শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ০১:২৪ পূর্বাহ্ন




গ্যাস সংকটে গভীর হচ্ছে বাংলাদেশের জ্বালানি ঝুঁকি: সিপিডি

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬ ৪:১৫ pm
CPD logo CPD Centre for Policy Dialogue CPD সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ সিপিডি
file pic

‎দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আর শুধু সাময়িক সরবরাহ সংকটের বিষয় নয়, বরং এটি ক্রমেই একটি কাঠামোগত সংকটে পরিণত হচ্ছে। দেশে গ্যাসের মজুদ দ্রুত কমছে, নতুন বাণিজ্যিকভাবে সম্ভাবনাময় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হচ্ছে না এবং একই সঙ্গে বাড়ছে আমদানি করা এলএনজি, কয়লা ও পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি বা ভূরাজনৈতিক সংকট দেখা দিলেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, শিল্প ও পরিবহন খাত বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ছে।

‎বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রকাশিত “বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা: তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথে যাত্রা” শীর্ষক উপস্থাপনায় দেশের জ্বালানি খাতের এই চিত্র উঠে এসেছে।

‎উপস্থাপনাটি তৈরি করেছেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ফওকোরউদ্দিন আল কবির।

‎সিপিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের কাঠামোগত ব্যবধান তৈরি হয়েছে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার এমএমসিএফডি হলেও বাস্তবে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডি। অর্থাৎ প্রতিদিন আনুমানিক ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ এমএমসিএফডি গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) মোট স্থাপিত সক্ষমতার ৪২.১৫ শতাংশ।

‎বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে ভয়াবহ ঘাটতি:

‎সংকটের সাম্প্রতিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। গত ১১ আগস্টের পেট্রোবাংলার দৈনিক গ্যাস ও কনডেনসেট উৎপাদন-সরবরাহ প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে সিপিডি জানায়, পাঁচটি গ্যাস উৎপাদনকারী কোম্পানির উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৫৭ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছিল। বিদ্যুৎ খাতের জন্য নির্ধারিত চাহিদার মাত্র ২৯ শতাংশ এবং সার কারখানাগুলোর প্রয়োজনের মাত্র ৩৮ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে।

‎এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদনে। গ্যাস ও জ্বালানি সংকটে গার্মেন্টস ও সার কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। একই সঙ্গে জ্বালানির মূল্য ও সরবরাহ সংকট পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। নিম্নআয়ের পরিবারগুলোও বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের কারণে বেশি চাপে পড়ছে।

‎২০৩১-এর মধ্যে গ্যাস মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ার শঙ্কা:

‎দেশের সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ নিয়ে। সিপিডির উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, ছয় দশকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ২০৩১ সালের মধ্যে দেশে গ্যাসের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে। নতুন আবিষ্কার বা কার্যকর হস্তক্ষেপ না হলে একই সময়ের মধ্যে অবশিষ্ট গ্যাস মজুদ প্রায় নিঃশেষের দিকে চলে যেতে পারে।

‎অর্থাৎ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, সার, আবাসিক ও পরিবহন—সব খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি উৎসকে ঘিরে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না করলে আগামী দশকের শুরুতেই আরও বড় সংকট দেখা দিতে পারে।

‎এলএনজি নির্ভরতা বাড়ছে, বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ:

‎দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ ক্রমেই আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট গ্যাস ব্যবহারের ২৮.৮২ শতাংশ এসেছে আমদানি করা এলএনজি থেকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সাম্প্রতিক পরিবর্তন এই নির্ভরতার ঝুঁকি স্পষ্ট করে দিয়েছে।

‎সিপিডি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালী ঘিরে সরবরাহ বিঘ্নের পর কাতার বাংলাদেশে নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে কমিয়ে দেয়। সংঘাতের আগে ১৯টি কার্গো পাওয়ার পর পরবর্তী সময়ে কোনো কার্গো পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে পেট্রোবাংলাকে স্পট মার্কেট থেকে ৩৫টি এলএনজি কার্গো সংগ্রহ করতে হয়েছে।

‎এর ফলে এলএনজির দামও বেড়েছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় ১০ ডলার থাকলেও স্পট মার্কেটে তা বেড়ে ১৫.৮৮ থেকে ১৬.৯৮ ডলারে উঠেছে। এতে এলএনজি ভর্তুকির ব্যয়ও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সিপিডির হিসাবে, পেট্রোবাংলার এলএনজি ভর্তুকি বিল বেড়ে ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বরাদ্দ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রায় তিন গুণ।

‎জীবাশ্ম জ্বালানির ফাঁদে বাংলাদেশ:

‎বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের নির্ভরতা এখনো মূলত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। বিপিডিবির ২০২৬ সালের তথ্য উদ্ধৃত করে সিপিডি জানিয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৪২.১৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস, ২৩.৪১ শতাংশ কয়লা এবং ১৯.০৬ শতাংশ ফার্নেস অয়েলভিত্তিক। বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবিদ্যুতের সম্মিলিত অংশ খুবই সীমিত।

‎সিপিডির পর্যবেক্ষণ, বাংলাদেশ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বেরিয়ে আসার পরিবর্তে ক্রমেই আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হওয়ার পর থেকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমার পাশাপাশি এলএনজি আমদানি বাড়ছে।

 

‎সংকট মোকাবিলায় জরুরি তিন ধাপ:

‎বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানি ক্রয়ের সীমা, দোকানপাট আগেভাগে বন্ধ, আলোকসজ্জা নিষিদ্ধ, অফিস ও ব্যাংকের সময় কমানো এবং শিক্ষা কার্যক্রমে অনলাইন-অফলাইন সমন্বয়সহ বিভিন্ন চাহিদা ব্যবস্থাপনা পদক্ষেপ নিয়েছে। পাশাপাশি জরুরি জ্বালানি আমদানি, এলএনজি সংগ্রহ, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, ৯০ দিনের জ্বালানি মজুদ তৈরির পরিকল্পনা এবং মজুতদারির বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে।

‎তবে সিপিডি মনে করছে, এসব তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান হবে না। স্বল্পমেয়াদে এলএনজি সংগ্রহে মূল্যঝুঁকি কমানো, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে হবে। মধ্যমেয়াদে এলএনজি টার্মিনাল ও স্টোরেজ সক্ষমতা, গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

‎সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে ‘জাতীয় জরুরি অগ্রাধিকার’ দেওয়ার কথা বলেছে সিপিডি। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় কৌশলগত জ্বালানি মজুদ গড়ে তোলা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

‎সিপিডির ভাষায়, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট একই সঙ্গে তাৎক্ষণিক ও কাঠামোগত। আজকের জরুরি পদক্ষেপ সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল করতে পারে; কিন্তু টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দেশীয় অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো ছাড়া বিকল্প নেই।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD