দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই আর তার প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বে পরিবর্তনের সম্ভাবনা—এই দুইয়ের মধ্যে আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ইসরায়েলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ পার্লামেন্ট নির্বাচন।
অবশ্য শেষ মুহূর্তের জরিপে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারায় ভোটের পরও রাজনৈতিক অচলাবস্থার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সমর্থন সরকার গঠনের সমীকরণে হয়ে উঠতে পারে গুরুত্বপূর্ণ।
বার্তাসংস্থা আনাদোলু বলছে, ইসরায়েলে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পার্লামেন্ট নির্বাচন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের অবসান হতে পারে। আবার কোনো পক্ষই সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে দেশটি নতুন করে রাজনৈতিক অচলাবস্থায় পড়তে পারে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং এর পর গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, পাশাপাশি লেবানন ও ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের পর এটিই ইসরায়েলের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। এছাড়া ১৯৮৮ সালের পর এবারই প্রথম নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর আগে কয়েক দশক ধরে একের পর এক সরকারের পতন হওয়ায় কোনো সরকারই তাদের চার বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি।
নির্বাচনে ভোট দেয়ার যোগ্য নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ৭৩ লাখ। তাদের মধ্যে আনুমানিক ১২ লাখ ইসরায়েলি নাগরিক ফিলিস্তিনি। সারা দেশে ১২ হাজার ১৮টি ভোটকেন্দ্রে ভোট গ্রহণ হবে। ভোটের জন্য প্রায় ১৮ হাজার ব্যালট বাক্স রাখা হয়েছে।
অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় (বাংলাদেশ সময় বেলা ১১টায়) খুলবে এবং রাত ১০টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ২টায়) বন্ধ হবে। নির্বাচনের দিন দেশটিতে সরকারি ছুটি। ১২০ আসনের নেসেটে (ইসরায়েলি পার্লামেন্ট) জয়ী হতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে ৩৭টি দল ও নির্বাচনী জোট। সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন প্রয়োজন।
ইসরায়েলের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটাররা সরাসরি কোনো প্রার্থীকে নয়, রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। পার্লামেন্টে প্রবেশ করতে হলে কোনো দলকে বৈধ ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পেতে হয়।
অবশ্য ইসরায়েলের ইতিহাসে কোনো দলই এককভাবে নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, তা নির্ধারণে সরকার গঠনের জন্য জোট গঠনের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শেষ মুহূর্তের জরিপে এগিয়ে আইজেনকটের দল
ইসরায়েলের তিনটি প্রধান টেলিভিশন সম্প্রচারমাধ্যম প্রকাশিত সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকটের মধ্যপন্থি দল ইয়াশার সামান্য ব্যবধানে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, ইয়াশার ২২ থেকে ২৩টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে লিকুদ পার্টির আসনসংখ্যা হতে পারে ১৯ থেকে ২১টি। সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন ‘বিইয়াচাদ’ বা ‘একসঙ্গে’ জোট তৃতীয় অবস্থানে থাকতে পারে। জোটটি ১৪ থেকে ১৫টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিরোধী শিবিরের অন্য দলগুলোর মধ্যে রয়েছে সাবেক জেনারেল ইয়ার গোলানের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্র্যাটস এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যানের দল ইসরায়েল বেইতেনু।
তিনটি জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ডানপন্থি ও ধর্মীয় দলগুলোর জোট ৫০টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে বিরোধী জোটের আসনসংখ্যা হতে পারে ৫২ থেকে ৫৬টি।
ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বাধীন দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৪ থেকে ১৬টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকট—কেউই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার মতো অবস্থানে নেই।
তবে সবচেয়ে বেশি আসন পেলেই যে কোনো নেতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রধানমন্ত্রী হবেন, বিষয়টি এমন নয়। নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ নির্বাচিত দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবেন। এরপর যার সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে মনে হবে, সেই আইনপ্রণেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন তিনি।
এবারের ভোটে ৭৭ বছর বয়সী নেতানিয়াহু আবারও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেতে লড়ছেন। তিন দফায় তিনি ১৮ বছরেরও বেশি সময় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তার নির্বাচনী প্রচারের মূল বিষয় জাতীয় নিরাপত্তা। আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলায় নিজের অভিজ্ঞতা ও সামরিক নীতির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরছেন তিনি।
তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে সরকারের ব্যর্থতা, পরবর্তী সংঘাতগুলো মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা তদন্তে স্বাধীন রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের বিরোধিতা নিয়ে সমালোচনার মুখে রয়েছেন নেতানিয়াহু।
দুর্নীতির অভিযোগেও তার বিচার চলছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। এ ছাড়া গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য জোটসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থি দলগুলো। এ ছাড়া রয়েছে অতি-কট্টর ধর্মীয় দল শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম।
বেন-গভির ও স্মোট্রিচ অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন এবং ফিলিস্তিনিদের গাজা ছেড়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এছাড়া অতি-ধর্মীয় দলগুলো ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সামরিক বাহিনীতে যোগদানের ক্ষেত্রে অব্যাহতি বজায় রাখার দাবি জানিয়ে আসছে। বছরের পর বছর সংঘাতের কারণে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী যখন জনবলসংকটে ভুগছে, তখন এ নিয়ে তাদের ওপর সমালোচনাও বাড়ছে।
অন্যদিকে ৬৬ বছর বয়সী আইজেনকট ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রধান ছিলেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর তিনি নেতানিয়াহুর জরুরি সরকারে যোগ দেন। তবে গাজায় সামরিক অভিযান পরিচালনায় নেতানিয়াহুর ভূমিকা এবং সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কৌশলের অভাবের সমালোচনা করে পরে সরকার ছেড়ে দেন তিনি।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হয়ে দায়িত্ব পালন করার সময় তার ছেলে নিহত হন। আইজেনকটের নির্বাচনী প্রচারের মূল প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তাব্যর্থতা তদন্তে সরকারি তদন্ত কমিশন গঠন এবং অতি-ধর্মীয় পুরুষদের সামরিক বাহিনীতে যোগদানের ক্ষেত্রে ব্যাপক ছাড় বন্ধ করার পক্ষে তিনি।
নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে নিজেকে তুলে ধরলেও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যুতে তার অবস্থান অবশ্য নেতানিয়াহুর কাছাকাছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে পূর্ণ সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন আইজেনকট। তার মতে, গাজায় হামাসের সামরিক সক্ষমতা ও শাসনের অবসান ঘটাতে হবে।
ফলে এবারের নির্বাচনে নেতৃত্ব, সরকার পরিচালনা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং কট্টর ডানপন্থি দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে ভোটারদের সামনে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরা হচ্ছে। তবে নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ইস্যুতে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর অবস্থান একই রকম।
এমন অবস্থায় ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান দল জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে কোনো প্রধান জোটই ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে না পারলে এই দলগুলোর ভূমিকা হয়ে উঠে পারে গুরুত্বপূর্ণ।
জরিপ অনুযায়ী, জয়েন্ট লিস্ট প্রায় ৯টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে রা’আমের আসনসংখ্যা হতে পারে ৫ থেকে ৭টি। আইজেনকটের নেতৃত্বে সরকার গঠন করতে হলে ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বাধীন এই এক বা উভয় দলের সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে। আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে যোগ দেয়া কিংবা পার্লামেন্টে বাইরে থেকে সমর্থন—দুই পথেই এমন সমর্থন আসতে পারে।
তবে এ ধরনের সমঝোতার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বাধা রয়েছে। লিবারম্যান জানিয়েছেন, ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল কোনো সরকারে তিনি যোগ দেবেন না। বিরোধী শিবিরের অন্য নেতারাও এমন সমঝোতার বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে দ্বিধা করছেন।
অন্যদিকে পরবর্তী সরকারে ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বাধীন দলগুলোর প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনার কথা বারবার তুলে ধরে ডানপন্থি ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছেন নেতানিয়াহু।
মঙ্গলবারের নির্বাচনে কয়েক ধরনের ফলাফল আসতে পারে। নেতানিয়াহুর জোট পর্যাপ্ত আসন পেলে অথবা বর্তমান জোটের বাইরের আইনপ্রণেতাদের সমর্থন আদায় করতে পারলে তিনি আবারও সরকার গঠন করতে পারেন।
অন্যদিকে আইজেনকটের নেতৃত্বে সরকার গঠনের জন্য ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা, অন্য শিবির থেকে আইনপ্রণেতাদের যোগদান কিংবা আদর্শগতভাবে বিভক্ত বিরোধী নেতাদের মধ্যে কঠিন সমঝোতার প্রয়োজন হতে পারে।
লিকুদ ও প্রধান বিরোধী দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনও হতে পারে। তবে আইজেনকট ও তার কয়েকজন মিত্র নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারে কাজ না করার কথা জানিয়েছেন।
কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে দীর্ঘ সময় ধরে জোট গঠনের আলোচনা চলতে পারে। সে ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থেকে যেতে পারেন। পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত আরেকটি নির্বাচনের দিকেও গড়াতে পারে।
৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোটের নির্বাচনী সীমার কাছাকাছি থাকা ছোট দলগুলোর ফলাফলও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এই সীমা অতিক্রম করতে ব্যর্থ হলে কোনো দলই পার্লামেন্টে আসন পাবে না। এতে তাদের রাজনৈতিক মিত্ররা দুর্বল হতে পারে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী জোটগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত ১০টায় ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশের কথা রয়েছে। এরপর রাতের মধ্যেই প্রাথমিক সরকারি ফল আসতে শুরু করবে। তবে সামরিক বাহিনীর সদস্য, হাসপাতাল, কারাগার এবং অন্যান্য বিশেষ ব্যবস্থায় দেয়া ভোট গণনা করতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
আগামী ৪ নভেম্বরের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের কথা রয়েছে। এরপরও সরকার গঠনের জন্য জোট-সংক্রান্ত আলোচনা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে।