বুধবার, ২৭ মে ২০২৬, ১০:০৮ অপরাহ্ন




সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান

যে কোনো মূল্যে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে: তারেক রহমান

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ২:০২ pm
Tarique Rahman তারেক রহমান Bangladesh Nationalist Party BNP ‎বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি
file pic

ঐক্যে শক্তি, বিভাজনে দুর্বলতা

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বললেন, ‘জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন দুর্বলতা।’ একই সঙ্গে সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা ও সহযোগিতা চেয়েছেন। তাঁর ভাষায়, এখন দেশ গড়ার পালা। সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

সংসদ নির্বাচনে ফল প্রকাশের পর শনিবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের বলরুমে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন তারেক রহমান। এ সময় তাঁর পাশে ছিলেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির চেয়ারম্যান প্রথমে নতুন সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এর পর তিনি দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই কথা বলেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে গতকাল সাদা শার্ট পরে এসেছিলেন তারেক রহমান। হাস্যোজ্জ্বল মুখে তিনি বলরুমে প্রবেশ করেন। এ সময় নেতারা দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানান। অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করে সাংবাদিকদের দিকে হাত তুলে সালাম জানান বিএনপির চেয়ারম্যান। এর পর দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে তিনি সংবাদ সম্মেলনের মঞ্চে বসেন।

সংযত, সতর্ক থাকার আহ্বান
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হওয়ার পরেও তা উদযাপনে নেতাকর্মীদের সংযমী ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান বিএনপির চেয়ারম্যান। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, যে কোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে হবে। কোনো ধরনের সহিংসতা, প্রতিশোধ বা উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না।

নির্বাচনে বিজয়কে পুরো বাংলাদেশের, গণতন্ত্রের ও গণতন্ত্রকামী জনগণের বলে অভিহিত করেন বিএনপির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, আজ থেকে আমরা সবাই স্বাধীন। এ সময় দেশের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে কোথাও কোথাও ভুল বোঝাবুঝি বা উত্তেজনা তৈরি হয়ে থাকতে পারে, তবে তা যেন কোনোভাবেই প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসায় রূপ না নেয়। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ কিংবা ভিন্নমত যা-ই হোক; কোনো অজুহাতেই দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ মেনে নেওয়া হবে না।

তারেক রহমান বলেন, ন্যায়পরায়ণতাই হবে আমাদের আদর্শ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে সব প্রচেষ্টা বৃথা যেতে বাধ্য। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারি কিংবা বিরোধী দল, অন্য মত কিংবা ভিন্নমত– প্রত্যেক নাগরিকের ক্ষেত্রেই আইনের প্রয়োগ করা হবে বিধিবদ্ধ নিয়মে।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হলে গণতন্ত্র টেকসই হবে না। সরকারি দল বা বিরোধী দল– সবার জন্য আইন সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে কেউ যেন সুযোগ নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, অকার্যকর করে দেওয়া সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছি। আপনাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর দেশে আবার জনগণের সরাসরি ভোটে দায়বদ্ধতামূলক সংসদ এবং সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আর কোনো অপশক্তি যাতে দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে না পারে; দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, এ জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান তারেক রহমান। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশ গঠনে আপনাদের চিন্তাভাবনাও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পথ এবং মত ভিন্ন থাকতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। আমি বিশ্বাস করি, জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।

বিএনপিপ্রধান বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলোই মূলত গণতন্ত্রের বাতিঘর। সরকার ও বিরোধী দল যে যার অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে অবশ্যই দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আসুন যেভাবে আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ভূমিকা রেখেছিলাম, একইভাবে এবার দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহির মাধ্যমে একটি নিরাপদ মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য যে যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখি। একটি নিরাপদ মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যাত্রাপথে আমি ভিন্ন দল, ভিন্নমতের সবার সহযোগিতা আশা করছি।

বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, সব সংশয় কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত দেশে শান্তিপূর্ণ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, অন্তর্বর্তী সরকারসহ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

৩১ দফা, জুলাই সনদ
রাষ্ট্র মেরামতের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তারেক রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক দল এবং জনগণের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে ৩১ দফা প্রণয়ন করেছিল বিএনপি। ৩১ দফার আলোকে ঘোষণা করা হয়েছিল ইশতেহার। একই সঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে বিএনপি জুলাই সনদেও সই করেছিল। আমরা জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ– প্রত্যাশিত প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করব।

তারেক রহমান একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালে দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলনসহ এই দীর্ঘ সময়ে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, হতাহত হয়েছেন; যাদের রক্ত মাড়িয়ে, কষ্টের সিঁড়ি বেয়ে আজকের এই গণতান্ত্ৰিক বাংলাদেশ, সেই সব বীর শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।

খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, সারাদেশে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী, সমর্থক ছাড়াও দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের সামনে আজকের এই সময়টি ভীষণ আনন্দের। এমন এক আনন্দঘন পরিবেশে আপসহীন দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি আমাদের ভারাক্রান্ত করে। রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার এমন একটি গণতান্ত্রিক সময়ের প্রত্যাশায় তিনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়েছিলেন। স্বৈরাচার কিংবা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে কখনোই আপস করেননি। দেশ এবং জনগণের স্বার্থের প্রশ্নে বরাবরই তিনি ছিলেন অটল-অবিচল। আমরা আল্লাহর দরবারে মরহুম খালেদা জিয়ার মাগফেরাত কামনা করছি।

তারেক রহমান আরও বলেন, স্বাধীনতার ঘোষকের প্রতিষ্ঠিত বিএনপিকে দেশের জনগণ আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার ম্যান্ডেট দিয়েছে। জনগণ বিএনপির প্রতি যে বিশ্বাস ও ভালোবাসা দেখিয়েছে, এবার নিরলস কাজের মাধ্যমে এর প্রতিদান দিতে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যেতে হবে।

বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী-সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, শত নির্যাতন-নিপীড়নের পরও আপনারা রাজপথ ছাড়েননি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অনড় ছিলেন। এবার দেশ গড়ার পালা। দেশ পুনর্গঠনের এই যাত্রায় আপনি, আমি, আমাদের প্রত্যেককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

শেখ হাসিনা প্রসঙ্গ
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরানোর বিষয়ে তারেক রহমানকে প্রশ্ন করেন এক সাংবাদিক। জবাবে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, এটি আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে।

পরে আবার প্রশ্ন করা হয়, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যেখানে আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থক রয়েছে, সেই বিবেচনায় সমস্যা সমাধান বা মিটমাটের জন্য পরিকল্পনা কী? জবাবে তারেক রহমান বলেন, ‘আইনের শাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে সমাধান হবে।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রায় বা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হবে কিনা– এ রকম আরেকটি প্রশ্নের উত্তর দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনিও বলেন, এটি বিচার বিভাগের বিষয়।

বিএনপি সরকার শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চালিয়ে যাবে কিনা– এমন প্রশ্ন এলেও তার উত্তর দেওয়া হয়নি। সংবাদ সম্মেলনে পুরো সময়টাতেই সংক্ষেপে বক্তব্য দেন তারেক রহমান। পরে প্রশ্নোত্তর পর্বেও খুব অল্প কথায় উত্তর দেন।

অনুষ্ঠান শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সবার উদ্দেশে হাত তুলে বিজয় চিহ্ন দেখান তারেক রহমান। সংবাদ সম্মেলনে সূচনা বক্তব্য দেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সমাপনী বক্তব্য দেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, হুমায়ুন কবিরসহ দেশের বিভিন্ন আসনে বিএনপির বিজয়ী প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD