শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ০৪:১৫ অপরাহ্ন




বাংলাদেশের বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের নেপথ্যে

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬ ১০:৫৩ am
খেলা Bangladesh Cricket board bcb বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি bcb bcb
file pic

সময় বদলেছে, বদলেছে বৈশ্বিক ক্রিকেটের চেহারাও। আধুনিক জীবনের প্রায় সব কিছুর মতোই এই পরিবর্তনের সঙ্গে এসেছে বিশাল মাত্রার বিশৃঙ্খলা, উৎকণ্ঠা আর তিক্ততা। এক সময় ক্রিকেটীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানে ছিল মাঠে দুই প্রতিভাবান দলের ব্যাট-বল আর স্নায়ুর লড়াই। মানুষ বসত ঘরে, ক্লাবে, রাস্তার চায়ের দোকানে, কলেজ মাঠে জড়ো হয়ে আলোচনা করত—কোন ব্যাটার দুর্দান্ত ফর্মে আছে, কোন বোলার প্রতিপক্ষ ব্যাটিং লাইনআপকে নাস্তানাবুদ করতে পারে, কিংবা কোন অধিনায়কের ঝুলিতে বেশি কৌশল।

এখন সেই জায়গা দখল করেছে মাঠের বাইরের সংঘাত—দেশে দেশে, ক্রিকেট বোর্ডে বোর্ডে, কর্মকর্তাদের মধ্যে। টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার অনেক আগেই এসব ‘রাইভ্যালরি’ শিরোনাম হয়ে ওঠে। শুদ্ধতাবাদীরা এখনও আছেন, কিন্তু তারা সংখ্যায় কম। খেলাকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখার চেষ্টা এখন প্রায় অর্থহীন।

আসন্ন আইসিসি পুরুষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এমনই এক প্রতিভাবান দল, যারা আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ্যতা অর্জন করেছিল, তাদের সবচেয়ে বড় মঞ্চে খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এর সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের একটি দেশ—যেখানে ক্রিকেট জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ—তারা তাদের প্রিয় খেলোয়াড়দের বিশ্বমঞ্চে দেখতে পাবে না।

ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠেয় এই বিশ্বকাপের গ্রুপ সিতে বাংলাদেশের সঙ্গে ছিল ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নেপাল ও ইতালি। ওই গ্রুপে র্যাংকিংয়ের হিসেবে বাংলাদেশ ছিল তৃতীয়। টি-টোয়েন্টির মতো অনিশ্চিত ফরম্যাটে একদিনের ভালো ক্রিকেটই তাদের সুপার এইটে তুলে নিতে পারত। এরপর কী হতে পারত, তা কে জানে। এখন সবই কেবল অনুমান—যা নিঃসন্দেহে খুবই দুর্ভাগ্যজনক।

আইসিসির ২০২৪–২০৩১ মেয়াদের পুরুষদের টুর্নামেন্ট সূচির অংশ হিসেবে ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে সহ-আয়োজক ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২১ সালের নভেম্বরেই। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগও উঠে আসে।

এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি বড় প্রশ্ন ওঠে—

১. বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও বাংলাদেশ সরকার যদি সত্যিই মনে করে থাকত যে ভারতে তাদের খেলোয়াড়দের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি আছে, তাহলে বিষয়টি আগেই তোলা হয়নি কেন?

২. কেন অন্তর্বর্তী সরকার ঠিক সেই দিনই বিসিবিকে আইসিসির কাছে ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধ জানাতে নির্দেশ দিল, যেদিন কলকাতা নাইট রাইডার্স আইপিএল ২০২৬ স্কোয়াড থেকে বাংলাদেশের ফাস্ট বোলার মুস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেয়? (মুস্তাফিজকে ৩ জানুয়ারি ২০২৬ মুক্ত করা হয়, আর ভেন্যু পরিবর্তনের আবেদন করা হয় ৪ জানুয়ারি)।

৩. এ বিষয়ে বিসিবি কি সরাসরি বিসিসিআইয়ের সঙ্গে কথা বলেছিল?

৪. আর কেন অন্তর্বর্তী সরকার অনির্দিষ্টকালের জন্য আইপিএলের সব সম্প্রচার ও প্রচার নিষিদ্ধ করল? এর সঙ্গে ভারতে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তারই বা কী সম্পর্ক? সরকার বলেছিল এটি ‘জনস্বার্থে’, কিন্তু ব্যাপকভাবে এটিকে দেখা হয়েছে মুস্তাফিজকে আইপিএলে খেলতে না দেওয়ার পালটা প্রতিক্রিয়া হিসেবে। কারণ আইপিএল ২০২৬-এ তিনিই ছিলেন একমাত্র বাংলাদেশি খেলোয়াড়।

এই দিক থেকে দেখলে, পুরো মুস্তাফিজ অধ্যায়টি কি আরও ভালোভাবে সামলানো যেত? অবশ্যই। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম দফার সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশে পরিস্থিতি কতটা অস্থির ছিল, তা সবারই জানা। শান্তিপূর্ণ দাবিদাওয়া খুব দ্রুত সহিংস সংঘাতে রূপ নেয়।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের মাটিতে বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে জনরোষ এড়ানোর সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হতে পারত—মুস্তাফিজকে নিলামে না তোলা। কিন্তু তা করা হয়নি। বরং কলকাতা নাইট রাইডার্স তাকে ৯ কোটি রুপিতে কিনল, তারপর ফ্র্যাঞ্চাইজিকে তাকে ছেড়ে দিতে বলা হল। বাংলাদেশ একে চরম অপমান হিসেবে দেখেছে, যা কূটনৈতিক অচলাবস্থাকে আরও জটিল করে তোলে।

এই সংকট এড়ানো যেত কি? মুস্তাফিজের প্রতি সেটা অন্যায় হত ঠিকই, কিন্তু নিলামের আগেই তাকে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জানানো অনেক ভালো হত—চুক্তি ও বড় অঙ্কের অর্থ পাওয়ার পর তাকে না খেলার কথা জানানোর চেয়ে।

তবে বাংলাদেশের শাসকদের এটাও বোঝা দরকার ছিল যে, দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎকে বাজি রেখে এটিকে অহংয়ের লড়াইয়ে পরিণত করা যায় না। ঝুঁকি ছিল অত্যন্ত বড়। আইসিসি ভারতে অবস্থানকালে খেলোয়াড় ও স্টাফদের জন্য বাড়তি নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছিল। এমনকি আইসিসির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মূল্যায়নেও বাংলাদেশের দলের জন্য কোনো নির্দিষ্ট হুমকি পাওয়া যায়নি। তবুও ভেন্যু পরিবর্তনের দাবিতে অনড় থেকে বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকি দিয়ে বাংলাদেশ অত্যন্ত বড় ঝুঁকি নিয়েছে।

পরিণতি হয়েছে উল্টো। হারানো সম্মান উদ্ধারের চেষ্টা ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আইসিসি দ্রুতই বাংলাদেশকে সরিয়ে স্কটল্যান্ডকে টুর্নামেন্টে অন্তর্ভুক্ত করেছে। যারা এই সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছেন, তাদের বর্তমান বাস্তবতা বোঝা দরকার। আর্থিকসহ এর ঢেউয়ের প্রভাব হবে ব্যাপক।

খবরে বলা হচ্ছে, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের জন্য যে ৩০ লাখ ডলার (প্রায় ৩৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা) ফি পাওয়ার কথা ছিল, তা বাংলাদেশ পাবে না। সঙ্গে যোগ হবে সম্ভাব্য পুরস্কারমূল্যের ক্ষতি। সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসবে আইসিসির কেন্দ্রীয় আয়ের অংশে। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, আইসিসির বার্ষিক আয়ের ৪.৪৬ শতাংশ পায় বাংলাদেশ—যার পরিমাণ প্রায় ২৭ থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার। এটি বিসিবির বার্ষিক আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ। সেটিই এখন ঝুঁকির মুখে।

এর সঙ্গে যোগ হবে বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণে আইসিসির আরোপিত ২০ লাখ ডলারের জরিমানা। আইসিসির মেম্বার পার্টিসিপেশন এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী, যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া কোনও সদস্য দেশ টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ালে এই জরিমানা দিতে হয়। এছাড়া দেশের সম্প্রচারকারী সংস্থার প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি, বিজ্ঞাপন আয়ের লোকসান, আর বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের সম্ভাব্য স্পনসরশিপ হারানোর ঝুঁকিও রয়েছে। আধুনিক ক্রিকেটে দৃশ্যমানতাই স্পনসরদের কাছে সবচেয়ে বড় সম্পদ।

সময় অনেক কিছুই সারিয়ে তোলে। হয়তো বিসিবি কোনওভাবে আর্থিক ক্ষতি সামাল দেবে। কিন্তু ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যতের দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট সম্পর্ক—অর্থাৎ আরও কোটি কোটি টাকার ক্রিকেট ও সম্প্রচার আয়ের সম্ভাবনাও তারা বড় ঝুঁকিতে ফেলেছে।

কূটনৈতিক সম্পর্ক যে দিকেই যাক না কেন, ক্রিকেটীয় সম্পর্ক যে চাপের মুখে পড়বে, তা স্পষ্ট। চলতি বছরই ভারতের বাংলাদেশ সফরের কথা রয়েছে। (সাদা বলের সেই সফরটি ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে পিছিয়ে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে নেওয়া হয়েছিল)। সেই সফর কি আদৌ পরিকল্পনা অনুযায়ী হবে?

ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল দাবি করেন, আইসিসি নাকি তিনটি সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলেছিল—মুস্তাফিজুর রহমানের অংশগ্রহণ, বাংলাদেশি সমর্থকদের জাতীয় জার্সি পরে মাঠে আসা, এবং ১২ ফেব্রুয়ারির আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের কারণে বাড়তি নিরাপত্তা ঝুঁকি। তবে আইসিসির একটি সূত্র এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে। পিটিআইকে ওই সূত্র জানায়, ‘আসিফ নজরুল যা বলেছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আইসিসির কোনো যোগাযোগেই মুস্তাফিজের নির্বাচনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। এমন কোনো পরামর্শ ছিল না।’

তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়—আইসিসির পক্ষ থেকে যদি এমন কোনো বার্তা না এসে থাকে, অন্তত মুস্তাফিজের ব্যাপারে, তাহলে এই অসত্য বলা কেন প্রয়োজন হল? এত আশ্বাস আর এত কিছুর ঝুঁকি সত্ত্বেও নিজের অবস্থানে অনড় থাকাই কি এতটা জরুরি ছিল?

লেখক সাবেক ক্রীড়া সম্পাদক ও প্রাইমটাইম ক্রীড়া সংবাদ উপস্থাপক। বর্তমানে তিনি কলাম লেখক, ফিচার রাইটার ও মঞ্চ অভিনেতা।

সূত্র: এনডিটিভি




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD