মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১০:২৩ পূর্বাহ্ন




দুদকের নেতৃত্ব নির্দিষ্ট শ্রেণির কাছে কুক্ষিগত

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬ ১০:০১ am
Anti Corruption Commission acc দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক Dudok
file pic

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নেতৃত্ব দুই দশক ধরে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির কাছে কুক্ষিগত। দুদক আইনে পাঁচটি পেশাগত শ্রেণির ব্যক্তিদের যোগ্য হিসাবে স্বীকৃতি দিলেও বাস্তবে নিয়োগ সীমাবদ্ধ থাকছে হাতে গোনা কয়েকটি গোষ্ঠীর মধ্যেই। চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও শৃঙ্খলা বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিরাই প্রায় একচেটিয়াভাবে দুদকের নেতৃত্বে এসেছেন। অথচ আইনে যোগ্য হিসেবে উল্লেখ থাকা আইন পেশা ও শিক্ষা খাত থেকে আজ পর্যন্ত একজনও চেয়ারম্যান বা কমিশনার নিয়োগ পাননি। আবার দুর্নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিন কাজ করা ব্যক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, প্রকৌশলী, চিকিৎসক কিংবা অন্য কোনো পেশার ব্যক্তি যতই যোগ্য হোন না কেন, বর্তমান আইনে তাদের দুদকের নেতৃত্বে আসার সুযোগ নেই।

বর্তমান দুদক আইন অনুযায়ী, আইন, শিক্ষা, প্রশাসন, বিচার বা শৃঙ্খলা বাহিনীতে কমপক্ষে ২০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন যে কেউ কমিশনার হওয়ার যোগ্য। কিন্তু ২০০৪ সালে দুদক প্রতিষ্ঠার পর থেকে গঠিত সব কমিশনের তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিয়োগের কেন্দ্রবিন্দু ঘুরেফিরে একই পেশাগত বলয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, আইনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিয়োগের ক্ষেত্র বাস্তবে কেন এত সংকুচিত।

এবারও সেই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। গত ৩ মার্চ থেকে নেতৃত্বশূন্য থাকা দুদকের নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে গঠিত সার্চ কমিটি জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করেছে। আলোচনায় থাকা নামগুলোর বেশির ভাগই আবার সেই বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডার, কিংবা পদস্থ সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফলে দুদকের নেতৃত্বে এর বাইরে অন্য কোনো পেশার দক্ষ কারো আসার সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুদক সূত্র বলছে, নিয়োগের ক্ষেত্র সীমিত করে দেওয়ায় অনেক অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তি শুরুতেই প্রতিযোগিতার বাইরে চলে যান। অন্যদিকে সার্চ কমিটি গঠনেও বিচার বিভাগ ও প্রশাসনিক প্রতিনিধিদের প্রাধান্য থাকায় সুপারিশের তালিকাতেও একই ধরনের পেশাগত ব্যক্তিরাই বারবার উঠে আসেন। ফলে আইনে যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, বাস্তবে তা আরও সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে।

আইনে যা আছে : দুদক আইন, ২০০৪-এর ৮(১) ধারায় বলা হয়েছে, আইন, শিক্ষা, প্রশাসন, বিচার অথবা শৃঙ্খলা বাহিনীতে কমপক্ষে ২০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি কমিশনার হওয়ার যোগ্য। অর্থাৎ আইন শুধু বিচারক বা আমলাদের জন্য নয়; শিক্ষা খাতের ব্যক্তিদের জন্যও সমান সুযোগ রেখেছে। কিন্তু গত দুই দশকের নিয়োগের ইতিহাসে সেই সুযোগের প্রতিফলন দেখা যায়নি।

বাস্তবে যা হয়েছে : দুদকের প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন বিচারপতি সুলতান হোসেন খান। এরপর চেয়ারম্যান হয়েছেন গোলাম রহমান, মো. বদিউজ্জামান, ইকবাল মাহমুদ, মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ এবং সর্বশেষ ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন। কমিশনারদের তালিকাতেও রয়েছে সাবেক বিচারক, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও শৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক সদস্যদের আধিপত্য। পর্যালোচনায় দেখা যায়, শিক্ষা খাত থেকে একজনও চেয়ারম্যান বা কমিশনার নিয়োগ পাননি। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন, সুশাসন, জবাবদিহি কিংবা স্বচ্ছতা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা কোনো ব্যক্তিও কমিশনের নেতৃত্বে আসেননি।

সার্চ কমিটিও একই বলয়ে : এদিকে নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরুতে রয়েছে একই চিত্র। দুদক আইন অনুযায়ী সার্চ কমিটির সভাপতি হন আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি। সদস্য থাকেন হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি), সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব। অর্থাৎ, সার্চ কমিটিও পুরোপুরি বিচার বিভাগ ও প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতিনিধিদের নিয়েই গঠিত। সেখানে দুর্নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ডে অভিজ্ঞ ব্যক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ বা অন্য কোনো স্বাধীন পেশার প্রতিনিধিত্ব নেই। দুদকের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিয়োগের শুরু থেকে যখন একই ধরনের পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা সিদ্ধান্ত নেন, তখন চূড়ান্ত সুপারিশেও সেই একই বলয়ের ব্যক্তিদের নাম উঠে আসা অস্বাভাবিক নয়।

নতুন নিয়োগেও একই ধারা : বর্তমানে নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। গত ২ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বা কমিশনার নিয়োগের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ পাঠানোর উদ্দেশ্যে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪’ এর ধারা ৭ অনুযায়ী গঠিত বাছাই কমিটি এসব পদে নিয়োগ লাভে আগ্রহী ব্যক্তিদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করছে। এতে আরও বলা হয়, আগ্রহী ব্যক্তিদের দুদক আইনের ধারা ৮ এর উপধারা(১) এর বিধান মোতাবেক প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সার্চ কমিটি ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের শর্টলিস্ট তৈরির কাজ শুরু করেছে। এবারও আলোচনায় থাকা অধিকাংশ নাম সাবেক বিচারক ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের।

সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মঞ্জিল মোর্শেদ বলেন, ‘দুদক কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে একই ধরনের পেশাগত বলয়ের ব্যক্তিদেরই বারবার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর দায় মূলত সার্চ কমিটি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার। আইনে সার্চ কমিটিকে যথেষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হলেও তারা কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, নাকি সরকারের পছন্দ বাস্তবায়ন করে, সেটাই বড় প্রশ্ন।’

তিনি বলেন, ‘শুধু আইন পরিবর্তন করলেই হবে না, নিয়োগ প্রক্রিয়াও স্বাধীন করতে হবে। সার্চ কমিটিতে প্রশাসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কমিয়ে বিচার বিভাগ, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, চিকিৎসক ও দুর্নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ডে অভিজ্ঞ ব্যক্তি এবং অন্যান্য বিশিষ্টজনের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা উচিত। তাহলেই তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের সুপারিশ আসবে।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ’র (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশের সব পেশাতেই যেমন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি আছেন, তেমনি সৎ ও যোগ্য মানুষও আছেন। তাই দুদকের চেয়ারম্যান বা কমিশনার নিয়োগ কোনো নির্দিষ্ট পেশার ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। আইনে যেসব যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে, তার অর্থ এই নয় যে, অন্য পেশার যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া যাবে না। বিষয়টি মূলত সরকারের সদিচ্ছা ও সার্চ কমিটির দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে।’

তিনি বলেন, ‘দুদক সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে আমরা সুপারিশ করেছিলাম, নিয়োগের ক্ষেত্রটি আরও সম্প্রসারণ করে তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন পেশার যোগ্য ব্যক্তিদের সুযোগ দেওয়া হোক। কারণ দুর্নীতির ধরন দিন দিন আরও জটিল ও প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে। কিন্তু সেই প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।’

ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, দুদকের নেতৃত্বে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে, যারা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, সৎ, সাহসী, নির্লোভ, পেশাগতভাবে দক্ষ, সৎ ,অরাজনৈতিক ও জবাবদিহিমূলক। তাদের এমন ট্র্যাক রেকর্ড থাকতে হবে, যাতে প্রমাণিত হয় তারা স্বার্থের দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক প্রভাব ও আমলাতান্ত্রিক চাপের ঊর্ধ্বে থেকে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। কারণ, বর্তমান পরিস্থিতিতে দুদকের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। যদি নতুন কমিশনও রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে কার্যকর ও স্বাধীন দুদক গড়ে তোলা সম্ভব নয়। অতীতেও আমরা দেখেছি, পেশার প্রতিনিধিত্ব থাকলেও অনেক কমিশন কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে।’




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD