রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ০৬:৪৬ অপরাহ্ন




একীভূত পাঁচ ব্যাংক

পুরোনো মালিকদের ফেরার সুযোগ বন্ধ হতে পারে

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬ ১২:২৮ pm
bank merger ব্যাংক একীভূত একীভূতকরণ
file pic

একীভূত পাঁচ ব্যাংকে পুরোনো মালিকদের ফেরার সুযোগ বন্ধ হতে পারে। ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে যুক্ত ১৮(ক) ধারা বাতিল কিংবা সংশোধনী আসতে পারে। ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পক্ষের সমালোচনা এবং আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ঋণ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে এমন সিদ্ধান্ত আসতে পারে। শিগগিরই এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া হতে পারে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।

জানা গেছে, ব্যাংক রেজল্যুশন আইন কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সে বিষয়ে বিধিমালার একটি খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। সেখানে ১৮(ক) ধারার বিষয়ে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। সরকার এ বিষয়ে কী করবে, তার ইঙ্গিতের অপেক্ষায় এ ধারার খসড়া বিধিমালায় কিছু বলা হয়নি। এরই মধ্যে এই ধারার বাস্তবায়ন জটিলতার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের দিক থেকে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে জানানো হয়েছে।

সরকারকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, একীভূত পাঁচ ব্যাংকে অব্যবহিতপূর্বে যারা মালিকানায় ছিলেন, তাদের জালজালিয়াতি ও নামে-বেনামে বিপুল অঙ্কের ঋণের প্রমাণ মিলেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যের আলোকে অনেক মামলা হয়েছে। সামগ্রিক বাস্তবতায় এই ধারা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। অথচ এ ধারার কারণে সরকার অহেতুক সমালোচনার মধ্যে পড়েছে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক এ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। ফলে দ্রুত এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। সরকার বিষয়টি পর্যালোচনা করবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানিয়েছে।

এর সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেন, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ একীভূত ব্যাংকে পুরোনো মালিকদের ফেরার সুযোগ রেখে আইন প্রণয়ন সরকারের সংস্কারবিরোধী অবস্থান হিসেবে দেখছে। বিভিন্ন পর্যায়ে এ নিয়ে তারা আপত্তি তুলেছে। এমনিতেই আইএমএফের চলমান ৫৫০ কোটি ডলার ঋণ কর্মসূচি নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কোনোভাবে যেন এই ঋণ কর্মসূচি বাতিল না হয়, তারই অংশ হিসেবে সরকার জ্বালানির দর সমন্বয় করেছে। রাজস্ব আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। খেলাপি ঋণ কমানোর পরিকল্পনা তৈরি করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, আইএমএফের চলমান ঋণ কর্মসূচির পাশাপাশি সংস্থাটি থেকে আরও ২০০ কোটি ডলার এবং বিশ্বব্যাংক থেকে ১০০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। নতুন করে এসব ঋণ পাওয়া না গেলেও কোনো কারণে যেন চলমান কর্মসূচি বাতিল না হয়, সেটি সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। কোনো কারণে আইএমএফ কর্মসূচি বাতিল করলে অন্য সংস্থাগুলোর কাছে একটি খারাপ বার্তা যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেশের ঋণমান কমিয়ে দেওয়া হয়। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ বেড়ে যায়। বিদেশি ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট লাইনসহ অনেক ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। যে কারণে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক নাখোশ হয়– এ রকম কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের জন্য কঠিন। আবার বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন এই ধারার পক্ষে নয়। এমনকি বর্তমান সরকারপন্থি ব্যবসায়ীদের নিয়ে গঠিত ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) সম্প্রতি গভর্নরের সঙ্গে দেখা করে এই ধারা নিয়ে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে এসেছেন।

ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করার জন্য গত ১ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আজিম উদ্দিন বিশ্বাসকে আহ্বায়ক করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের মোট ৯৮টি ধারা ছিল। আইনের পরিধি কমানোর জন্য তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ ২৪টি ধারা প্রবিধানে যুক্ত করার সুপারিশ করে ধারার সংখ্যা কমিয়ে ৭৪টিতে নামানো হয়। কমিটির সুপারিশের বাইরে শেষ সময়ে ১৮(ক) ধারা যুক্ত করায় ধারার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৫।

আইন প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা জানান, নতুনভাবে যুক্ত ১৮(ক) ধারাকে এই আইনে সবচেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই ধারার শুরুতে বলা হয়েছে– ‘অন্য কোনো আইন কিংবা এই আইনের অন্যান্য বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন।’ সাধারণভাবে বলা থাকে– অন্য কোনো আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইন প্রাধান্য পাবে। এভাবে যুক্ত ধারার আলোকে একীভূত ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার যে অর্থ দিয়েছে, কেবল তার সাড়ে ৭ শতাংশ জমা দিয়ে আগের মালিকরা নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে অব্যবহিতপূর্বের শেয়ারধারকদের কথা সবার আগে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মানে গত ৫ আগস্টের পর ঋণ জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অনিয়মের কারণে যাদের মালিকানা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, তাদের অগ্রাধিকারের কথা বলা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, আইন হওয়ার আগে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ অনুযায়ী একীভূত ব্যাংকের খারাপ অবস্থার জন্য দায়ীদের ফের মালিকানায় ফেরার সুযোগ ছিল না। এরই মধ্যে আগের মালিকদের নামে-বেনামে থাকা সব শেয়ার বাজেয়াপ্ত করার জন্য জব্দ করে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আবার সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের সব শেয়ার শূন্য করে প্রজ্ঞাপন করা হয়েছে।

ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫-এর আলোকে গত বছর শরিয়াহভিত্তিক পরিচালিত এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার দেওয়া হবে। এর বাইরে আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ধার হিসেবে দিয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক ফার্ম দিয়ে অডিটসহ বিভিন্ন ধাপ শেষে এই সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঋণ রয়েছে এক লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে এক লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা, যা ৮৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। পুরো ব্যাংক খাতে যেখানে খেলাপি ঋণের হার ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। আর ব্যাংকগুলোর মোট মূলধন ঘাটতির অর্ধেকের বেশি এই পাঁচ ব্যাংকে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল দুই লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে পাঁচ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। সমকাল




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD