সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের বৃহস্পতিবারের সকালটা ছিল একেবারেই অস্বাভাবিক। হঠাৎ করেই তার বাসায় হাজির হয় মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। এরপর তাকে নেয়া হয় রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো প্রধান বিচারপতির হাতে পড়ল হাতকড়া।
খায়রুল হক ছিলেন কথাবার্তায় অত্যন্ত ভদ্র, চলাফেরায়ও স্মার্ট। দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশের বিচার বিভাগের অভিভাবক হিসেবে। কিন্তু কে বলবে, তিনিই এ দেশের বিচার বিভাগকে দলীয়করণের পথে প্রথম জোরালো ধাক্কাটি দিয়েছিলেন!
তার একটি ঐতিহাসিক রায়ের ফলেই ভেঙে পড়ে বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থা। সংক্ষিপ্ত রায়ে তিনি আরও দুই দফা তত্ত্বাবধায়ক সরকার চলার কথা বললেও, ১৬ মাস পর প্রকাশিত লিখিত রায়ে সেই অংশটি বাদ দিয়ে দেন। বিশ্লেষকদের মতে, তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে খুশি করতেই এই পরিবর্তন আনেন তিনি। এর পর থেকেই নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক, সহিংসতা আর অস্থিরতা।
অথচ রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি। বাংলাদেশের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনই হয়েছে বিতর্কিত। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই নির্বাচনের সময় সংঘাতে প্রাণহানি ঘটে, ধ্বংস হয় বহু সম্পদ। আর এই রায়ের পরিণতিতে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে দীর্ঘদিন ছিলেন বিচারপতি খায়রুল হক।
নিজেকে ব্রিটিশ লর্ড ড্যানিংয়ের মতো বিচারক ভাবতেন খায়রুল হক। অথচ তার বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে নেওয়া অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার দাবি উঠেছে বহুবার। অভিযোগ রয়েছে, তিনি অনিয়ম করে প্লটও নিয়েছেন।
ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী দেশের চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায়ও তিনি থেকে যান বিতর্কের কেন্দ্রে। সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এমনকি আনিসুল হককে পাশ কাটিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে নিজের পদে মেয়াদ বাড়িয়ে নেন।
প্রয়াত নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার তার স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘নির্বাচননামা: নির্বাচন কমিশনে আমার দিনগুলো’ তে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের অস্থিতিশীল রাজনীতির স্থপতি একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তি সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। আমি তাকে অরাজনৈতিক বললেও, তিনি পর্দার অন্তরাল থেকে দলীয় রাজনীতির পক্ষে-বিপক্ষে দাবার চাল দিয়েছেন।’
লোকে বলে-পাপ নাকি বাপকেও ছাড়ে না। সেটাই যেন প্রমাণ হয়ে গেল খায়রুল হকের জীবনে। বৃহস্পতিবার সকালেই তার বাসায় ডিবির উপস্থিতি এবং তার বিরুদ্ধে থাকা তিন মামলার একটিতে তাকে ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হয়।
এবার জীবন মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখতে শুরু করেছেন তিনি-যিনি কিনা দেশের ইতিহাসে প্রথম প্রধান বিচারপতি, যাকে পড়তে হলো হাতকড়া। আর সেই পথ, তৈরি করেছিলেন তিনি নিজেই।