স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারানোর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সিইপিএ) এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরের উদ্যোগ জোরদার করেছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তির দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এসব চুক্তি নিয়ে আলোচনা চললেও এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় ঘনিয়ে আসায় সরকার এখন বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের সর্বশেষ নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৬ সালের নভেম্বর। তবে সরকার এ সময়সীমা অন্তত তিন বছর বাড়ানোর জন্য জাতিসংঘের কাছে আবেদন করেছে। এ প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৯ মেয়াদের জন্য স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে টেকসই, মসৃণ ও স্থিতিশীল উত্তরণ শীর্ষক একটি জাতীয় পথনকশার খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এতে বিভিন্ন প্রস্তুতির পাশাপাশি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে অন্যতম অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য ২০৩১ সালের মধ্যে অন্তত ১০টি নতুন এফটিএ, সিইপিএ বা ইপিএ স্বাক্ষর করা।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতায় পাওয়া শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা আর থাকবে না। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাজ্যসহ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে দেশীয় পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ হতে পারে। এতে দেশের রপ্তানি ৬ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণেই রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে সরকার দ্রুত বাণিজ্য চুক্তির পথে এগোচ্ছে।
সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন, এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে আগামী কিছুদিনের মধ্যে পাঁচ থেকে ছয়টি দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ আলোচনা শুরু হবে।
জাপানের সঙ্গে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তি
গত ৬ ফেব্রুয়ারি জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো কোনো দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি এবং দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে। চুক্তির আওতায় তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের প্রায় সাত হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বাজারে পর্যায়ক্রমে জাপানের এক হাজার ৩৯টি পণ্য শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার পাবে। সরকারের আশা, এ চুক্তির মাধ্যমে পণ্য বাণিজ্যের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে দরকষাকষি শেষ
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সিইপিএ) নিয়ে দরকষাকষিও শেষ হয়েছে। এখন দুই দেশের আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের পর চুক্তি স্বাক্ষর হবে। প্রায় এক বছরের আলোচনা শেষে গত মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দুই দেশের প্রতিনিধিরা এ-সংক্রান্ত কার্যপত্রে স্বাক্ষর করেন। পরে যৌথভাবে বিষয়টি ঘোষণা দেন দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীরা।
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, জুতা, ওষুধসহ মোট আট হাজার ৪২৮টি পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক, যন্ত্রাংশসহ এক হাজার ৫৪টি পণ্য বাংলাদেশে একই ধরনের সুবিধা পাবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সিইপিএ শুধু পণ্যের শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সেবা, প্রযুক্তি, মেধাস্বত্ব, ডিজিটাল বাণিজ্য, সরকারি ক্রয়, কাস্টমস সহযোগিতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকে।
ইইউর কারিগরি দল আসছে
এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এ লক্ষ্যে প্রাথমিক আলোচনা এগিয়ে নিতে ইইউর একটি কারিগরি দল শিগগিরই ঢাকা সফর করবে। দলটি সম্ভাব্য এফটিএ বাস্তবায়নের জন্য একটি রোডম্যাপও প্রণয়ন করবে।
গত ৯ জুলাই অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠকে ঢাকায় নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত এবং স্পেনের রাষ্ট্রদূত এ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন বাণিজ্যমন্ত্রী এবং ইইউর পক্ষে নেতৃত্ব দেন রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার।
বৈঠক শেষে এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ইইউর উদ্বেগ দূর করা, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা এবং বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা কমাতে সরকার কাজ করছে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, ইইউ উত্থাপিত বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পূরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। চলমান সংস্কারের ফলে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে, জ্বালানি-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সহজ হবে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে বেসরকারি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দক্ষতা বাড়বে।
অন্যদিকে ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে এফটিএ নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করতে ইইউ প্রস্তুত এবং এ বিষয়ে তারা ইতোমধ্যে সরকারের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। তিনি সময়োপযোগী সংস্কার, অশুল্ক বাধা অপসারণ এবং ব্যবসা পরিবেশ আরও উন্নত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
উচ্চপর্যায়ের উপদেষ্টা কমিটি
ইইউর সঙ্গে সম্ভাব্য এফটিএ নিয়ে আলোচনা, দরকষাকষি ও কৌশলগত দিকনির্দেশনা দিতে সরকার সম্প্রতি ১৭ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের উপদেষ্টা কমিটি গঠন করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জারি করা অফিস আদেশ অনুযায়ী, কমিটির সভাপতি থাকবেন বাণিজ্যমন্ত্রী এবং সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুবিভাগ প্রধান (এফটিএ)।
বর্তমানে এলডিসি সুবিধার আওতায় বাংলাদেশ ইইউ বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ভোগ করছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও এই সুবিধা আরও তিন বছর বহাল থাকবে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা ধরে রাখা এবং রপ্তানির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখতে সরকার এফটিএকে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হিসেবে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম ও ভারত ইতোমধ্যে ইইউর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করায় বাংলাদেশও দ্রুত এফটিএর পথে এগিয়ে যেতে চাইছে।
আরও যেসব দেশের সঙ্গে চুক্তির প্রস্তুতি
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরেই সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে এফটিএর আলোচনা উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে এগিয়ে নেওয়া হবে। এসব দেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক দরকষাকষি শুরু হয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির (ইপিএ/সিইপিএ) আলোচনা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের পর চুক্তি স্বাক্ষর হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তালিকায় ভবিষ্যতে এফটিএ বা অনুরূপ বাণিজ্য চুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, চীন, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা ও সৌদি আরব রয়েছে। পাশাপাশি বিমসটেকসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক জোটের সঙ্গেও বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে এফটিএর বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
আরসিইপিতে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা
চীনের নেতৃত্বাধীন বিশ্বের বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য জোট রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) যোগ দেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছে বাংলাদেশ। ১৫ সদস্যের এই জোটের মোট জনসংখ্যা প্রায় ২৩৩ কোটি, যা বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ। জোটটির বাজারের আকার প্রায় ২৬ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। এতে অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনাই, চীন, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও লাওস অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আরসিইপিতে যোগ দিলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক ভ্যালু চেইনের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে পারবে। এতে রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় দেখা গেছে, আরসিইপিতে অন্তর্ভুক্ত হলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।
উল্লেখ্য, জাপানের সঙ্গে ইপিএ স্বাক্ষরের আগে বাংলাদেশের একমাত্র দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি ছিল ভুটানের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ)। এক দশক ধরে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এফটিএ নিয়ে আলোচনা চলছিল। এলডিসি উত্তরণের সময় ঘনিয়ে আসায় এখন সরকার দ্রুত এসব চুক্তি সম্পাদনের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ মত
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক বলেন, এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এ ধরনের বাণিজ্য চুক্তি করা একটি অত্যন্ত ইতিবাচক নীতিগত উদ্যোগ। জাপানের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে যে আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্য আলোচনা ও দরকষাকষি পরিচালনার সক্ষমতা দেশ অর্জন করেছে। ফলে ভবিষ্যতে অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির সঙ্গেও এ ধরনের চুক্তি করতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি বলেন, এই অংশীদারিত্বকে শুধু বাণিজ্য চুক্তি হিসেবে দেখলে হবে না। এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা। কিন্তু দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা না গেলে এসব চুক্তির পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন হবে। অর্থাৎ শুধু চুক্তি করলেই হবে না, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। সমকাল