জমি তলানো বড় একটি অংশ লবণপানি
অসময়ের অতিবৃষ্টি আর ভরা কটালের জোয়ারে ডুবে হাজার কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে বরিশালে। কেবল বোরো, রোপা আউশ ধান আর আউশের বীজতলা নয়, ক্ষতির এ তালিকায় গ্রীষ্মকালীন শাক-সবজির পাশাপাশি আছে পাট, পেঁপে, কলা, পান, মুগ, মরিচ, তিল, সয়াবিনসহ আরও নানা ফসল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবেই যে ক্ষতির আর্থিক মূল্য ৮৪০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। তবে বাস্তবে এই পরিমাণ আরও অনেক বেশি বলে দাবি সাধারণ কৃষকদের। কম করে হলেও হাজার কোটি টাকার ফসল বিনষ্ট হয়েছে-বলছেন তারা। ফসল বিনষ্টের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কৃষকের সংখ্যাও লাখ ছাড়িয়েছে। কৃষি বিভাগ বলছে, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় বিনষ্ট হওয়া ফসলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা এক লাখ ৮৫৯ জন। এদের প্রায় সবারই এখন পথে বসার দশা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, এ বছর শুকনো মৌসুমে চার লাখ ১৯ হাজার ১৫৭ হেক্টর জমিতে ধান ও গ্রীষ্মকালীন শাক-সবজিসহ নানা ফসলের আবাদ করেন বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার কৃষকরা। ২৮ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ৩ মে পর্যন্ত চলা অকাল অতিবৃষ্টিতে এর মধ্যে এক লাখ ৯০ হাজার ২২২ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে নদ-নদীতে উঁচু হয়ে আসা জোয়ারে তলিয়েও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। হিসাব অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মুগ ডালের। ৭৬ হাজার ৬৮৯ হেক্টর জমিতে থাকা মুগের পুরোটাই নষ্ট হয়েছে পানিতে। এছাড়া ৭৫ হাজার ৬১১ হেক্টর জমিতে থাকা বোরো ধানও নষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি ১০ হাজার ৫৯৪ হেক্টর জমিতে থাকা চিনা বাদাম, সাত হাজার ৯০ হেক্টর জমির মরিচ, চার হাজার ৪৪৮ হেক্টর জমির সয়াবিন, তিন হাজার ৮৩৬ হেক্টর জমির ফেলন, তিন হাজার ১৯৫ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন শাক-সবজি এবং দুই হাজার ৬৯২ হেক্টর জমির সূর্যমুখী ফসল ঘরে তুলতে পারেননি কৃষক। এছাড়া ক্ষতি হওয়া ফসলের মধ্যে আছে আউশ বীজতলা ৬২৬ হেক্টর, রোপা আউশ ধান ৫১২ হেক্টর, পাট ২২২ হেক্টর, পেঁপে ২৮৩ হেক্টর, কলা ৭৪০ হেক্টর, পান ৮৫৫ হেক্টর, মিষ্টি আলু ৮০১ হেক্টর, ভুট্টা ১ হাজার ৮১৯ হেক্টর ও তিল ২০৯ হেক্টর। কৃষি বিভাগ বলছে, এক লাখ ৮৫৯ জন কৃষকের মালিকানায় থাকা এ বিপুল পরিমাণ ফসলের যে ক্ষতি তার পরিপূর্ণ প্রতিবেদন ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে ক্ষয়ক্ষতির যে হিসাব ঢাকায় পাঠানো হয়েছে বাস্তবে তার চেয়ে ক্ষতি অনেক বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন এলাকার মাঠপর্যায়ের কৃষকরা। পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাস ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মশিউর রহমান বাবুল বলেন, ‘টানা পাঁচ-ছয় দিনের অতিবৃষ্টির পাশাপাশি এপ্রিলের শেষভাগে উঁচু হয়ে জোয়ার আসে উপকূলীয় এলাকায় থাকা নদ-নদীতে। আমাদের এ এলাকার বহু চরে এখনো তৈরি করা হয়নি বেড়িবাঁধ। কৃষকরা জোয়ার ভাটা আর ঝড় জলোচ্ছ্বাসের মৌসুম হিসাব করে জমিতে ফসল বোনে। এবার আর তাদের কোনো হিসাব কাজে আসেনি। নদীতে উঁচু হয়ে আসা জোয়ারের উপচে ওঠা পানিতে তলিয়েছে হাজারও একর ফসলের মাঠ। সবচেয়ে বড় যে বিপদ তা হলো জমি তলানো এ পানির বড় একটি অংশ লবনপানি। এতে বহু এলাকার ফসলের জমির স্থায়ী ক্ষতি হয়েছে। কৃষি বিভাগের লোকজন যেসব হিসাব দিচ্ছে বাস্তবে তার চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা অনেক বেশি। আমার ইউনিয়নের পুরো হিসাবই তো নেয়নি কৃষি বিভাগের কর্মীরা।’
ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলা শহর থেকে মোল্লারহাট পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমটার দীর্ঘ সড়কের দুপাশে থাকা জমির বোরো ধান এখনো পানির নিচে। কৃষকরা আধাপাকা ভেজা ধান জমি থেকে কেটে রাস্তায় রেখে শুকানোর চেষ্টা করছেন। এই একটি উপজেলাতেই তো তিন-চার হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে পুরো বিভাগে মাত্র ৭৫ হাজার ৬১১ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয় কি করে? বাস্তবে এ ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি।’
কেবল পটুয়াখালী-ঝালকাঠি নয়, অসময়ের অতিবৃষ্টির সঙ্গে ভরা কটালের উঁচু জোয়ার মিলে কৃষকের এ সর্বনাশের চিত্র এখন বিভাগজুড়ে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা বরগুনায় ৪৩ হাজার ৬৪০। এছাড়া পটুয়াখালীতে ৩০ হাজার ৬২৬, ভোলায় ২৩ হাজার ৩৭৩, পিরোজপুরে এক হাজার ২০ এবং ঝালকাঠিতে এক হাজার ৩০০ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. জামালউদ্দিন বলেন, প্রতি বছরই এ মৌসুমে কিছু বৃষ্টি হয়। কিন্তু এ বছর তা ছিল অস্বাভাবিক। পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে গত কয়েক বছর ধরেই এভাবে খেয়ালি আচরণ করছে প্রকৃতি। এ খেয়ালি আচরণের কারণে অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টিতে বারবার ফসলহানিসহ নানা ক্ষতির শিকার হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বরিশালের অতিরিক্ত পরিচালক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি শিগগিরই মন্ত্রণালয় থেকে এ ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া পাব।
(যুগান্তর)