বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৩৫ অপরাহ্ন




খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্পে পদে পদে অনিয়ম

পানি নেই প্রত্যাশার অর্ধেকও

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬ ১০:০৩ am
Drink hydrosphere food energy পানি জল বারি সলিল নীর বারিমণ্ডলwater Bottled water drinking packaged plastic glass bottles carbonated carboys coolers মিনারেল পানি ওয়াটার বোতলজাত জল পানির অপর নাম জীবন বোতলজাত পানি পানি
file pic

খুলনা নগরবাসীর দীর্ঘদিনের সুপেয় পানির সংকট নিরসনের লক্ষ্য নিয়ে ২ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প (ফেজ-১)। প্রকল্পটি চালুর পর থেকে বিতর্ক পিছু ছাড়েনি। পরিশোধনের পরও পানিতে লবণ থাকা, শুষ্ক মৌসুমে কম পানি দেওয়া, বছরের বেশির ভাগ সময় পানি দিতে না পারার অভিযোগগুলো পুরোনো। তাছাড়া কয়েক বছর যেতে না যেতেই ধরা পড়েছে বড় কারিগরি ত্রুটি। একাধিক পাম্প মেশিন নষ্ট থাকায় প্রত্যাশার অর্ধেকও পানি মেলে না। জোড়াতালির পাইপলাইন সংকট আরও বাড়াচ্ছে। এই অবস্থায় প্রকল্পটির স্থায়িত্ব ও সুফল পাওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সময়ের ব্যবধানে প্রকল্পটিতে অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্রই সামনে আসছে।

খুলনা ওয়াসা সূত্র জানিয়েছে, খুলনায় ওয়াসা একটি প্রকল্প গ্রহণ করে ২০১১ সালে। প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল মূলত ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানো। বাগেরহাটের মোল্লাহাট এলাকার মধুমতি নদী থেকে পানি এনে তা শোধনের মাধ্যমে নগরবাসীকে সরবরাহ করার কথা।

প্রকল্পের প্রধান কাজগুলো ছিল, মধুমতি নদীর তীরে ইনটেক ফ্যাসিলিটি স্থাপন, পানি শোধনাগার, রূপসার সামন্তসেনায় ১১ কোটি (১১০ এমএলডি) লিটার ধারণক্ষমতার বিশাল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও ইম্পাউন্ডিং জলাধার নির্মাণ, মধুমতি নদী থেকে শোধনাগার পর্যন্ত ৩৪ কিলোমিটারের বেশি কাঁচা পানি সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপন, নগরীতে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য ওভারহেড ট্যাংক বা জলাধার নির্মাণ এবং নতুন পাইপলাইন নেটওয়ার্ক স্থাপন। এই মেগা প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এবং বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্পটি ২০১৯ সালের জুলাই মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। প্রকল্পটি নেওয়ার সময় দাবি করা হয়েছিল, রূপসার সামন্তসেনা পানি শোধনাগার থেকে প্রতিদিন ১১ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের মাধ্যমে নগরবাসীর পানির সংকট অনেকটাই দূর হবে। লক্ষ্য পূরণ তো সম্ভব হয়নি, উলটো বিপুল পরিমাণ পানি অপচয়ের অভিযোগ সামনে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সমিশন পাইপলাইন কাটাখালী খালের অংশে ভেসে উঠেছে। একই সময়ে প্রতিদিন উৎপাদিত পানির প্রায় ২০ শতাংশ বা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ লিটার পানি সিস্টেম লস হিসাবে হারিয়ে যাচ্ছে।

প্রকল্পে শুভঙ্করের ফাঁকি : প্রকল্পসংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, পানি শোধনাগারে পানি পৌঁছানোর জন্য দীর্ঘ ৩৪ কিলোমিটার ট্রান্সমিশন পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়। কিন্তু নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। কাটাখালী খালে মাত্র ২০ ফুট গভীরতায় পাইপ বসানো হয়, ৫০ ফুট গভীরে বসানোর কথা ছিল। কিন্তু কাটাখালী গিয়ে দেখা যায়, চারটি পাম্প মেশিনের একটি প্রকল্প শুরুর পর থেকেই নষ্ট। একটিকে বিশ্রাম দিয়ে পরপর পানি তোলা হয়। ফলে দুটি পাম্প দিয়ে পানি ওঠে, যা স্বাভাবিকের থেকে কম। ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে ছয়টি সাবমার্সিবেল পাম্প রয়েছে, এর তিনটিই নষ্ট। মাত্র তিনটি পাম্প দিয়ে পানি তোলায় ক্যাপাসিটির অর্ধেক পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে।

লবণচরা এলাকার বাসিন্দা মনোর হোসেন বলেন, ‘আমরা ওয়াসার পানি পাই না। গ্রীষ্ম, শীত, বসন্ত কোনোকালেই পানি আসে না। টিউবওয়েলের ওপর ভরসা করতে হয়। ওয়াসার বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী কামাল হোসেন বলেন, দক্ষ জনবল দিয়ে দেখভাল না করলে যন্ত্রপাতি তো নষ্ট হবেই।

পানির ঘাটতি ও সিস্টেম লসের চক্র : প্রকল্পের আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে সিস্টেম লস। ওয়াসার সূত্র জানায়, বর্তমানে সামন্তসেনা পানি শোধনাগার থেকে দৈনিক প্রায় ৬ কোটি লিটার পানি উৎপাদিত হচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ বা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ লিটার পানি গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর আগেই হারিয়ে যাচ্ছে। উৎপাদিত পানির বিপরীতে কোনো রাজস্ব পাওয়া যাচ্ছে না।

পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত নগর পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নন-রেভিনিউ ওয়াটারের হার ওয়ান ডিজিটে রাখার চেষ্টা করা হয়। সেখানে খুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ ক্ষতি উদ্বেগজনক। পানি ঘাটতির বিষয়ে প্রকৌশলী আরমান হোসেন বলেন, পানির ঘাটতি থাকবে। ৪৪-৪৫ হাজার গ্রাহককে পানি দেওয়া হচ্ছে। গ্রাহক বাড়লে পানি বিক্রির পরিমাণও বাড়বে। তখন আয় বেশি হবে। তার দাবি, সিস্টেম লস যেটা হয় সেটা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ঠিক আছে।

শোধ হচ্ছে না ঋণ : প্রকল্পটির ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান জাইকা ও এডিবি। চুক্তি অনুযায়ী ৩০ বছরের মধ্যে তাদের ঋণ পরিশোধ করার কথা। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, প্রকল্প থেকে এখন পর্যন্ত এক টাকাও ঋণ শোধ করা যায়নি। অথচ প্রতিবছর ৩০ কোটি টাকা পরিশোধ করার চুক্তি রয়েছে। ওয়াসার এই প্রকল্প থেকে বর্তমানে আয় মাত্র ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। যার সিংহভাগ যায় প্রকল্পটি দেখভাল ও বিদ্যুৎ খরচের পেছনে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনার সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা বলেন, প্রকল্পটি ব্যর্থ বলাই যায়। তৎকালীন ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রকল্প পরিচালক (পিডি), ইঞ্জিনিয়ার, ঠিকাদাররা মিলে লুটপাট করে প্রকল্পটি ধ্বংস করার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।

প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফিরোজ শাহ বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

(যুগান্তর)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD