মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা ১২ লাখ রোহিঙ্গার তথ্য ও ডেটাবেজ বাংলাদেশ সরকারের একটি সার্ভারে যাচ্ছে। এই সার্ভার তৈরির কাজ শেষ করেছে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ শেষে শিগগিরই এটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এরপর জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) রোহিঙ্গাদের ডেটা বাংলাদেশি সার্ভারে পাঠানো শুরু করবে।
তবে এতদিন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন (আরআরআরসি) রোহিঙ্গাদের ডেটা শুধু ‘রিড অনলি অ্যাকসেস’ (দেখতে পারা) ছিল। গতকাল সোমবার সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
দীর্ঘদিন বাংলাদেশ দাবি জানিয়ে আসছে, রোহিঙ্গাদের তথ্যভান্ডার সরকারের কাছে থাকাও জরুরি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ-সংক্রান্ত একটি বৈঠক হয়েছে। কীভাবে দ্রুত রোহিঙ্গাদের ডেটাবেজ সরকার সংরক্ষণ করতে পারে, তা ওই বৈঠকে আলোচনা হয়। এর আগের দুটি সরকারের সময় বিষয়টি নিয়ে একাধিক ফোরামে আলোচনা হয়। সর্বশেষ কয়েকটি বৈঠকে রোহিঙ্গাদের তথ্যভান্ডার হস্তান্তরের বিষয়টির গতি আসে। এর আগে তাদের যুক্তি ছিল– রোহিঙ্গাদের তথ্য বেহাত হতে পারে। এটি ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার পরিপন্থি। তবে বাংলাদেশ যুক্তি দিয়ে আসছে, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অবস্থান করায় রোহিঙ্গাদের তথ্যভান্ডার পাওয়ার ন্যায্যতা তাদের রয়েছে। এ ছাড়া এই তথ্য বেহাত হবে না।
যেসব রোহিঙ্গার ডেটাবেজ বাংলাদেশ পেতে যাচ্ছে, বর্তমানে তারা কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান করছে। তাদের সবাই নিবন্ধিত রোহিঙ্গা। বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ ও চোখের স্ক্যান) নিবন্ধনের মাধ্যমে তাদের তথ্যভান্ডার তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনএইচসিআর এটি তৈরি করেছে। তবে এতকাল ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করা এসব রোহিঙ্গার ডেটাবেজের তথ্য সরকারের কাছে ছিল না।
গতকাল এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার কথা বলে অনেক বছর ধরে ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গা নাগরিকদের ডেটাবেজ আমাদের হস্তান্তর করেনি ইউএনএইচসিআর। এখন তারা তথ্য দিতে রাজি হয়েছে। তথ্যগুলো কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, তার জন্য একটি কমিটি করা হয়। মূলত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটির দেখভাল করবে। রোহিঙ্গাদের তথ্য আমরা পেলে তাদের বৈধ মোবাইল সিমকার্ড দেওয়া শুরু করবে বাংলাদেশ। পাইলট প্রকল্প হিসেবে কয়েক হাজার সিমকার্ড তাদের দেওয়া হয়েছে। যদিও অনেক দিন ধরে তারা অবৈধভাবে সিম ব্যবহার করে থাকে।
ফিঙ্গার প্রিন্টে শনাক্ত হবে কারসাজি
পরিচয় গোপন করে প্রায়ই রোহিঙ্গারা পাচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)। এর সঙ্গে জড়িত সরকারি-বেসরকারি অসাধু চক্র। অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট তৈরি করে দেশের বাইরে পাড়ি জমাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে কেউ মাঝেমধ্যে ধরা পড়ছে। সম্প্রতি পুলিশের একটি সংস্থার কাছে ১৭১ রোহিঙ্গার তথ্য আসে, যারা মিথ্যা নাম-পরিচয় ব্যবহার করে পাসপোর্ট নিয়েছে। এটি জানার পর তাদের পাসপোর্ট বাতিল করার কাজ শুরু হয়। যাতে জালিয়াতির মাধ্যমে রোহিঙ্গারা এনআইডি ও পাসপোর্ট তৈরি করতে না পারে, সে লক্ষ্যে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফিঙ্গার প্রিন্টের মাধ্যমে যাতে রোহিঙ্গাদের পরিচয় শনাক্ত করে কারসাজি প্রতিরোধ করা যায়, তা নিশ্চিত করতে এনআইডি কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি আরআরআরসির মহাপরিচালককে চিঠি দিয়েছে। অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে দুটি ভিন্ন সফটওয়্যার বা অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চায় তারা। যাতে ডেটা আদান-প্রদান করতে পারে। নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের তথ্যভান্ডার জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডারের মূল সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত জালিয়াতি ঠেকাতে চায় বাংলাদেশ। যাতে ফিঙ্গার প্রিন্ট দিয়ে কোনো রোহিঙ্গা বাংলাদেশের এনআইডি তৈরি করতে গেলে সার্ভার স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা চিহ্নিত করবে।
যেভাবে সব রোহিঙ্গা পাবে সিমকার্ড
বর্তমানে কক্সবাজারের বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। ১৮ বছরের নিচে রোহিঙ্গার সংখ্যা ৫২ শতাংশ। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট-পরবর্তী কয়েক মাসে এসেছে অন্তত আট লাখ রোহিঙ্গা। এতদিন রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি মোবাইল কোম্পানির সিম ব্যবহারের অনুমতি ছিল না। ২০২৩ সালের পর নতুনভাবে রোহিঙ্গা এসেছে দেড় লাখ। নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের ফিঙ্গার প্রিন্ট নেওয়া হচ্ছে। কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গা এখনও নিবন্ধনের বাইরে। পাইলট প্রকল্পের আওতায় ২০২৫ সালে ১০ হাজারের মতো রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি সিমকার্ড দেওয়া শুরু হয়। তবে বর্তমানে অন্তত পাঁচ লাখের রোহিঙ্গার হাতে অবৈধ বাংলাদেশি সিমকার্ড রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের তথ্যভান্ডার বাংলাদেশি সার্ভারে যাওয়ার পরপরই অবৈধভাবে রোহিঙ্গাদের হাতে থাকা বিপুলসংখ্যক সিমকার্ড জব্দ করার কাজ শুরু হবে। এরপর ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে থাকা রোহিঙ্গাদের সবাইকে বাংলাদেশি বৈধ সিম দেওয়া শুরু হবে।
আরআরআরসির কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গাদের ব্যবহৃত সব অবৈধ সিম ব্লক করা হবে। এতে অপরাধমূলক কার্যকলাপ প্রতিরোধ ও অপকর্মে জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে। প্রযুক্তিগত নজরদারি বাড়বে। আশ্রয়শিবিরে মাদক চোরাচালান ও সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধ হবে।
সংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা বলেন, বছর ছয়েক আগে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যারা অবৈধ সিমকার্ড ব্যবহার করত সেগুলো জব্দ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে সেটাতে কার্যকর ফল আসেনি। উল্টো রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে মিয়ানমারের সিমকার্ড ব্যবহার বাড়তে শুরু করে। এতে চোরাচালান ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যেম অর্থ পাচারের প্রবাহ বাড়ে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) আওতাধীন দেশের মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠান রোহিঙ্গাদের সিম দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করবে। জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের কাছে রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন নম্বর আছে। এটিকে ‘প্রগ্রেস আইডি’ বলা হয়। কেউ কেউ ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এনআইডি’ বলে থাকে। সেই আইডির বিপরীতে ১৮ বছরের বেশি বয়সী রোহিঙ্গাদের সিম দেওয়া হবে। এ ছাড়া নতুনভাবে যেসব রোহিঙ্গা ঢুকছে তাদের দেওয়া হচ্ছে ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট কার্ড’।
মিথ্যা তথ্যে বাংলাদেশি পাসপোর্ট
পুলিশের একটি সংস্থার কাছে ১৭১ রোহিঙ্গার তালিকা আছে। তারা মিথ্যা তথ্য দিয়ে বাংলাদেশি পাসপোর্ট করেছেন। তাদের পাসপোর্ট বাতিলের জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় আছেন রোহিঙ্গা নাগরিক আবদুর রহমান। তিনি নিজেকে বাংলাদেশি সালমান আহমেদ পরিচয় দিয়ে পাসপোর্ট করেন। সেখানে পিতা সাব্বির আহমেদ ও মাতা ফাহিমা খাতুন বলে উল্লেখ করেন। ঠিকানা হিসেবে লেখা চট্টগ্রামের পটিয়ার চক্রশালা। ওই তালিকায় আছেন আহমদ উল্লাহ নামে আরেকজন। তিনি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের চিওড়া এলাকার ঠিকানায় পাসপোর্ট করেন।
তালিকায় আছেন রোকেয়া বেগম। তিনি ফেনীর দাগনভূঞার রাজাপুরের ঠিকানায় পাসপোর্ট করেছেন। সেখানে তিনি বাবা আবুল বশর ও মায়ের নাম আয়েশা বেগম বলে উল্লেখ করেন।
নোয়াখালী থেকে পাসপোর্ট করেছেন মরজান নামে এক রোহিঙ্গা নারী। তাঁর স্বামী রহিম উল্লাহ ও বাবা আবু বকর সিদ্দিক বলে উল্লেখ করেন। জালিয়াতি করে শামসুল আলম, ইকবাল চৌধুরী, সরওয়ার আলম, আবদুল্লাহ ও জমিলা পাসপোর্ট করেছেন। জমিলা তাঁর ঠিকানা লিখেছেন চট্টগ্রামের চার নম্বর ওয়ার্ডের চৌধুরীপাড়া। পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন না থাকায় রোহিঙ্গারা জালিয়াতির এই সুযোগ নিচ্ছেন কিনা এমন প্রশ্ন অনেকের।
পেছনে বড় চক্র
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট করিয়ে দিতে একটি চক্র গড়ে উঠেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পাসপোর্ট অফিসের কর্মচারী, পুলিশের কিছু কর্মকর্তা এবং দালালদের নিয়ে চক্রটি গড়ে উঠেছে। অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে চলে গেছে। বিদেশে গিয়ে তাদের অনেকে নানা অপরাধে জড়াচ্ছে। এর যার দায় পড়ছে বাংলাদেশের ওপর।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের জন্য যেসব শরণার্থী শিবির করা হয়েছে, সেখানেই তাদের চলাচল সীমিত রাখতে হবে। যাতে তারা কোনোভাবেই বাইরে এসে নিজেদের বাংলাদেশি নাগরিক দাবি করতে না পারে। যেসব স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পাসপোর্ট অফিস ও পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তা রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত, তাদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বায়োমেট্রিক বা হাতের ছাপসহ পরিচয়পত্র দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক এ টি এম জিয়াউল ইসলাম বলেন, যে সার্ভারে রোহিঙ্গাদের তথ্য সংরক্ষণ করা হবে, সেটি আমরা তৈরি করে দিয়েছি। এটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার অপেক্ষায় আছে। রোহিঙ্গাদের ডেটা সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আমরা সার্ভার তৈরি করেছি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে সার্ভার হস্তান্তরের পরই ইউএনএইচসিআর ডেটা সেখানে পাঠানো শুরু করবে। এতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র নিচ্ছে, তা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। সমকাল