রাজশাহীতে দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। একদিকে নগরীতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজনন ঘনত্ব আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, অন্যদিকে হাসপাতালে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ কীটতাত্ত্বিক জরিপে রাজশাহী নগরীতে এডিস মশার প্রজনন ঘনত্বের ব্রেটো সূচক পাওয়া গেছে ৬১ দশমিক ৩৩।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্রেটো সূচক ২০-এর বেশি হলে কোনো এলাকাকে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই হিসাবে রাজশাহীর বর্তমান সূচক উচ্চ ঝুঁকির নির্ধারিত সীমার তিন গুণেরও বেশি। একই সঙ্গে গত ৪৮ ঘণ্টায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নতুন করে ২১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ৪৮ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে রাজশাহী নগরীতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার ঘনত্ব প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে নগরীতে পরিচালিত কীটতাত্ত্বিক জরিপে ব্রেটো সূচক ছিল ৩০ দশমিক ৬৬। আগস্টের সর্বশেষ জরিপে সেই সূচক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১ দশমিক ৩৩। অর্থাৎ বর্ষা মৌসুমে অল্প সময়ের মধ্যেই এডিস মশার প্রজনন ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এ অবস্থায় নগরীতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি আগস্ট মাসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের উদ্যোগে নগরীর কাজিহাটা, চন্ডীপুর, উপরভদ্রা, নামোভদ্রা ও হাজরাপুকুর এলাকায় কীটতাত্ত্বিক জরিপ পরিচালনা করা হয়। জরিপের আওতায় ৭৫টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ২৪টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। ফলে বাড়ির সূচক দাঁড়িয়েছে ৩২ শতাংশ। একই সময়ে ৬৮টি পানি ধারণকারী পাত্র পরীক্ষা করে ৪৬টিতে মশার লার্ভার উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। এতে পাত্রের সূচক দাঁড়িয়েছে ৬৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ। জরিপের এই ফলাফল নগরীর আবাসিক এলাকাগুলোতে এডিস মশার প্রজননের ব্যাপকতার একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে।
জরিপে বিভিন্ন প্রজননস্থল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে মোট ৬৮৫টি মশার লার্ভা। এর মধ্যে ৫০৫টি ছিল এডিস অ্যালবোপিকটাস, ৮৬টি এডিস ইজিপ্টি এবং ৯৪টি অন্যান্য প্রজাতির মশার লার্ভা। ডেঙ্গুর প্রধান বাহক হিসেবে পরিচিত এডিস ইজিপ্টির পাশাপাশি এডিস অ্যালবোপিকটাসের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। এতে নগরীতে ডেঙ্গু সংক্রমণের সম্ভাব্য ঝুঁকি আরও বাড়ছে বলে মনে করছেন কীটতত্ত্ব সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য বড় কোনো জলাশয় বা নোংরা আবর্জনাপূর্ণ স্থান অপরিহার্য নয়। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের পাত্র, নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন অংশ কিংবা অন্য কোনো ছোট পাত্রে কয়েকদিন পানি জমে থাকলেও সেখানে এডিস মশার লার্ভা তৈরি হতে পারে। ফলে শুধু বড় ড্রেন, নালা বা ময়লার স্তূপ পরিষ্কার করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বাড়ি ও আশপাশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পানি জমার স্থানগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখার ওপরও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, রাজশাহীতে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। রাজশাহীর সর্বশেষ ব্রেটো সূচক ৬১ দশমিক ৩৩, যা উচ্চ ঝুঁকির নির্ধারিত সীমার তিন গুণের বেশি। তাঁর মতে, গত মে মাসের জরিপেও নগরীতে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকির চিত্র পাওয়া গিয়েছিল। তখন ব্রেটো সূচক ছিল ৩০ দশমিক ৬৬। দুই মাসের ব্যবধানে এই সূচক প্রায় দ্বিগুণ হওয়া পরিস্থিতির অবনতির স্পষ্ট ইঙ্গিত।
এডিস মশার বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও। রামেক হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ জুন হাসপাতালটিতে মাত্র একজন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। এরপর ৩০ জুলাই চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় নয়জনে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে সেই সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সর্বশেষ ২৮ আগস্ট রামেক হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮ জনে। এর মধ্যে গত ৪৮ ঘণ্টাতেই নতুন করে ২১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। রোগীর এই দ্রুত বৃদ্ধি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি নগরবাসীর মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
রাজশাহী জেলা কীটতত্ত্ববিদ উম্মে হাবিবা বলেন, বছরের পর বছর ধরে নগরীতে মশার লার্ভা ও পূর্ণাঙ্গ মশার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিভিন্ন সাধারণ গৃহস্থালি সামগ্রীতেও এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর মতে, শুধু সিটি করপোরেশন বা সরকারি কোনো সংস্থার একক উদ্যোগে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য নগরবাসীকেও নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে হবে। বিশেষ করে বৃষ্টির পর কোথাও পানি জমে আছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ বলেন, হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে রোগীদের চিকিৎসায় হাসপাতালের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বর্ষাকালে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। কারণ হাসপাতালে রোগী ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি রোগের উৎস ও বাহক নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে রাজশাহী সিটি করপোরেশনও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানিয়েছে। সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন ডলার বলেন, সিটি করপোরেশনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ডেঙ্গু পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়, তবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং নগরীর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আরও জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। জাগো নিউজ