বাংলাদেশ বর্তমানে একটি মারাত্মক ‘নিম্নরাজস্ব সাম্যাবস্থার ফাঁদে’ আটকে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও নীতি বিশেষজ্ঞরা। এই সংকট থেকে উত্তরণে তারা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের আগেই একটি কার্যকর, স্বচ্ছ এবং প্রবৃদ্ধি-সহায়ক রাজস্ব সংস্কারের জোর দাবি জানিয়েছেন।
শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত “রাজস্ব আহরণ: চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ” শীর্ষক এক প্রাক-বাজেট নীতি সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে আয়োজিত এই সংলাপে সরকারের নীতিনির্ধারক, বেসরকারি খাতের নেতৃবৃন্দ, উন্নয়ন অংশীদার, গবেষক এবং নীতি বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। তারা দেশের ধারাবাহিকভাবে নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতের মূল কারণগুলো বিশ্লেষণ করেন এবং রাজস্ব ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির বাস্তবসম্মত পথ চিহ্নিত করেন।
কাঠামোগত সংকট ও হয়রানি দূর করার আহ্বান
সংলাপের শুরুতে আলোচনার বিশ্লেষণাত্মক কাঠামো তুলে ধরেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, যিনি অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এবং মূল উপস্থাপনাটি প্রদান করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে রাজস্ব আহরণে ব্যর্থতার মূল কারণ হলো কাঠামোগত সংকট, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং বিভিন্ন অব্যাহতির কারণে সংকুচিত করের আওতা। এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে অনিয়মতান্ত্রিক চর্চা এবং দুর্বল রাজনৈতিক অঙ্গীকার। কর সংস্কারকে শুধু নীতিমালার নকশার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়নের বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার ওপর জোর দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের জন্য হয়রানি এখন একটি অস্তিত্বগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা দ্রুত মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তার সরকারের প্রতি আমূল কর সংস্কারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ক্রমবর্ধমান সামঞ্জস্য বা জোড়াতালি দিয়ে আর চলবে না, বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক আমূল কর সংস্কার। তিনি উল্লেখ করেন, অতিরিক্ত উচ্চ কর হারের কারণে অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট পদ্ধতি সঠিকভাবে কার্যকর না থাকায় ভ্যাট সংগ্রহ দুর্বলই রয়ে গেছে।
তামাক কর থেকে মিলতে পারে ৮৫ হাজার কোটি টাকা
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কান্ট্রি অফিসের অপারেশনস ম্যানেজার গেইল মার্টিন বলেন, নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতের কারণে সরকার বিপজ্জনক দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে এবং প্রায়ই বাধ্য হয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো অতি জরুরি খাতে ব্যয় কমিয়ে দেয়। তিনি টেকসই রাজস্ব প্রবৃদ্ধির জন্য ভ্যাট অব্যাহতিগুলো স্বচ্ছতার সাথে যৌক্তিক করার পরামর্শ দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক শাফিউন নাহিন শিমুল স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত করারোপণকে উচ্চ সম্ভাবনাময় একটি হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, তামাক ও মদের ওপর পাপ কর (সিন ট্যাক্স) জনস্বাস্থ্য ও রাজস্ব উভয় ক্ষেত্রেই শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। ফিলিপাইনের সফল উদাহরণ টেনে তিনি জানান, সিমুলেশন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে যদি একটি শক্তিশালী তামাক কর সংস্কার করা যায়, তবে সম্ভাব্যভাবে প্রায় ৮৫,০০০ কোটি টাকা রাজস্ব অর্জন করা সম্ভব।
এনবিআরের ডিজিটাইজেশন উদ্যোগ ও বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহমান খান এফসিএমএ বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে জানান, এনবিআর করপ্রক্রিয়া ডিজিটাইজ করা, বিবেচনামূলক ক্ষমতা হ্রাস এবং করদাতাদের আস্থা পুনরুদ্ধারে কাজ করছে। করের আওতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, করদাতাদের ক্ষেত্রে জাল-এর মতো নেতিবাচক ধারণা দেওয়া প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা পরিহার করা দরকার। ইতিমধ্যে বাস্তবায়নাধীন কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, বাজারে আসার আগেই সব তামাকজাত পণ্য উৎপাদন-গণনা যন্ত্রের মাধ্যমে কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনা হবে এবং ভোক্তারা যাতে সহজেই কর পরিশোধের বিষয়টি যাচাই করতে পারেন ও অনিয়ম জানাতে পারেন, সেজন্য কিউআর ও এআর কোড পদ্ধতিও চালু করা হবে।
এনবিআরের অতিরিক্ত কর কমিশনার ড. মো. নুরুল আমিন বলেন, একটি রেফারেন্স-ভিত্তিক ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি করা গেলে মিথ্যা তথ্য প্রদান অনেক কমে যাবে এবং করদাতার ঘোষিত মূল্য বেঞ্চমার্কের নিচে নামলে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে অডিট শুরু করবে।
ব্যবসায়ীদের পক্ষে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মনজুর বলেন, ভালো করদাতাদের কমপ্লায়েন্স সুবিধা দিতে হবে এবং ধারাবাহিক অ-কমপ্লায়েন্সের বিরুদ্ধে অর্থবহ শাস্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে। তিনি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে এনবিআরে বৃহত্তর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দাবি করেন। অন্যদিকে, ব্যাংকার মামুন রশীদ প্রবৃদ্ধি কেন্দ্র ও অর্থনৈতিক করিডোরগুলোকে ভবিষ্যৎ কর পরিকল্পনা কৌশলে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেন।
রাজনৈতিক বৈধতা ও সুশাসনের ওপর তাগিদ
সংলাপের প্রধান অতিথি, অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর তার সমাপনী বক্তব্যে সংস্কার এজেন্ডাকে রাজনৈতিক ও শাসনগত ভিত্তিতে ফিরিয়ে আনার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, প্রতিনিধিত্ব, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক বৈধতা ছাড়া কর সংস্কার সফল হতে পারে না। পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতির কারণে কর ব্যবস্থার সততা নষ্ট হয়েছে উল্লেখ করে আধুনিক কর প্রশাসনের জন্য ডিজিটাইজেশন, ক্যাশলেস লেনদেন এবং ঝুঁকি-ভিত্তিক অডিটকে অপরিহার্য স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে হোসেন জিল্লুর রহমান প্রচলিত তামাকের পাশাপাশি ই-সিগারেট এবং চিনিযুক্ত পানীয়ের ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে নীতিগত মনোযোগ দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মুক্ত আলোচনায় আরও বক্তব্য রাখেন ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান সিমীন রহমান, পিকেএসএফ-এর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার ড. একেএম নুরুজ্জামান, এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আমিন, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক এবং এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক আব্দুল হক। তারা সকলেই একটি প্রবৃদ্ধি-সহায়ক রাজস্ব সংস্কারের জরুরি প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন।