আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজার থেকে অনিয়ম, দুর্নীতি, আর্থিক লুটপাট এবং বিদেশে টাকা পাচারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি)। এপিজি প্রতিনিধিদল সতর্ক করে বলেছে, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো আগামীতে বাংলাদেশের পারস্পরিক মূল্যায়নে (মিউচুয়াল ইভালুয়েশন) নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
একই সাথে, প্রতিনিধিদল আর্থিক খাত সংস্কার এবং পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে বর্তমান সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলোকে স্বাগত জানিয়েছে এবং এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছে।
আগামীতে অনুষ্ঠেয় পারস্পরিক মূল্যায়নের বিষয়ে বাংলাদেশের প্রস্তুতি পর্যালোচনা করতে গত ১১ থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত তিন দিন ঢাকা সফর করে এপিজির একটি প্রতিনিধিদল। সফরকালে প্রতিনিধিদলটি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, আর্থিক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ, নীতিনির্ধারক এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সাথে একাধিক বৈঠক করে।বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
এপিজি প্রতিনিধিদলের সাথে বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর প্রতিনিধিরা, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণকারী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সফরের অংশ হিসেবে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে জাতীয় সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধে সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং দেশের অ্যান্টি-মনি লন্ডারিং/কাউন্টারিং দ্য ফাইন্যান্সিং অব টেররিজম (এএমএল/সিএফটি) ও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন এবং ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের বিস্তারে অর্থায়ন প্রতিরোধ (সিএফপি) কাঠামো আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়।
এনসিসি সভায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধিরা মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশনের প্রস্তুতি সম্পর্কে তাদের অগ্রগতি তুলে ধরেন। এছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওয়ার্কিং কমিটির সভায় বাংলাদেশের প্রস্তুতির ব্যবহারিক দিক, অগ্রাধিকার ক্ষেত্র, প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব এবং পরবর্তী করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।
তিন দিনের কর্মসূচিতে এপিজি প্রতিনিধিদল বিভিন্ন ‘ইমিডিয়েট আউটকাম’ (আইও) নিয়ে একাধিক বৈঠক করে। এসব বৈঠকে বিএফআইইউ, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি)সহ বিভিন্ন সংস্থা ও আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা অংশ নেন।
এ সময় বাংলাদেশের আগের মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশনের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ, পরবর্তী সময়ে নেওয়া পদক্ষেপের অগ্রগতি এবং আসন্ন মূল্যায়নের জন্য অগ্রাধিকারমূলক করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
এপিজি প্রতিনিধিদল ব্যাংক, বিমা কোম্পানি, পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান, এনজিও, এনপিও এবং অন্যান্য রিপোর্টিং সংস্থার প্রতিনিধিরাসহ বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সাথেও আলাদা বৈঠক করেছে।
কর্মসূচির শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বিএফআইইউ প্রধান এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউ-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পারস্পরিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার প্রতি বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশন হলো মানিলন্ডারিং, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন এবং ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের বিস্তারে অর্থায়ন প্রতিরোধে কোনো দেশের সামগ্রিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পরিপালনের অবস্থান মূল্যায়নের প্রক্রিয়া।
এপিজির মাধ্যমে ২০২৭-২৮ মেয়াদে বাংলাদেশের পরবর্তী মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে ২০০২, ২০০৯ ও ২০১৬ সালে বাংলাদেশের মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশন হয়।
২০০৯ সালের মূল্যায়নের পর, বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় (গ্রে-লিস্ট) রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে সরকারের নেওয়া বেশ কিছু পদক্ষেপের পর ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশকে এই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
এরপর ২০১৬ সালের পারস্পরিক মূল্যায়নে এপিজি এবং এর ৪২টি সদস্য দেশ বাংলাদেশকে একটি ‘কমপ্লায়েন্ট কান্ট্রি’ বা মানদণ্ড অনুসারী দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।