সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ০১:২৮ অপরাহ্ন




লোডশেডিংয়ে জনদুর্ভোগ, ৭ জেলায় বিক্ষোভ

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬ ১০:১৫ am
বিদ্যুৎ loadshedding energy crisis electricity power grid বিদ্যুত বিভ্রাট লোডশেডিং মেগাওয়াট বিদ্যুত power power
file pic

বিদ্যুৎ পরিস্থিতি

তাপপ্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশজুড়ে বাড়ছে লোডশেডিং। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি বেশি খারাপ। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে দেশের অন্তত সাত জেলায় গ্রাহকরা বিক্ষোভ করেছেন। কোথাও বিদ্যুৎ অফিসে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচ চলাকালে লোডশেডিংয়ে ক্ষোভ আরও বাড়ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিভিন্ন জেলায় বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশকে চিঠি দিয়েছে।

বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটি, বৈরী আবহাওয়া, রাতে ব্যাটারিচালিত রিকশার চার্জ এবং ফুটবল বিশ্বকাপের কারণে লোডশেডিং বেড়েছে।

বেড়েছে লোডশেডিং

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশে লোডশেডিং বাড়ছে। ছুটির দিনেও লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। তিন সপ্তাহ ধরে গড়ে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়েছে। দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছে বিতরণ সংস্থাগুলো।

পিজিসিবির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সাধারণত মধ্যরাতের পর বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকে। কিন্তু এখন চিত্র ভিন্ন দেখা যাচ্ছে। রাত ১০টার পর থেকে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বাড়ে এবং মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন বলছেন, আসল বৈষম্যের শিকার হচ্ছে গ্রাম। তবে এতদিন রাজধানীসহ বড় শহরগুলো তুলনামূলক লোডশেডিংমুক্ত রাখা গেলেও কয়েক দিন ধরে তা সম্ভব হচ্ছে না। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দুই থেকে তিনবারে এক থেকে দেড় ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতাধীন এলাকায় দৈনিক পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না বলে জানিয়েছেন গ্রাহক। গেল দুই সপ্তাহের মধ্যে গত শনিবার রাত ২টায় সবচেয়ে বেশি– তিন হাজার ৪৩১ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। এ সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল কমবেশি ১৭ হাজার মেগাওয়াট। গতকাল রোববার রাত ৮টায় ১৭ হাজার ১৪৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে এক হাজার ৯৮৩ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি দেখিয়েছে পিজিসিবি।

বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ-ভাঙচুর

লোডশেডিংয়ের কারণে গতকাল টাঙ্গাইল, ঝালকাঠি, নেত্রকোনা, রাজশাহী, শেরপুর, সিলেট ও ঢাকা জেলার দোহারে গ্রাহকরা বিক্ষোভ করেছেন।

আর্জেন্টিনা-জর্ডান ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচ চলাকালে বিদ্যুৎ না থাকায় নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয়ে হামলা করা হয়। কেন্দুয়া জোনাল অফিসের ডিজিএম প্রকৌশলী ওমর ফারুক বলেন, তাদের চাহিদা ২৭ মেগাওয়াট, কিন্তু আসে মাত্র ৯ মেগাওয়াট। অফিসে হামলার ঘটনায় তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে টাঙ্গাইলের জামুর্কীতে পল্লী বিদ্যুতের সাবস্টেশনের সামনে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন দেলদুয়ার ও মির্জাপুর উপজেলার বাসিন্দারা। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এ সময় ক্ষুব্ধ জনতা সাবস্টেশন ভাঙচুরের চেষ্টা করে।

ঢাকার দোহারের নুরপুর এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয় ঘেরাও এবং ঢাকা-দোহার সড়ক অবরোধ করে মানববন্ধন করেন গ্রাহকরা।

ঝালকাঠি প্রেস ক্লাবের সামনে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন করেছে একটি সংগঠন।

বিদ্যুতের দাবিতে সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করেন ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। গতকাল রাত ১০টার দিকে হাইটেক পার্কের বর্ণী এলাকায় বিভিন্ন গ্রামের গ্রাহকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। শনিবার দিবাগত রাতে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের বাইরে থাকা ৩৩ কেভি অটোমেটিক সার্কিট রিক্লোজার বন্ধ করে দেয় ক্ষুব্ধ জনতা। এ বিষয়ে পল্লী বিদ্যুতের পক্ষ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।

রাজশাহীর বাগমারার মচমৈল বাজারে এলাকায় লোডশেডিংয়ের কারণ ব্যাখ্যাসহ সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বের হওয়া পল্লী বিদ্যুতের একটি প্রচার গাড়ি আটকে বিক্ষোভ করেন স্থানীয় জনতা।

গতকাল বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখতে না পেরে শেরপুরের নকলা ও ঝিনাইগাতী উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে এসে বিক্ষুব্ধ লোকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি দেন। শেরপুর পল্লী বিদ্যুতের জিএম (ভারপ্রাপ্ত) আখতারুজ্জামান বলেন, ‘প্রয়োজন ৭০ মেগাওয়াট। পাচ্ছি ৩৫ মেগাওয়াট। তাই বিশ্বকাপ ফুটবলের পুরো খেলার সময় বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হয়নি।’

সংসদে বিদ্যুৎমন্ত্রীর ব্যাখ্যা

দেশজুড়ে চলমান লোডশেডিং ও গ্রাহক অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল জাতীয় সংসদে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। জাতীয় সংসদে বিধি ৩০০-এর আওতায় দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি চলমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ তুলে ধরেন। মন্ত্রী জানান, হঠাৎ করেই দেশের একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লারের টিউবে লিকেজ ধরা পড়ায় কেন্দ্রটি জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করতে হয়েছে। একই সময়ে বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে একটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। ওই কেন্দ্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট উৎপাদনের বাইরে রয়েছে।

এ দুটি আকস্মিক ও কারিগরি কারণে জাতীয় সঞ্চালন ব্যবস্থায় মুহূর্তের মধ্যে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে বলে উল্লেখ করেন বিদ্যুৎমন্ত্রী। এর সরাসরি প্রভাব হিসেবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাতেও বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বিষয়টিকে একটি জাতীয় সংকট হিসেবে উল্লেখ করে তিনি দল-মত নির্বিশেষে সংসদের সব সদস্য এবং দেশের জনগণকে ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানান।

কেন বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা

চলতি মাসে দেশজুড়ে তাপপ্রবাহের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের বড় একটি অঞ্চলের ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে টাঙ্গাইল, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু তাপপ্রবাহে জনজীবন ওষ্ঠাগত হয়ে পড়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে, এ পরিস্থিতি আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে। প্রচণ্ড এই গরমের কারণে বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে শিল্পকারখানায় এসি ও ফ্যানের ব্যবহার অনেক বেড়ে গেছে।

এর বাইরে মধ্যরাতে চাহিদা বাড়ার পেছনে দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টর। প্রথমত, সারাদেশে লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশার চার্জিং রাত ১০টার পর শুরু হয়। আগে মধ্যরাতের পর বিদ্যুতের চাহিদা যেখানে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট কমে যেত, এখন রিকশা চার্জিংয়ের কারণে কমছে মাত্র এক হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি।

দ্বিতীয়ত, চলমান ফুটবল বিশ্বকাপের অধিকাংশ ম্যাচই রাত ১১টা থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সাধারণত মধ্যরাতের পর বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে আনার যে ব্যবস্থাপনা রয়েছে, খেলা দেখার কারণে তা ভেঙে পড়েছে।

এ ছাড়া গ্যাস কম পাওয়া এবং দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়ায় সংকট তীব্র হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিপুল বকেয়া বিল। বকেয়া ৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা পাওনা আটকে থাকায় চট্টগ্রামের বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা সংগ্রহে জটিলতা দেখা দিয়েছে।

অন্য কয়েকটি কেন্দ্রেও একই ধরনের চাপ রয়েছে। কয়েক বছর ধরে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিল নিয়মিত পরিশোধ করতে না পারায় বর্তমানে পিডিবির মোট বকেয়া প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক দিন থেকে গ্যাস কম পাওয়ার কারণে ৫০০-৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম আসছে। গত দিনগুলোতে ৮০-৮৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল। তবে গতকাল মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সরবরাহ ৯৫ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এতে গ্যাসে সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটির কারণে একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে।

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

লোডশেডিংয়ের কারণে মাঠপর্যায়ের বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তা-কমচারীরা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন। শেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি অফিস ও সাবস্টেশনসহ ১১ স্থাপনায় নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ সুপারের কাছে চিঠি দিয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের সূত্রগুলো জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নিরাপত্তা চেয়ে আরও বিতরণ কোম্পানি চিঠি দিয়েছে। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই মুহূর্তে সংকট থেকে তাৎক্ষণিক মুক্তির একমাত্র উপায় হচ্ছে বৃষ্টি। কারণ বৃষ্টি হলে গরম কমবে এবং একই সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও কমে আসবে। সমকাল

(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD