মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ১২:৪২ পূর্বাহ্ন




রোহিঙ্গাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের ৯৬ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা ঘোষণা

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বুধবার, ১ অক্টোবর, ২০২৫ ৯:০৩ pm
মিয়ানমার বার্মা উখিয়া Rohingya Refugee people Ethnic group Myanmar stateless Rakhine রাখাইন রোহিঙ্গা শরণার্থী জনগণ সংকট মিয়ানমার উচ্ছেদ বাস্ত্যুচ্যুত ক্যাম্প উখিয়া নাগরিক
file pic

রোহিঙ্গাদের জন্য ৯৬ মিলিয়ন ডলারের নতুন সহায়তা ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ৬০ মিলিয়ন ডলার ও যুক্তরাজ্য ৩৬ মিলিয়ন ডলারের অনুদান ঘোষণা করেছে।

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা বিষয়ে প্রথম উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

রোহিঙ্গাদের সঙ্গে হওয়া অন্যায়-অবিচাররের প্রসঙ্গ দিয়ে সম্মেলনের সূচনা করেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক। মিয়ানমারের ক্রমবর্ধমান সংকট গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বেয়ারবক বলেন, ৫০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু একই ধরনের অভিজ্ঞতা বহন করছে। শুধু বাংলাদেশের কক্সবাজার শরণার্থী শিবিরেই ৮ লাখ শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে আছে।

তিনি জানান, ২০২৫ সালের মানবিক সহায়তা পরিকল্পনা এখনো মাত্র ১২ শতাংশ অর্থায়ন পেয়েছে। এটি সবাইকে ‘লজ্জিত’ করার মতো বিষয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ সময় সহায়তা বাড়াতে উপস্থিত দেশগুলোর প্রতি তিনি আহ্বান জানান। সেইসঙ্গে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেন।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছেন রোহিঙ্গা মুসলিমরা, যাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হয়েছে, ঘরবাড়ি থেকে উৎখাত করা হয়েছে এবং আশ্রয়শিবির কিংবা নির্বাসনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করছে, আর অসংখ্য মানুষ মিয়ানমারের ভেতরে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছে।

রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তার তহবিল ফুরিয়ে আসছে বলে সতর্ক করে মানবিক সংস্থাগুলো বলেছে, শরণার্থীরা অপুষ্টিতে ভুগছে এবং অনেকেই বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রার দিকে ঝুঁকছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অবস্থা কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছে মানবিক সংস্থাগুলো। সেখানে সাধারণ মানুষ সেনাবাহিনী ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বের মাঝে আটকা পড়েছে।

মানবাধিকার পদদলিত

জাতিসংঘ মহাসচিবের ক্যাবিনেট প্রধান কোর্টনি রাট্রের মাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের এ সংকট লাখ লাখ মানুষের মানবাধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে পদদলিত করেছে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

তিনি অবিলস্বে তিনটি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। সেগুলো হলো—আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা, মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা সম্প্রদায়ের ওপর চাপ কমাতে বিনিয়োগ বাড়ানো।

বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলা হয়, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, সমাধানও সেখানেই নিহিত। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে হবে এবং পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

জরুরি পদক্ষেপের দাবি

রোহিঙ্গা বিষয়ক কর্মীদের কাছে এ সম্মেলন কেবল সচেতনতা তৈরির সুযোগ নয়, বরং ন্যায়বিচারের দাবি জানানোর একটি মঞ্চ।

মিয়ানমার উইমেনস পিস নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াই ওয়াই নু সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিদের বলেন, ২০১৭ সালে যখন ৭ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু সহিংসতা থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসে, সেখানে কিন্তু নৃশংসতা শেষ হয়নি বরং আরও ভয়াবহ হয়েছে।

তিনি বলেন, মিয়ানমারে সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে রোহিঙ্গাদের হত্যা, জোরপূর্বক সেনা নিয়োগ, যৌন সহিংসতা ও অনাহারে ফেলে দেওয়ার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।

ওয়াই নু সতর্ক করে বলেন, এখনই কোনো পদক্ষেপ না নিলে ততক্ষণ পর্যন্ত রোহিঙ্গারা নিজভূমির বাইরে পাড়ি জমাতেই থাকবে, যতক্ষণ না মিয়ানমারে আর কোনো রোহিঙ্গা অবশিষ্ট থাকে।

তাছাড়া সীমান্ত পেরিয়ে মানবিক সহায়তা করিডর, লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা ও নৃশংসতার বিচার দাবিও জানান তিনি।

মানবতার জন্য পরীক্ষা

আরাকান ইয়ুথ পিস নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা রফিক হুসন নিজ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে জানান, কীভাবে জান্তা বাহিনী রোহিঙ্গা পুরুষ ও ছেলেদের জোর করে সেনা হিসেবে প্রায়শই মানবঢাল বানিয়ে ব্যবহার করেছে। এক সপ্তাহেই অন্তত ৪০০ জন নিহত হয়েছে বলে তিনি জানান।

গ্রাম পোড়ানো, ড্রোন হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের মে মাসের এক হামলায় এক দিনেই ২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তাহীনতার এ সংকট নিরসন করা কেবল এই পরিষদের নয়, মানবতারও পরীক্ষা।

এ সময় উত্তর রাখাইনে আন্তর্জাতিক তদারকিতে নিরাপদ অঞ্চল তৈরির আহ্বান জানান তিনি।

শান্তির কোনো স্পষ্ট রূপরেখা নেই

জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপ বলেন, মিয়ানমারের বহুমাত্রিক সংকট ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোনো যুদ্ধবিরতি না থাকার কারণে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে। এ বছর পরবর্তী নির্বাচনের পরিকল্পনা বৈধতা নয়, সহিংসতা বাড়াবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

শান্তির কোনো স্পষ্ট রূপরেখা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিয়ানমারের জান্তা সরকাররে প্রতি নিন্দা ক্রমশ কমছে, অথচ নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে বলেও দুঃখ প্রকাশ করেন জুলি।

অবশ্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা জাগ্রত করা গেলে এখনো সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন অনেকে।

সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে বেয়ারবক বলেন, রোহিঙ্গারা আট বছরের দুঃসহ জীবন, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তা সহ্য করেছে। তাদের সহনশীলতা বিস্ময়কর। আমাদের প্রতিক্রিয়াও সেই মানের হতে হবে।

এদিকে শুধু ঘোষণা যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছে রোহিঙ্গা বিষয়ক কর্মীরা। ওয়াই ওয়াই নু বলেন, ন্যায়বিচার কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়। সেটিই একমাত্র প্রতিরোধ, একমাত্র শান্তির পথ।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD