মধ্যপ্রাচ্যের দরজা বন্ধ থাকায় জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বিকল্প উৎস খুঁজছে বাংলাদেশ। এতদিন কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও এখন সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভারত, অ্যাঙ্গোলা ও থাইল্যান্ড থেকেও সংগ্রহ করা হচ্ছে তেল-গ্যাস। নতুন করে যোগাযোগ করা হয়েছে ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে। এসব দেশের বন্দর থেকে এরই মধ্যে জ্বালানি তেল ও গ্যাস নিয়ে এসেছে ২১টি জাহাজ। গতকাল বৃহস্পতিবারও ডিজেল ও জেট ফুয়েলবোঝাই একটি জাহাজ নোঙর করেছে চট্টগ্রাম বন্দরে। মালয়েশিয়া থেকে এলপিজিবোঝাই এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে এলএনজি বোঝাই আরও একটি জাহাজ আসবে এই মাসে। বেশি দামে কেনা হলেও এসব দেশ থেকে পণ্য আনতে পাড়ি দিতে হচ্ছে না হরমুজ প্রণালি। তাই বিকল্প এই আট দেশের সঙ্গে যোগাযোগ আরও বাড়ানো হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, রাশিয়া ও ইরাকের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিল বাংলাদেশ। অর্থ ও সময় সাশ্রয় না হওয়াতে সেটি সফল হয়নি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন (বাণিজ্য ও অপারেশন) বলেন, ক্রুড অয়েল আমদানিতে আমরা মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালিতে বাধা পাওয়ায় যুদ্ধ শুরুর পর ক্রুড অয়েলের কোনো জাহাজ দেশে আসেনি। এখন তাই বিকল্প দেশের দ্বারস্থ হয়েছি আমরা। এরই মধ্যে মালয়েশিয়া, ভারত, সিঙ্গাপুরসহ এই অঞ্চলের কয়েকটি দেশ থেকে জ্বালানি তেল ও কনডেনসেট সংগ্রহ করেছি। ঘাটতি কমাতে এই চেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে। তিনি জানান, অপরিশোধিত তেল নিয়ে সমস্যা বেশি হওয়ায় আগামী মাসে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ২৫ সেন্ট বেশি খরচ করে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল বিকল্প পথে আনা হবে।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, চলতি মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পরিশোধিত তেল নিয়ে ১৬টি ও অপরিশোধিত তেল নিয়ে দুটি জাহাজ ছেড়ে আসার কথা ছিল। এখন পর্যন্ত আটটি জাহাজ এসেছে। পথে আছে আরও তিনটি। বাকি জাহাজগুলো কোনটি কখন আসবে, তা অনিশ্চিত।
গত ৪ মার্চ সৌদি আরব ও ২০ মার্চ আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি থেকে অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ আসার শিডিউল ছিল। জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি পার হতে পারেনি। এগুলো কবে আসবে তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিকল্প উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, রাশিয়া ও ইরাকের কথা বিবেচনায় আনে বিপিসি। তবে এসব দেশ থেকে তেল আনতে সময় ও খরচ দুটিই উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জাহাজ আসতে যেখানে ১২ থেকে ১৩ দিন সময় লাগে, সেখানে বিকল্প এসব উৎস থেকে আনতে সময় দ্বিগুণেরও বেশি লাগতে পারে। একই সঙ্গে জাহাজ ভাড়া লাগতে পারে তিনগুণ। তাই এই অঞ্চলের দেশের ওপর জোর বেশি দিচ্ছে বাংলাদেশ।
অভিন্ন চিত্র এলএনজিতেও। বাংলাদেশে প্রতিবছর যে এলএনজি আমদানি করা হয় এর ৮০ শতাংশেরই উৎস মধ্যপ্রাচ্য। যুদ্ধ শুরুর পর সেখান থেকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে এলএনজিবোঝাই কোনো জাহাজ দেশে আসেনি। এলএনজি আমদানির স্থানীয় প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান ইউনি গ্লোবাল বিজনেস লিমিটেডের সিনিয়র ডিজিএম মো. নুরুল আলম বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর চলতি মাসে যে চারটি জাহাজ মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলএনজি এনেছে সেগুলো যুদ্ধ শুরুর আগেই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছিল। বিকল্প দেশ থেকে এখন এলএনজি ও এলপিজি সংগ্রহ করা হচ্ছে। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে দুই জাহাজ এলএনজি ও এলপিজি আসবে শিগগির।
চট্টগ্রাম বন্দরের ‘ভেসেল অ্যারাইভাল লগ’ অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৩০টি জাহাজের পণ্য খালাস করেছে তারা। এর মধ্যে এলপিজিবোঝাই ৯টি, এলএনজির ৬টি, গ্যাস অয়েলের ৬টি, এইচএসএফও বোঝাই ৪টি, বেস অয়েলের দুটি, ক্রুড অয়েলের একটি ও এমইজিবোঝাই জাহাজ ছিল দুটি।
এর মধ্যে কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাহাজ ছিল মাত্র ৯টি। এগুলো যুদ্ধ শুরুর আগেই হরমুজ প্রণালি পার হতে পেরেছিল। যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে কোনো জাহাজ আসেনি বাংলাদেশে। এ জন্য বিকল্প উৎস থেকে তেল ও গ্যাস সংগ্রহ করছে বাংলাদেশ। এখন পর্যন্ত দেশে আসা জাহাজগুলোর মধ্যে সিঙ্গাপুরের ছয়টি ও মালয়েশিয়ার জাহাজ ছিল পাঁচটি। অন্যান্য দেশের মধ্যে ভারতের দুটি এবং অস্ট্রেলিয়া, অ্যাঙ্গোলা ও থাইল্যান্ডের জাহাজ আছে একটি করে। সমকাল