বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:২৮ অপরাহ্ন




জুলাইয়ের শক্তিগুলো বিচ্ছিন্ন

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৪৮ am
Mass uprising martyrs injured injure July Martyr July Fighter July Fightersগণঅভ্যুত্থান QUOTA REFORM blockade shabag Shahbagh Shahbag Blockade শাহবাগ অবরোধ প্রতিবন্ধ আটক কারাগার আবরণ পরিবেষ্টন ঘেরাও shahbagh_quota_protest shahbagh quota protest shahbagh_quota_protest shahbagh quota protest2 বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জুলাই গণঅভ্যুত্থান
file pic

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলো গত দুই বছরে অনেকটা বিভক্ত হয়ে পড়েছে। অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরতে না দেওয়ার বিষয়ে একমত থাকলেও সংস্কার ও বয়ানের রাজনীতিতে রয়েছে তাদের অবস্থান ভিন্ন মেরুতে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থানে পরস্পরের অবদানকে পুরোপুরি স্বীকার করছে না। সামাজিক মাধ্যম ও বক্তৃতায় একে অন্যকে হেয় করছে। পক্ষগুলোর মধ্যে সম্প্রতি সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। এতে তারা সফল হতে না পারলেও ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে সূচিত হওয়া অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন ঘটে।

অভ্যুত্থানে ছাত্রনেতৃত্বের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতের সঙ্গে জোট করলেও সংস্কার ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। আবার বিএনপির সঙ্গেও এনসিপির সম্পর্কের অবনতি ঘটছে গত এক বছরে। জুলাই অভ্যুত্থান এবং ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি ও জামায়াত– এ দুই বলয়ে ভাগ হয়ে গেছে মাঠে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলো।
কওমি ঘরানার ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোও জুলাইয়ের পক্ষে ছিল। পরে দলগুলো বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষ নিয়ে ভাগ হয়ে গেছে। এই দলগুলোর ওপর প্রভাব রাখা হেফাজতে ইসলাম অবশ্য বিএনপির পক্ষে। বামপন্থিদের একাংশও শেখ হাসিনার পতন ঘটানো জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে ছিল। জামায়াতবিরোধী অবস্থানের কারণে তারা এখন বিএনপির প্রতি অনেকটা নমনীয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহানের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর যেখানে নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে, সেখানে ঐকমত্য রয়েছে। তিনি সমকালকে বলেন, আওয়ামী লীগকে আর রাজনীতিতে ফিরতে না দেওয়ার বিষয়ে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি; সবাই একমত। কারণ আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন হলে তারা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আবার ভারত প্রশ্নে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হয়, এমন বিভক্তি এখনও দেখা যায়নি। আবার দুটি বলয়ের মধ্যে ‘ওয়েলফেয়ার স্কিম’-এও রাজনৈতিক চিন্তার সাদৃশ্য রয়েছে।
একে অপরের জুলাইয়ের অবদানকে অস্বীকার করা, নিজস্ব রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠায় হেয় করাকে দূষণীয় মনে করেন না আসিফ শাহান। তিনি বলেন, রাজনীতিতে কথার এ লড়াই থাকবেই। একে অপরের অতীত ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা বড় কিছু নয়।

অভ্যুত্থানের পরেই বিভক্তি
জুলাই গণঅভ্যুত্থান হয় বৈষম্য বিলোপের দাবিতে। ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান রোধে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কারের দাবিও ছিল। কিন্তু ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা, শাসনতান্ত্রিক সংস্কার এবং অভ্যুত্থানের ইতিহাস ও কৃতিত্বের দাবিদার হওয়া নিয়ে একসময়ের রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা বিভক্ত হতে শুরু করে প্রথম দিন থেকেই।
শেখ হাসিনার পলায়নের পর ছাত্রনেতৃত্বের দাবি ছিল জাতীয় সরকার গঠন। এতে বিএনপি রাজি হয়নি। জামায়াতের মতো তারাও চেয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন হোক। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকারের ক্রম ছিল বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। এতে সমর্থন করে জামায়াত ও এনসিপি। তবে বিএনপির অগ্রাধিকার ছিল নির্বাচন।

২৩ বছর আনুষ্ঠানিকভাবে এক জোটে থাকলেও চব্বিশের ৫ আগস্টের পর বিএনপি ও জামায়াত পরস্পরকে স্বাধীনতাবিরোধী ও দুর্নীতিবাজ আখ্যা দিতে শুরু করে। কথার এই লড়াই সংস্কার প্রশ্নে অবস্থানগত বিভক্তিতে পৌঁছায়। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে বিভক্তি স্পষ্ট হতে শুরু করে।

এনসিপির দাবি ছিল, নতুন সংবিধান প্রণয়নে আগে গণপরিষদ নির্বাচন হতে হবে। জামায়াতের দাবি ছিল, সংবিধান সংস্কারে নির্বাচনের আগে গণভোট হতে হবে। বিএনপির অবস্থান ছিল, নির্বাচনের দিনে গণভোট হবে এবং পরে সংসদে হবে সংবিধান সংশোধন। সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো যাবে না। এই বিভক্তি নিয়েই নির্বাচনে যায় দলগুলো। নির্বাচনের প্রচারে সংঘর্ষ, প্রাণহানি ঘটেছে।

কৃতিত্বের দাবি থেকে কথার লড়াই
বিএনপি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ১৫ বছর আন্দোলন করে সফল হতে পারেনি বরং নেতাকর্মীরা ধরপাকড়ের ভয়ে দলীয় কর্মসূচিতে আসত না– এ কথা বারবার বলছে এনসিপি। তবে বিএনপি নেতারা বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থান তাদের ১৫ বছরের আন্দোলনের ফসল। অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান। জামায়াত অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব ও কৃতিত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি না করলেও দলটির নেতাকর্মীরা সামাজিক মাধ্যমে তা প্রচার করেন।

৫ আগস্টের পর মূলত এসব বিষয় নিয়েই বিরোধের শুরু। কোন দল আওয়ামী লীগের কতটা ঘনিষ্ঠ ছিল– প্রমাণের চেষ্টা করছে একে অন্যের বিরুদ্ধে। সামাজিক মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিগত জীবনকেও টেনে আনা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অবশ্য গতকালও সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, অনেক কথা হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে, সংগ্রাম কথা হয়েছে, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। এখন সময় হচ্ছে দেশ পুনর্গঠন করার। এখন সময় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। এখন সময় হচ্ছে যারা ষড়যন্ত্র করতে চায় তাদের ব্যাপারে ধৈর্য সহকারে ঠান্ডা মাথায় তাদের ষড়যন্ত্রের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা। তবে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সমকালকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী একদিকে ঐক্যের আহ্বান জানান, অন্যদিকে তাঁর দল হামলা করে। আওয়ামী লীগ আমলে যেভাবে বিএনপি, জামায়াত আক্রান্ত হলেও সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ ক্ষমতাসীনদের মৃদু সমালোচনা করে ‘স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির বিকল্প নেই’ বয়ানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে হামলাকে বৈধতা দিত। এখনও একই ধারা চলছে। ফলে সরকার পার পেয়ে যাচ্ছে। বিরোধী দলকে অদক্ষ, অকার্যকর দেখানোর বয়ান তৈরি করা হচ্ছে। এর ফল দেশের জন্য ভালো হবে না।

ভোটের পর দুই মেরুতে
গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের দিনে অনুষ্ঠিত হয় গণভোটও। এতে অনুমোদিত হয় জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ। এ আদেশ অনুযায়ী, জুলাই সনদে থাকা সংবিধান সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাবের ৩৯টির বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক। আবার কিছু সংস্কার দলগুলো নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) অনুযায়ী করতে পারবে। জামায়াত আদেশ অনুযায়ী সংস্কার চাইছে। আর বিএনপি বলছে, আদেশটিই অবৈধ ছিল।

আদেশে যে ৯ সংস্কারকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, এর মধ্যে ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন ও সংবিধান সংশোধনে অনুমোদন; সাংবিধানিক কমিটির মাধ্যমে সরকারি কর্মকমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, ন্যায়পাল এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে ১৮০ দিনের মধ্যে এগুলো কার্যকর করা বাধ্যতামূলক। জামায়াত জোটের এমপিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপির এমপিরা তা করেননি। ফলে জামায়াত বারবার সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি তুললেও তা আর বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই।

নির্বাচনের ছয় মাস পরও এই বিতর্কে ঘুরপাক খাচ্ছে সংসদীয় রাজনীতি। জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের আগের দিন গতকাল মঙ্গলবার সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটির বৈঠক হয়েছে। বিরোধী দল এ কমিটি বর্জন করেছে।

অন্যদিকে একই দিনে রাজধানীর চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও শিবিরের সংঘর্ষ হয়েছে তুচ্ছ ঘটনা থেকে। গত সপ্তাহে এনসিপি নেতাদের বক্তব্যকে অবমাননাকর আখ্যা দিয়ে হবিগঞ্জ, সিলেট, কুড়িগ্রামে তাদের ওপর হামলা করেছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। হবিগঞ্জে এনসিপির কর্মীর এক চোখ নষ্ট হয়ে গেছে সেই হামলায়।

বিএনপি ক্ষমতায় আসার এক মাসের মধ্যে তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে সংঘর্ষে বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলায় চুয়াডাঙ্গায় ইউনিয়ন জামায়াতের আমির ও তাঁর ভাই নিহত হন বলে অভিযোগ আছে। গত জুনে সংসদ নির্বাচন নিয়ে বচসা ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের জেরে ময়মনসিংহ নগরীতে জামায়াত নেতার ছেলের হামলায় বিএনপির এক সমর্থক নিহত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই মাসে গাইবান্ধায় যুবদল নেতার বিদ্যালয় কমিটি নিয়ে ঝগড়া হয়। পরে হামলায় নিহত হন ইসলামী ছাত্রশিবিরের ইউনিয়ন সভাপতি। সমকাল




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD