গ্রীষ্মের তীব্র গরমে যেন বাজারে নিত্যপণ্যের দামেও আগুন লেগেছে। চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে শুরু করে মাছ-মাংস কোনো কিছুই আর আগের দামে নেই। সব পণ্য বিক্রি হচ্ছে অসহনীয় দামে। কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে গরিবের মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়। কেজিপ্রতি সরু চাল কিনতে ক্রেতার লাগছে ৮৫ টাকা। ৮০ টাকা কেজির নিচে মিলছে না কোনো সবজি। পাশাপাশি মাছ-মাংস কেনাও এক প্রকার বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে সরাসরি রান্নাঘরের চুলায়। সেখানে হাঁড়ি চাপাতেই হিমশিম খাচ্ছে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো। যে টাকায় একসময় সপ্তাহের বাজার হতো, এখন তা দিয়ে দুবেলার খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ডাল-ভাত আর সামান্য সবজি জোগানই এখন অনেকের অধরা স্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
এদিকে এই দামের চাপে শুধু গরিব মানুষ নয়, নীরবে বিপর্যস্ত মধ্যবিত্ত পরিবারও। পছন্দের পণ্য কেনার সাধ আছে, কিন্তু সাধ্যের ভেতর তা আর ধরা দিচ্ছে না। প্রতিদিনের বাজার হিসাব মেলাতে কমাতে হচ্ছে খাবারের তালিকা। বদলাতে হচ্ছে জীবনের ছন্দ। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারের এই অস্থিরতা আর লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চিত ও কষ্টকর বাস্তবতার দিকে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, একশ্রেণির ব্যবসায়ী সারা বছর একই প্রক্রিয়ায় মূল্য কারসাজি করে ক্রেতাকে ঠকাচ্ছে। তবে এর বিপরীতে সরকারের তরফ থেকে কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এছাড়া ভোক্তাকে স্বস্তিতে রাখতে তদারকি সংস্থাগুলোর কোনো গবেষণা নেই। এমনকি নেই কোনো বাজার তদারকির পরিকল্পনা। ফলে বছরের পর বছর বাজারে ভোক্তা নিষ্পেষিত হচ্ছে। সরকারের উচিত হবে বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজর দেওয়া। শুক্রবার খুচরা বাজারের বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন করে দাম না বাড়লেও প্রতিকেজি মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণ জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা, যা সাত দিন আগেও ৫৫ টাকা ছিল। প্রতিকেজি পাইজাম চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৮ টাকা। আর সরু চালের মধ্যে প্রতিকেজি মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৮৫ টাকা।
এদিকে সবজির বাজারে উত্তাপ তো থামছেই না। বেশির ভাগ সবজির দাম ৮০ টাকার ওপরে। খুচরা বাজারে প্রতিকেজি বেগুন মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ১০০-১২০ টাকায়, যা আগে ছিল ৮০ টাকা। প্রতিকেজি পটোল ও ঢ্যাঁড়শ বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকা, বরবটি, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, শিম, শজিনার কেজি ১০০-১২০ টাকা। প্রতিকেজি করলা ১২০-১৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিকেজি কাঁচামরিচ ৮০-১০০ টাকা ও পেঁয়াজ ৩০-৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতিকেজি শসা ৬০-৮০ ও টমেটো ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
একই অবস্থা মাছ-মাংসের বাজারেও। কেজিপ্রতি মুরগির দাম কিছুটা কমলেও এখনো তা বেশি দামেই বিক্রি হচ্ছে। শুক্রবার প্রতিকেজি সোনালি মুরগি বাজারভেদে ৩৮০-৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা এক সপ্তাহ আগে ৪২০ টাকা ছিল। পাশাপাশি প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে ১৮০-১৯০ টাকায়। সঙ্গে ডজনপ্রতি ১০ টাকা বেড়ে ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। আর গরুর মাংস কিনতে কেজিপ্রতি ক্রেতার ৮০০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে। মাছের বাজারেও একই অবস্থা। খুচরা বাজারে প্রতিকেজি রুই মাছ ৩২০ টাকা, তেলাপিয়া ২০০ টাকা, সিলভার কার্প ১৬০ টাকা, কই ১৪০ টাকা ও পাঙাশ মাছ ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সঙ্গে প্রতিকেজি পাবদা বিক্রি হচ্ছে ৩০০-৪১০ টাকায়। পাশাপাশি প্রতিকেজি চাষের চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে ৭৫০-৮০০ টাকা এবং নদীর চিংড়ি ১০০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে মুদি পণ্যের দোকানে প্রতিকেজি সরু মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। মাঝারি দানার প্রতিকেজি মসুর ডাল ১২০ ও মোটা দানার মসুর ডাল ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট দেখা গেছে। যে দোকানে পাওয়া যাচ্ছে লিটারে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে লিটারপ্রতি ২০৫-২১০ টাকা।
রাজধানীর নয়াবাজারের ক্রেতা ভ্যানচালক এনায়াতউল্লাহ বলেন, বাজারে এসেছি আধা ঘণ্টা হয়েছে। কিন্তু কী রেখে কী কিনব বুঝতে পারছি না। যে টাকা আছে তা চাল, ডাল কিনতেই শেষ হয়ে যাবে। পরে টাকা না থাকলে এক পদ সবজিও হয়তো কেনা কঠিন হবে। অনেক পণ্যের দাম শুনেই মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কয়েক মাস ধরেই নিত্যপণ্যের বাজারে লাগাতার দাম বাড়ছে। সব মিলিয়ে চুলায় হাঁড়ি চাপাতেই মানসিক যন্ত্রণায় আছি। আমাদের জন্য কেউ নেই।
মালিবাগ কাঁচাবাজারে নিত্যপণ্য কিনতে আসা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সহিদুল আলম বলেন, মাস শেষে যে বেতন পাই, তা দিয়ে চলতে খুব কষ্ট হয়। বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম অসহনীয়। এতে মানসিক যন্ত্রণায় পড়তে হচ্ছে। পরিবারের মুখে হাসি নেই। পারিবারিক কোনো আয়োজন করতে গেলে একশবার চিন্তা করতে হচ্ছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল বলেন, বাজারে অভিযান থেমে নেই। অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নির্দেশে প্রতিদিন বাজার তদারকি করা হচ্ছে। অসাধু পন্থায় দাম বাড়ালে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে পণ্যের দাম সহনীয় করা হচ্ছে। ভোক্তার স্বার্থে অধিদপ্তরের কার্যক্রম চলমান থাকবে।
(যুগান্তর)