. apple. com/us/app/bdtickets/id 1552613900
বাইটিকিটস (Buy Tickets)
২০১৮ এর ১৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিমান টিকিটিং কার্যক্রম শুরু করে বাইটিকিটিস। ট্রাভেল এজেন্সি এয়ারস্প্যান লিমিটেডের এই উদ্যোগ বর্তমানে দেশের পর্যটন সেক্টরের এক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান। বাস, লঞ্চ, বিমানের টিকিট বিক্রির পাশাপাশি এদের হলিডে ট্যুর প্যাকেজ ও হোটেল সেবাও রয়েছে।
উল্লিখিত কোম্পানিগুলোর মতো তারাও গ্রাহকদের জন্য সহজ ইন্টারফেসে টিকিট কেনার সুযোগ দেয়। দেশের সমসাময়িক ওটিএগুলোর মতো এটিও এসএমএস বা ই-মেইলের মাধ্যমে গ্রাহককে ই-টিকিট সরবরাহ করে।
ওয়েবসাইট লিংক: https://buytickets.com.bd/
স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের জন্য এই পরিষেবাটি শুধু অ্যান্ড্রয়েড প্ল্যাটফর্মে সমর্থিত।
যাত্রী (Jatri)
২০১৯ এ আত্মপ্রকাশ করা এই সাইটটির বিশেষত্ব হলো বাস ট্র্যাকিংয়ের সুবিধা। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য যাত্রীরা বাসের বর্তমান অবস্থান দেখে তার স্ট্যান্ডে পৌঁছার সময় যাচাই করতে পারেন।
যাত্রীর নিজস্ব ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপ উভয় মাধ্যমেই এই ফিচারটি রয়েছে। সাইটে নিবন্ধনের পর নির্ধারিত অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে যাতায়াতের যাবতীয় তথ্য পাওয়া যায়। এই তথ্য পছন্দের বাসটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।
মূল্য পরিশোধের জন্য যাত্রীর আছে বিশেষ যাত্রী কার্ড। এর সঙ্গে ডিজিটাল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ভিসা বা মাস্টার কার্ড যুক্ত করার সুবিধা আছে। ফলে যাত্রীরা তাৎক্ষণিকভাবে ডিজিটাল মাধ্যমে যাতায়াতের ভাড়া দিতে পারে।
ওয়েবসাইট লিংক: https://www.jatri.co/
অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ: https://play.google.com/store/apps/details?id=com.jatri.jatriuser&hl=en&gl=
পরিবহন. কম (paribahan.com)
এই সাইটটিতে দেশের বর্তমান অধিকাংশ পরিবহন পরিষেবার এপিআই (অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস) সংযুক্তি রয়েছে। তাই প্রতিষ্ঠানটি স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে বিস্তৃত পরিসরে টিকিটিং সেবা প্রদান করতে পারে।
পরিবহনের আওতাভুক্ত পরিবহনগুলো হলো বাস, লঞ্চ এবং বিমান। এগুলোর যে কোনোটির টিকিট কেনার সময় যাত্রীরা নিজের পছন্দ মতো পরিবহন কোম্পানি বাছাই করতে পারেন। একই সঙ্গে দেশের প্রায় সবগুলো অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার সুবিধা রেখেছে ওয়েবসাইটটি।
ওয়েবসাইট লিংক: https://paribahan. com/
তবে অসুবিধার জায়গা হচ্ছে পরিবহন. কমের কোনো মোবাইল অ্যাপ নেই।
অনলাইনে বাস, ট্রেন, ও বিমানের টিকিট ক্রয়ের এই ১০টি প্রতিষ্ঠান দেশের মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থার মানোন্নয়ন করেছে। সরকারি দিক থেকে এই বৃহৎ ভূমিকায় অবদান রাখছে বাংলাদেশ রেলওয়ে ই-টিকিটিং সার্ভিস। দেশ-বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে টিকিটিং ব্যবস্থাকে উন্নত করেছে বিমান বাংলাদেশ, শেয়ার ট্রিপ, গোজায়ান এবং ফ্লাইট এক্সপার্ট। এগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যাত্রীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে সহজ, বিডিটিকেট্স ও বাইটিকিট্স। পিছিয়ে নেই শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবহনগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকা যাত্রী ও পরিবহন। সর্বোপরি, এই প্রতিষ্ঠানগুলো এখন কাগুজে টিকিট ব্যবস্থার উৎকৃষ্ট বিকল্প, যা নাগরিক জীবনকে ধাবিত করছে উন্নত জীবন ধারণের দিকে।
সেবাগ্রহীতার পরিপ্রেক্ষিত
আফসানা সুমী রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। চাকরির সুবাদে বাস করছেন ঢাকার মোহাম্মদপুরে। বাবা মা দিনাজপুরে থাকলেও কর্মময় ব্যস্ত জীবনের কারণে খুব কমই নিজ বাড়িতে যাওয়া হয়। তবে ঈদের সময় নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতেই হয়। বাসের চেয়ে ট্রেনেই বাড়ি ফিরতে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন আফসানা। তবে এই যাত্রা যেন এক অভিশাপ। কেননা স্টেশনে টিকিট কাটতে গিয়ে মাঝরাত থেকেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। টিকিট পাওয়া যাবে কি না সে সংশয় তো থাকেই, সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়েও থাকে দুশ্চিন্তা। তবে বর্তমানে অনলাইন টিকিটিং এ দুর্ভোগ অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।
আফসানা বলেন, ঈদের সময় অনলাইনে টিকিট কাটার কারণে আমার মতো কর্মজীবী নারীদের দুর্ভোগ অনেকাংশেই কমে গেছে। কেননা এই টিকিট কাটার জন্য এখন আর অফিস থেকে ছুটি নিতে হয় না, দীর্ঘক্ষণ লাইনেও দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। বাড়িতে বসেই বা কাজের ফাঁকে অনলাইনে যাবতীয় কাজ সেরে ফেলা যায়। এমনকি ফিরতি টিকিট নিয়েও ভাবতে হয় না। একই সঙ্গে সময় ও দুর্ভোগ দুটোই কমে গেছে।
প্রতিবছরই ঈদের সময় নাড়ির টানে প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ করতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে নিজ ঘরে। তবে এই ঈদযাত্রা শুধুমাত্র আনন্দের নয়, বরং এটি দীর্ঘ এবং কষ্টকর, বিশেষত যাদের বাড়ি একটু দূরে। রেলওয়ে স্টেশন এবং বাস টার্মিনালে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করা, ভ্রমণের ভিড় ও অস্বস্তি-এগুলো যাত্রীদের জন্য অভিশাপ হয়ে ওঠে। তবে আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে ঈদ যাত্রার দুর্ভোগ কিছুটা কমেছে, বিশেষত অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থার মাধ্যমে। বাস ও ট্রেনের টিকিট এখন ঘরে বসেই পাওয়া যাচ্ছে। এই সেবার ফলে কর্মজীবী নারীসহ বিভিন্ন শ্রেণির যাত্রীরা বিশেষভাবে উপকৃত হচ্ছেন।
অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থার সাফল্য সত্ত্বেও যাত্রীদের কিছু অভিযোগ আছে।
অনেক যাত্রী বলেন, একযোগে বেশি সংখ্যক যাত্রী টিকিট কিনতে গিয়ে সিস্টেমে চাপ পড়ছে। ফলে টিকিট পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। সহজ ডট কমের এক কর্মকর্তা জানান, “যাত্রীরা বেশির ভাগ সময়ই টিকিট না পাওয়ার অভিযোগ করেন। আমাদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা থেকে কক্সবাজার, সিলেট, রাজশাহী রুটে প্রতি সপ্তাহান্তে এবং ছুটির দিনে প্রায় ১৫,০০০ টিকিট প্রথম ৩০ মিনিটের মধ্যে সংরক্ষিত হয়ে যায়। সিস্টেম পাঁচ কোটিরও বেশি কনকারেন্ট ব্যবহারকারীকে সেবা দিতে সক্ষম, কিন্তু পিক আওয়ারে অনেক সময় সিস্টেমে চাপ পড়ে, এবং কিছু যাত্রী টিকিট পান না। তবে আমরা নিয়মিত সিস্টেম আপগ্রেড করি এবং যাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা দিতে চেষ্টা করছি। ”
পরিবহন বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, “অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থার এই ব্যাপক সম্প্রসারণ বাংলাদেশের পরিবহন খাতের ডিজিটাল রূপান্তরের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। এটি শুধু যাত্রীদের সুবিধা বৃদ্ধি করছে না, বরং পরিবহন খাতে কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করছে। এই ব্যবস্থা যাত্রীদের সময় ও খরচের সাশ্রয় ঘটাচ্ছে, সেই সঙ্গে দীর্ঘ লাইনের প্রতিটি মুহূর্তের বিড়ম্বনা দূর করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত প্রযুক্তি ও সিস্টেম স্থাপনের মাধ্যমে এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে আরও শক্তিশালী এবং ব্যবহারকারী বান্ধব করে তোলা জরুরি। বিশেষত, রুটে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সিস্টেমের চাপ কমানোর জন্য উন্নত নেটওয়ার্ক সিস্টেম চালু করা প্রয়োজন।
সেবাদাতাদের পরিপ্রেক্ষিত
গত কয়েক বছরে দেশে ই-টিকিটিংয়ের প্রতি মানুষের ইতিবাচক সাড়ায় সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো আশান্বিত। যদিও এই সেবার ব্যবসায়িক মডেল এখনো প্রতিষ্ঠিত নয়। স্টার্ট আপ হিসেবে চলছে অনেকেই। কিন্তু তারা আশাবাদী, শিগগিরই ব্যবসায়িক মডেল হিসেবে তা দাঁড়িয়ে যাবে, অর্থাৎ মুনাফা কত হবে।
সেবাদাতারা বলছে, দেশের সব বাস সেবা এখনো ই-টিকিটিংয়ের আওতায় আসেনি। বিশেষ করে রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে যেসব দূর পাল্লার বাস দেশের বিভিন্ন পথে চলাচল করে, তাদের বেশির ভাগই এখনো ই-টিকিটিংয়ের আওতায় আসেনি। যারা এসেছে, তারাও শতভাগ টিকিটি অনলাইনে দেয়নি। অনেক কোম্পানি আবার নিজেদের ওয়েবসাইট থেকে এই ই-টিকিটিং সেবা দেয়।
বর্তমানে রাজধানী থেকে দেশের প্রায় সব জেলায় যাওয়ার এবং সেখান থেকে রাজধানীতে আসার টিকিট অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু রাজধানীর ব্যতীত এক জেলা থেকে আরেক জেলায় যাওয়ার টিকিট বা জেলা সদর থেকে উপজেলা সদরে যাওয়ার টিকিট অনলাইনে আসেনি। সেবাদাতারা মনে করেন, তারা আসলে অবশ্যই সেবার মান বাড়বে, এবং মানুষও তা গ্রহণ করবে।
বিডিটিকিটসের মূল প্রতিষ্ঠান আর-ভেঞ্চারসের পক্ষ থেকে রবির জ্যেষ্ঠ আশরাফুল ইসলাম বলেন, বাসের টিকিট নিয়ে বাস টার্মিনালগুলোতে বড় ধরনের সিন্ডিকেট আছে। এর সঙ্গে আবার অনেক মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। ফলে স্থানীয় পর্যায়ের অনেক বাস কোম্পানির পক্ষে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়া সম্ভব হয় না।
আরেকটি বিষয় হলো, এই প্ল্যাটফর্মে আসার কারণে বাস কোম্পানিগুলোর সেবার মান উন্নত হয়েছে, বা তারা সেটা করতে বাধ্য হয়েছে, কারণ মানুষ অনলাইনে টিকিট করার কারণে প্রত্যাশা করে, উন্নত সেবা পাওয়া যাবে। ফলে ভ্রমণ আরামদায়ক হয়েছে।
এ বিষয়ে সহজের পক্ষ থেকে বলা হয়, ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থা বাস কোম্পানির সেবার মানে পরিবর্তন এনেছে; উন্নত হয়েছে তাদের পরিচালন ব্যবস্থা। তারা এখন আগেভাগেই যাত্রীদের চাহিদা সম্পর্কে জানতে পারছেন, এবং যথাযথভাবে পথ পরিকল্পনা করতে পারছেন, যে পথে বেশি বাস প্রয়োজন, সেই পথে বেশি বাস দিতে পারছেন। সেই সঙ্গে এক আসন একাধিকবার সংরক্ষণ ও জালিয়াতির মতো ঘটনা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে। যাত্রীরাও উপকৃত হচ্ছেন। টিকিট কেটে আসন না পাওয়া বা প্রয়োজন হলে টিকিট বাতিল করে টাকা ফেরত পাচ্ছেন নির্বিঘ্নে।
জীবনযাত্রায় প্রভাব ও নতুন সম্ভাবনা
বর্তমান যুগ প্রযুক্তির সময়। প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষের জীবনযাত্রা বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তির কারণে যেমন কিছু মানুষের চাকরি চলে যাচ্ছে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে। ই-টিকিটিংয়ের কল্যাণে বাসের কাউন্টারে টিকিট বিক্রেতার সংখ্যা কমে গেছে ঠিক; কিন্তু একই সঙ্গে উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। সেই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে নতুন সুযোগ। এই সুযোগ মানুষের জীবনে এমএফএস সেবা চালু হওয়ার কারণে যেমন অনেক মানুষের জীবনে পরিবর্তন এসেছে, তৈরি হয়েছে নতুন বাস্তবতা, একইভাবে ই-টিকিটিংয়ের বদৌলতেও মানুষের জীবনে পরিবর্তন আসছে। যেকোনো পরিবর্তনের তিনটি দিক থাকে-অর্থনৈতিক, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক। যেমন, দেশে এমএফএস সেবা চালু হওয়ার পর প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের পক্ষে উদ্যোক্তা হওয়া সহজতর হয়েছে। তাঁরা এখন ভাবতে পারছেন, উদ্যোক্তা হওয়া সম্ভব। অনেকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। ফলে সমাজে ও পরিবারে তার প্রভাব পড়ছে-পরিবর্তন এসেছে তাঁদের মনস্তত্ত্বেও।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এক সময় জলপথই ছিল যাতায়াতের মূল মাধ্যম। এরপর রেলপথ ও পরবর্তীকালে সড়ক পথ তৈরি হয়। ফলে যাতায়াত এক সময় দুরূহ বিষয় ছিল। সেই বাস্তবতা এখন না থাকলেও জাতির সামষ্টিক স্মৃতিতে তার ছাপ এখনো রয়ে গেছে।
সাধারণত জেলা সদর বা উপজেলা সদর থেকে বাস ছাড়ে। ফলে এর মাঝামাঝি যারা বসবাস করেন, তাদের পক্ষে টিকিট করতে অনেকটা ঝক্কি পোহাতে হতো। ই-টিকিট সেই ঝামেলা মেটাতে পেরেছে। এ ছাড়া এখন হোটেল কক্ষ আগাম সংরক্ষণও অনলাইন করা যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে। অর্থাৎ অনিশ্চয়তা অনেকটাই দূর হয়েছে। যেকোনো জায়গা থেকে মানুষের পক্ষে এখন বাস, ট্রেনের টিকিট করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে যারা টিকিট করা ও হোটেলের আসন পাওয়ার ঝক্কি ঝামেলার কারণে কোথাও সাধারণত যেতে চাইতেন না, তাদের সেই ঝামেলা দূর হয়েছে। এতে পর্যটনেও প্রভাব পড়ছে।
ই-টিকিটিংয়ের সেবা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া উচিত বলে মনে করেন সমাজতাত্ত্বিক ও গবেষক খন্দকার সাখাওয়াত আলী। বলেন, এখন তো বড় বড় ক্ষেত্রে ই-টিকিটিং হচ্ছে-কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে ই-টিকিটিং থাকা উচিত। এখন যেমন রাইড শেয়ারিং আছে, তেমনি শহরের ভেতরে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও ই-টিকিট থাকা উচিত। সরকার নানাভাবে চেষ্টা করেও সফল হয়নি। সে ক্ষেত্রে এই টিকিটিং কোম্পানিগুলো সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। সেটা হলে আমাদের শহরের ভেতরের যাত্রাও সুখকর হবে-এটা অত্যন্ত জরুরি।
আরেকটি বিষয় হলো, এই সেবা সহজ করতে হবে-সে জন্য বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার করা যেতে পারে-এটা জনপ্রিয় করা দরকার বলে মনে করেন সাখাওয়াত আলী। সমাজতাত্ত্বিক হিসেবে তাঁর মত, এই সেবা সমাজের নিচের সারিতে পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, সাখাওয়াত আলী মনে করেন, এই সেবা গ্রাহকবান্ধব করতে হবে। গ্রাহক যদি আস্থা পায়, তাহলেই কেবল এই সেবার প্রসার হবে। সে জন্য তাঁদের কথা শুনতে হবে এবং যদি কোনো অভিযোগ থাকে, তার নিষ্পত্তি করতে হবে। এ ছাড়া সামগ্রিকভাবে রেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে।
এই সেবা দিতে শক্তিশালী আইটি বা তথ্য-প্রযুক্তি কাঠামো গড়ে তুলতে হয়েছে। ফলে এটার ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করা খুব জরুরি। তা না হলে এই শিল্প তেমন একটা স্থায়ীত্ব পাবে না। সে জন্য এই খাতের ব্যবসায়িক মডেলের মূল্যায়ন থাকা জরুরি। গ্রাহক, সেবাদাতা, পরিবহন কোম্পানি, আইটি ও সেই সঙ্গে স্বাধীন নিয়ন্ত্রক-সবাইকে নিয়ে এই মূল্যায়ন করতে হবে।
গ্রাহকের তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করেন সাখাওয়াত আলী। বলেন, ই-টিকিটিংয়ের ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রেই জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করা হয়। দেশে মানুষের মধ্যে তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে এমনিতেই বড় ধরনের শঙ্কা আছে; সেই শঙ্কা আমরে নিতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা মানুষকে অভ্যস্ত করতে হবে। তাদের আস্থা অর্জন করতে হবে। সে জন্য সাখাওয়াত আলী মনে করেন, ডায়নামিক প্রাইসিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, অর্থাৎ আগেভাগে টিকিট করলে কম পয়সায় করা যাবে-এটা হলে মানুষ ই-টিকিটিংয়ের উৎসাহী হবে। বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, প্রযুক্তি-নিরক্ষর ও শিশুরাও যেন তা ব্যবহার করতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হলে প্রযুক্তির অন্যান্য দিক যেমন কণ্ঠ, স্পর্শ প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে বলে তিনি মত দেন।
সহজ লিমিটেডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই খাতের সম্প্রসারণের আরও সুযোগ আছে, বিশেষ করে শহরের ভেতরকার বাস, মেট্রো রেল বা জলপথের টিকিটিং ব্যবস্থা ডিজিটাল করা সম্ভব। এ ছাড়া একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে বিভিন্ন পরিবহনের টিকিট করার সুযোগ রাখা দরকার বলে তারা মনে করে। এ ছাড়া করপোরেট টিকিট সলিউশন বা সমাধান ও সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক ভ্রমণ পরিকল্পনা থাকা উচিত। এসবের মধ্য দিয়েও এই খাতের সম্প্রসারণ হতে পারে।
পরিবহন কোম্পানির কথা
দেশের পরিবহন কোম্পানিগুলো প্রাথমিকভাবে টিকিট বিক্রয় ডিজিটাল করার ক্ষেত্রে অতটা আগ্রহী ছিল না। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, ততই তারা বুঝতে পারছে, এই ব্যবস্থায় সুবিধাই বেশি। যেমন, ডিজিটাল টিকিটিংয়ের কারণে জালিয়াতি রোধ করার পাশাপাশি আসন ব্যবস্থাপনা উন্নত হয়েছে ও পরিচালন ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে-এসব কারণে তারা এখন ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে।
শেষ কথা
পরিবহন বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, “অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থার এই ব্যাপক সম্প্রসারণ বাংলাদেশের পরিবহন খাতের ডিজিটাল রূপান্তরের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। এটি শুধু যাত্রীদের সুবিধা বৃদ্ধি করছে না, বরং পরিবহন খাতে কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করছে। এই ব্যবস্থা যাত্রীদের সময় ও খরচের সাশ্রয় ঘটাচ্ছে, সেই সঙ্গে দীর্ঘ লাইনের প্রতিটি মুহূর্তের বিড়ম্বনা দূর করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত প্রযুক্তি ও সিস্টেম স্থাপনের মাধ্যমে এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে আরও শক্তিশালী এবং ব্যবহারকারী বান্ধব করে তোলা জরুরি। বিশেষত রুটে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সিস্টেমের চাপ কমানোর জন্য উন্নত নেটওয়ার্ক সিস্টেম চালু করা প্রয়োজন।
ডিজিটাল টিকিট প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশের মফস্বল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্বিঘ্ন ইন্টারনেট সংযোগ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তা না হলে চাইলেও অনেক জায়গায় এই সেবা নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া ছোট ছোট পরিবহন কোম্পানির সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্ক স্থাপন করা এখনো সম্ভব হয়নি।
দেশের অন্যতম বৃহৎ পরিবহন কোম্পানি এস আর পরিবহন বেশ উৎসাহ উদ্দীপনার সঙ্গে ডিজিটাল টিকেটিং ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। যদিও তারা বর্তমানে মাত্র ২০% টিকিট ডিজিটাল মাধ্যমে বিক্রি করছে; তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো, শতভাগ টিকিট ডিজিটাল পদ্ধতিতে বিক্রি করা। পরিবহন ব্যবসায় সারাক্ষণ মনোযোগ দিতে হয় । ফলে ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থা তাদের জীবন কিছুটা আসান করেছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি। এখন টিকিট বিক্রির ঝামেলা অনেকটাই কমেছে। ২০% টিকিট ডিজিটাল মাধ্যমে বিক্রি হওয়ায় ফোন বুকিংয়ের আসন সংরক্ষণের ঝামেলা কমেছে। সেই সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, টিকিট বিক্রির হিসাবরক্ষণের সহজ হয়েছে—জালিয়াতি রোধ করা সম্ভব হয়েছে অনেকটাই। এখন এর মাধ্যমে দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়া গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে বলে তারা জানিয়েছে।
তারা মনে করছে, এই খাতের আরও বিকশিত হওয়ার সুযোগ আছে। বিশেষ করে দেশের মফস্বল অঞ্চলে অর্থাৎ ঢাকা ব্যতীত এক জেলা থেকে আরেক জেলা এবং জেলা সদর থেকে উপজেলা সদরে যেসব বাস চলাচল করছে, তাদেরও এই টিকিটের আওতায় আনা সম্ভব।