ড. মো. অলিউর রহমান
স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার নজরদারির মধ্য দিয়ে পেশাদারি গণমাধ্যমের হাত ধরে বিকশিত হয় অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র। আর সেই সক্ষমতার প্রভাব মূল্যায়নে গণমাধ্যমকে বলা হয় ‘রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ’। সংগতকারণে কাঙ্ক্ষিত দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা তথা পেশাদারি গণমাধ্যমশিল্পকে বিকশিত করার জন্য চাই একটি উচ্চতর দক্ষতা সম্পন্ন জাতীয় প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। সেই তাগিদ থেকেই ১৯৭৬ সালে ১৮ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী নীতিগত সিদ্ধান্তের সফল বাস্তবায়নে একটি গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান প্রেস ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি)। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা চর্চার অনুকূলে সাংবাদিকতায় মানবসম্পাদ উন্নয়নে অব্যাহত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি গণমাধ্যম গবেষণা ও প্রকাশনার এক দূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে এই জাতীয় ‘সংবাদক্ষেত্র (Press)’ উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু সুবর্ণজয়ন্তী পালনের বছর জাতির বিবেক তৈরির প্রতিষ্ঠানটির পঞ্চাশ বছরে আজ এ কী দশা !
সাংবাদিকতায় মানসম্পদ উন্নয়নের অধ্যয়ন ও প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং প্রকাশনাসহ সংবাদক্ষেত্র (Press) তথা গণমাধ্যম সেক্টরের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে নিবেদিত এই জাতীয় প্রতিষ্ঠান – পিআইবি প্রতিষ্ঠার পর থেকে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করে আসলেও গত ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে, বিশেষ করে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিয়োজিত মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফের কর্মকালে এটি তার ভিশন, মিশন ও অভীষ্ট কর্মসূচি থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গিয়েছে।
পিআইবি প্রতিষ্ঠার মৌলিক লক্ষ (ভিশন) এবং এর উদ্দীষ্ট কার্যক্রমের (মিশন) আওতায় প্রথম ধাপ ছিলো বাংলাদেশে সাংবাদিকতা বিকাশের জন্য পেশাদার, দায়িত্বশীল, নৈতিক ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে একটি জাতীয় গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। দ্বিতীয় ধাপে পিআইবি‘র অভীষ্ট কার্যক্রমে (মিশন) গুরুত্ব পাওয়ার কথা সাংবাদিকতার পেশাগত মান উন্নয়ন, অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক পরিবেশে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা চর্চার উৎকর্ষে সাংবাদিকতা বিষয়ক যুগোপেযোগী অধ্যয়ন-প্রশিক্ষণ সম্প্রাসারণ, গণমাধ্যম গবেষণা ও নীতি উন্নয়ন, সংবাদপত্র আর্কাইভ ও মিডিয়া ডকুমেন্টেশন, সাংবাদিকতা বিষয়ক গ্রন্থ, গবেষণা প্রতিবেদন ও জার্নাল প্রকাশ, এবং সর্বোপরি, গণমাধ্যম উন্নয়ন বিষয়ে সরকারকে গবেষণাভিত্তিক পরামর্শ দেওয়া।
অতীতে বহু কীর্তিমান জৈষ্ঠ সাংবাদিক ও গণমাধ্যম শিক্ষক-ব্যক্তিত্ব পিআইবি’র মহাপরিচালকের দায়িত্ব সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন উল্লিখিত কার্যক্রমকে বহুদূর এুগয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন। আবদুস সালাম, সৈয়দ মুর্তজা আলী, আবদুল ওয়াহাব, তোয়াব খান, এ.বি.এম. মুসা, শহীদুল হক, অধ্যাপক তৌহিদুল অনোয়ার ,অধ্যাপক শেখ আব্দুস সালাম, ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী প্রমুখ মহাপনিচালকের কার্যকালে পিআইবি ছিলো তএর লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের অনুকূলে অত্যন্ত কর্মমুখর। কিন্তু ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগ সরকারের শাসনামলের ধারাবাহিকতায় বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এসে পিআইবি ব্যাপক দুর্নীতি ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অথর্ব প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে যা প্রতিষ্ঠানটির উদ্দীষ্ট লক্ষ্য ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে উদ্বেগজনক বিচুতির প্রমাণ বহন করে ।
স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা চর্চার অনুকূলে কর্মরত সাংবাদিকদের অব্যাহত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পিআইবি উচ্চতর অ্যাকাডেমিক অধ্যয়ন, গবেষণা ও প্রকাশনার এক দূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যায় এবং বিগত বিএনপি সরকারের আমলে ড. রেজওয়ান সিদ্দিকীর কার্যকালে এটি এক নতুন গতিমাত্রা পায়। কিন্তু ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তীকালে এসে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। পিআইবি কর্মকর্তা কর্মচারীদের একটি বিশেষ অংশ একটি রাজনৈতিক দলের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে ফ্যাসিবাদী স্টাইলে অফিসে ও অফিসের বাইরে দাপট দেখাতে শুরু করে। ধাপে ধাপে হামলা-মামলা ও নানা হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটিয়ে একসমযয় এই প্রতিষ্ঠানের সুযোগ্য-কর্মকর্তাদের নানাভাবে ঝেটিয়ে বিদায় করার নোংরামি খেলায় মেতে ওঠে। মিথ্যা মামলা, গুমের হুমকী বিদেশের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ সুযোগ-সুবিধা কেড়ে নেওয়া,প্রশিক্ষকভিন্ন বিভাগের পরিচালকদের মেলাফাইডিং কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরিয়ে দিয়ে প্রশাসনের অযোগ্য-অদক্ষ লোকদের ডেপুটেশনে এনে পেশাদারী সংস্কৃতিকে দিনে দিনে বিপর্যস্ত করে তোলা হয়। দীর্ঘদীনের যোগ্য ও পেশাদারী কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বঞ্চিত করে, অযোগ্যদের পদায়ন এবং কোনোপ্রকার নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং মব-সংস্কৃতির মাধ্যমে অদক্ষ, অযোগ্য এবং বিতর্কিত লোকজনকে দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি একসময়ে তার স্বকীয় মর্যাদাকে ভুনুন্ঠিত করে।
আর এই পালে হাওয়া লেগেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বিতর্কিত দুই উপদেষ্টার বিশেষ খাতিরের লোক বলে খ্যাত বর্তমান মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফকে কেন্দ্র করে যার সাংবাদিকতায় কোনো অ্যকাডেমিক ডিগ্রিও নেই। অথচ তিনি প্রতিষ্ঠানের মাস্টার্স ও পোস্ট-গ্রাজুয়েট ডিগ্রি প্রদানে প্রিন্সিপাল হিসেবে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। সম্পাদকীয় ডেস্কের বাইরে মাঠ পর্যায়েও তাঁর প্রত্যক্ষ সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাও নেই। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর দুর্নীতির তথ্য পরযালোচনায় এরফ ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে গত ১৮ মাস দায়িত্ব পালনকালে তিনি পিআইবিকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করেছেন। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি দৈনিকে তাঁর অনিয়ম, দুর্নীতি এবং স্বেচ্ছাচারিতার ওপর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
দেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিমণ্ডলে পিআইবির অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফকে অবিলম্বে অপসারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কেননা, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ–এর বিরুদ্ধে নিয়োগ–বাণিজ্য, ভুয়া বিল–ভাউচার এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা ও জবাবদিহিতা নির্ধারণ করা অবশ্যই সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার দায়িত্ব। তবে অভিযোগগুলোর প্রকৃতি এবং পরিমাণ এমন যে তা প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই পেশাদারি সাংবাদিকমহল থেকে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বচ্ছ নিয়োগপদ্ধতি অনুসরণ না করে বিধিবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন পদে প্রায় ৩৯ জনকে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগটি সত্য হলে তা শুধু প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; বরং একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানে ন্যায্যতা ও পেশাদারিত্বের মৌলিক নীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।মসংগতকারণে এসব ঘটনা ও অভিযোগের সুষ্ট তদন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে, যা তাঁকে বর্তমান ডিজি পদে আসীন রেখে করা সম্ভব ও সমীচিন নয়।
প্রশিক্ষণ কর্মসূচির নামে এনজিও কর্মসূচি আদলে সাম্প্রতিককালে যেসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে তা সাংবাদিকদের জাতীয় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা, জবাবদিহিতা ও ভাবমূর্তির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বিভিন্ন কোর্সে অংশগ্রহণকারী তালিকা, কার্যক্রমের প্রামাণ্য ছবি বা প্রতিবেদন নিয়ে অসঙ্গতির আরও কিছু গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দেশে-বিদেশে অবস্থানরত কোনো কোনো রিসোর্সপার্সন বা আলোচকের নামে সম্মানী দেখানো হলেও তাঁরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না—এমন অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে।
এই অভিযোগগুলো যাচাই করতে গেলে ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। প্রথমত, উল্লিখি কর্মশালাগুলো সত্যিই অনুষ্ঠিত হয়েছিল কি না— অংশগ্রহণকারীদের তালিকা ও স্বাক্ষরগুলো কি যাচাইযোগ্য কি না, প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেসব কর্মসূচির কোনো তথ্য রয়েছে কি না? ফ্যাক্ট-চেক করে যদি সত্যিই দুর্নীতি সংঘটিত হওয়ার প্রমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওযা যায়, তবে একটি গণতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামোয় এমন পরিস্থিতিতে একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ হলো স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত। আর নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায় বিচারের স্বার্থেই অনিতিবিলম্বে পিআইবি ডিজির পদ থেকে অভিযুক্ত ডিজি ফারুক ওয়াসিফ-এর নিজেরই সরে দাড়ানোে উচিৎ ।
এখানে মূল প্রশ্নটি শুধু ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; বরং প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ঘিরে। যে প্রতিষ্ঠান সাংবাদিকদের পেশাগত নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির শিক্ষা দেয়, সেই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কার্যক্রম যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে তা পুরো গণমাধ্যম ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা তৈরি করতে পারে। সাংবাদিকতা মূলত বিশ্বাসের পেশা—এখানে বিশ্বাসযোগ্যতা হারালে পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন।
পিআইবির প্রতিষ্ঠাকালীন দর্শন ছিল সাংবাদিক মানবসম্পদ উন্নয়নে একে একটি জাতীয় গণমাধ্যম উন্নয়ন কেন্দ্র বা ‘ থিংক-ট্যাংক’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, গণমাধ্যম নীতি নির্ধারণ বা ‘মিডিয়া-সুশাসনের’ আলোচনায় প্রতিষ্ঠানটির গত দুই দশকের ভূমিকা নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ । বর্তমান পঞ্চম শিল্প-বিপ্লবের যুগে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জসমূহ—যেমন ডিজিটাল মাধ্যম পরিচালনায় নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব, ভুয়া কিংবা প্রাপাগাণ্ডামূলক তথ্যযুদ্ধ মোকাবিলা করার ক্ষেত্রেও পিআইবির সময়োপযোগী সক্ষমতা ও কার্যকর ভূমিকা পালন খুবই জরুরি। কিন্তু পিআইবিকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কগুলো প্রতিষ্ঠানটির ঘোষিত লক্ষ্য ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটি অস্বস্তিকর ব্যবধানকে সামনে এনে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।
দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন করা এখন সময়ের জরুরি দাবি। কারণ একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হলে তার প্রভাব শুধু একটি দপ্তরে সীমিত থাকে না; তা পুরো গণমাধ্যম জগতের ওপরই বর্তায়। আর যে প্রতিষ্ঠান জাতির বিবেক গঠনে ভূমিকা রাখার কথা—তার প্রতি আস্থা টিকিয়ে রাখাই শেষ পর্যন্ত আশু করণীয় ।
* ড. মো. অলিউর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম যোগাযোগ বিভাগ, গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। ইমেইল: draliurQgmail.com