উচ্চ সুদহার, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নীতি দুর্বলতার কারণে চাপের মুখে রয়েছে অর্থনীতি। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক চুক্তি রপ্তানি খাতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। বিদ্যমান চুক্তির পুনর্বিবেচনা করার দাবি জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের সংগঠন ডিসিসিআই।
সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত সেমিনারের শুরুতে লিখিত বক্তব্য দেন সংগঠনের সভাপতি তাসকীন আহমেদ। ‘বেসরকারিখাতের দৃষ্টিতে অর্থনীতির বিদ্যমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা’ শীর্ষক এ সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি।
জোনায়েদ সাকি বলেন, অর্থনীতি খাতের কিনারে গেছিলো। এর মধ্যে একটা বৈরী অবস্থা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিকে একটা শক্তিশালী অবস্থায় নেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। কর-জিডিপি বাড়াতে লিকেজ বন্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, রপ্তানি বৈচিত্র্য ও নতুন বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি নীতি সংস্কার ছাড়া অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে নীতিমালা হালনাগাদ করা জরুরি। এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখা, বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।
তাসকীন আহমেদ বলেন, ২০২৫ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যে দুই লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, তা অর্জন সম্ভব হয়নি। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২.২৬ ট্রিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ৪.১ শতাংশ। যদিও প্রাথমিকভাবে ঘাটতি ধরা হয়েছিল ২.৫৬ ট্রিলিয়ন টাকা।
তিনি আরও বলেন, ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে কমে ৬.৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের বছর ছিল ৭.২ শতাংশ। এটি রাজস্ব আহরণ সক্ষমতার জন্য উদ্বেগজনক।
কর ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সম্পূর্ণ অটোমেশন ও স্বয়ংক্রিয় ট্যাক্স ব্যবস্থাপনা না থাকায় কর আদায়ে বিলম্ব এবং স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। তাই, প্রত্যক্ষ করের ওপর গুরুত্ব বাড়িয়ে অনানুষ্ঠানিক ও আন্ডার-রিপোর্টেড খাতগুলোকে করের আওতায় এনে করভিত্তি সম্প্রসারণ করতে হবে। পাশাপাশি ই-নিবন্ধন, ই-রিটার্ন, ই-পেমেন্ট, ই-অডিট ও ই-রিফান্ডসহ পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সেবা চালুর পাশাপাশি ভ্যাট, আয়কর ও কাস্টমস সংযুক্ত একটি সমন্বিত কেন্দ্রীয় ডেটাবেস গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। নীতি সুদহার ১০ শতাংশে স্থির রাখার ফলে ঋণের সুদ বেড়ে ১৬ শতাংশ বা তারও বেশি উঠেছে। বেসরকারি খাতের ঋণ গ্রহণ ও বিনিয়োগ কার্যক্রম মন্থর হয়ে গেছে।
তাসকীন আহমেদ বলেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৪৯ শতাংশে, যা সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। খাদ্যমূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৭.১ শতাংশে এলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি রয়েছে ৯.১৩ শতাংশ। তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি কোনো সাময়িক সংকট নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা ও নীতিগত দুর্বলতার প্রতিফলন। বাজারে অব্যবস্থাপনা, অবৈধ সিন্ডিকেট এবং অতিরিক্ত সরকারি ঋণ গ্রহণের অন্যতম কারণ।
তাসকীন আহমেদ বলেন, বাজার নজরদারি জোরদার করতে হবে এবং মজুতবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। পাশাপাশি সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী করা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে কৃষি খাতের জিডিপিতে অবদান কমে ২.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। কৃষি পণ্যের সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করার মাধ্যমে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। আর উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ বাড়ানো জরুরি। বর্তমানে মাত্র ৫০ শতাংশ কৃষক যান্ত্রিক চাষাবাদ ব্যবহার করছেন, যেখানে ভারতে এই হার প্রায় ৮০ শতাংশ।
তিনি আরও বলেন, টার্গেটেড ভর্তুকি ও জামানতবিহীন স্বল্পসুদের ঋণের মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন।
পোশাক খাতে নতুন বাজারের প্রয়োজন
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি ১৯.৩৭ বিলিয়ন ডলার হলেও আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এই পরিস্থিতিতে ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়ন, মারকোসুর এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে ম্যানমেড ফাইবারভিত্তিক পণ্যের বাজার বাড়াতে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
তাসকীন আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে চামড়া খাতে পরিবেশগত মান বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সাভারের সিইটিপির পরিশোধন ক্ষমতা বর্তমানে ১৪ হাজার কিউবিক মিটার থেকে বাড়িয়ে ৩৫ হাজার কিউবিক মিটারে উন্নীত করার প্রয়োজন। কোরবানির সময় কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের সমস্যার কথা তুলে ধরে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে প্রতি বছর কোরবানির সময় ১০ থেকে ২০ শতাংশ কাঁচা চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। এ সমস্যা সমাধানে এতিমখানা, মাদ্রাসা ও মসজিদ কর্তৃপক্ষকে স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে লবণ ও বরফ সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।