ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো কোরবানি, যা ঈদুল আজহার মূল আকর্ষণ। এই ইবাদত শুধু পশু জবাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য, ত্যাগ ও তাকওয়ার এক মহান প্রতীক। তাই একজন কোরবানিদাতার উচিত আগে থেকেই যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করা এবং কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে নিজেকে প্রস্তুত করা।
কোরবানির তাৎপর্য ও লক্ষ্য
কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। মহান আল্লাহ বলেন : আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তাদের গোশত ও রক্ত, বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া। (সুরা আল-হাজ্জ : ৩৭)
এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয় কোরবানির আসল শিক্ষা হলো হৃদয়ের পবিত্রতা ও আল্লাহভীতি।
কোরবানির অগ্রিম প্রস্তুতি
১. নিয়ত শুদ্ধ করা
প্রথম ও প্রধান প্রস্তুতি হলো নিয়ত ঠিক করা। কোরবানি যেন লোকদেখানো বা সামাজিক মর্যাদা অর্জনের জন্য না হয়, বরং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়। হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। (বুখারি : ১)
২. হালাল উপার্জনের অর্থ নিশ্চিত করা
কোরবানির পশু অবশ্যই হালাল উপার্জনের অর্থ দিয়ে কিনতে হবে। হারাম উপার্জনে করা ইবাদত কবুল হয় না।
৩. উত্তম ও সুস্থ পশু নির্বাচন
কোরবানির পশু হতে হবে ত্রুটিমুক্ত ও নির্ধারিত বয়সের। রাসুল (সা.) বলেছেন, চার ধরনের পশু কোরবানির জন্য গ্রহণযোগ্য নয় অন্ধ, রোগাক্রান্ত, খোঁড়া ও অত্যন্ত দুর্বল। (আবু দাউদ)
৪. জিলহজের চাঁদ দেখার পর…
যখন জিলহজ মাস শুরু হবে, তখন কোরবানিদাতা চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোরবানি করতে চায়, সে যেন (জিলহজের চাঁদ দেখার পর) তার চুল ও নখ না কাটে। (মুসলিম : ১৯৭৭)
কোরবানিদাতার গুরুত্বপূর্ণ আমল
১. তাকওয়া ও ইবাদতে মনোযোগ বৃদ্ধি
এ সময় বেশি বেশি নামাজ, তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়া করা উচিত।
২. তাকবির ও জিকির পাঠ
বিশেষ করে, ৯ জিলহজ (আরাফার দিন) থেকে তাকবিরে তাশরিক পড়া সুন্নত। ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার…
৩. রোজা রাখা (বিশেষত আরাফার দিন)
৯ জিলহজে রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আরাফার দিনের রোজা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে।’ (মুসলিম)
৪. কোরবানি নিজ হাতে করা
সম্ভব হলে নিজ হাতে কোরবানি করা উত্তম। হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেই কোরবানি করতেন। (বুখারি)
৫. কোরবানির দোয়া ও তাকবির পাঠ
জবাইয়ের সময় বলা : বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার (বুখারি)
কোরবানির সামাজিক ও মানবিক দিক
কোরবানি শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; এটি সমাজে সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলে। কোরবানির গোশত তিন ভাগে বণ্টন করা উত্তম : এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনের জন্য এবং এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের জন্য।
কোরবানি একটি সামগ্রিক ইবাদত, যেখানে নিয়ত, ত্যাগ, তাকওয়া ও মানবিকতা একসঙ্গে মিলিত হয়। একজন সচেতন মুসলমানের উচিত অগ্রিম প্রস্তুতি গ্রহণ করে এই ইবাদতকে পরিপূর্ণভাবে আদায় করা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা উপলব্ধি করার এবং তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।