আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিনিয়োগ পরিবেশবিষয়ক এক প্রতিবেদনে এই আশঙ্কার কথা জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপন্থী, ধর্ম নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল হলেও জাতীয় নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
সবশেষ সাধারণ নির্বাচন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত শেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নানা ধরনের অনিয়ম, সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের কারণে ব্যাহত হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন ধরনের আইন ও নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পরিসর সংকুচিত করেছেন, সেই সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব এবং গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের স্বাধীনতা হুমকির মুখে ফেলা হয়েছে।
চলতি সপ্তাহে আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষণের একপর্যায়ে বলা হয়েছে, তারা বলেছে, দেশটির রাজনীতিতে মেরুকরণ রয়েছে, আর বেশির ভাগ ক্ষমতা আওয়ামী লীগের হাতে। সংসদে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব খুবই কম, ফলে সরকারের ওপর নজরদারি সীমিত। ২০২৪ সালে নির্বাচন হবে, কিন্তু বিএনপি অংশ নেবে কি না, তা পরিষ্কার নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও মনে করছে, আগামী নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই প্রতিবেদন মূলত বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে। বিশ্বের ১৬০টি দেশের বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে এই প্রতিবেদন দিয়েছে তারা। সেখানে বাংলাদেশ অংশে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।
মার্কিন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ গড়ে ৬ শতাংশের বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। দেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কৌশলগত গুরুত্ব ও বিপুল শ্রমশক্তির কারণে মার্কিন কোম্পানি এখানে বিনিয়োগ করে থাকে। তবে কোভিড-১৯ ও তারপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য অর্থাৎ তৈরি পোশাকের চাহিদা কমেছে। সেই সঙ্গে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়েছে।
এতে আরও বলা হয়, বিশ্ববাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ২০২২ সালে দেশে ব্যালান্স অব পেমেন্টের ঘাটতি বেড়েছে। ফলে দেশে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ২০২১ সালের আগস্টে ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ৩২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। বিদেশি মুদ্রার সংকটের মধ্যে গত বছর বাংলাদেশে ব্যাংক খাতে ঋণ কেলেঙ্কারি ঘটে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যার সিংহভাগের হদিস সরকারের কাছে নেই।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ পেয়েছে। প্রতিবেদনে আইএমএফের সূত্রে বলা হয়েছে, এই ঋণ দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অরক্ষিত মানুষদের সুরক্ষা দেবে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশের ভালোমন্দ উভয় দিক নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, গত এক দশকে বিনিয়োগের বাধা অপসারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করেছে, যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করে বিদ্যুতের নিশ্চয়তা বৃদ্ধি। কিন্তু অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, অর্থায়নের সীমিত সুযোগ, আমলতান্ত্রিক বিলম্ব, শ্রম আইনের শিথিল প্রয়োগ ও দুর্নীতির কারণে এখনো বিদেশি বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে। সরকার ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে প্রয়াস পেয়েছে, কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগ নীতির এখনো পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো বিকশিত হচ্ছে। আর্থিক খাত ব্যাংকের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। অথচ ২০২২ সালে দেশের ব্যাংক খাতে বড় ধরনের কেলেঙ্কারি ঘটে গেছে। ১১টি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩১০ কোটি ডলার।
বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রতিবেদনে নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়েছে। বলা হয়েছে, দেশের বিচারিক কার্যক্রমের গতি কম এবং এ ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ আছে। সেই সঙ্গে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা থাকায় চুক্তি বাস্তবায়ন ও ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যাহত হয়।
শ্রম অধিকারের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ অধিকার (আইপিআর) ও পরিবেশবিষয়ক বেশ কিছু আধুনিক আইন করা হয়েছে, কিন্তু এসব আইনের অনেক কিছুই প্রয়োগ হয় না। তবে গত এক দশকে ভবন ও অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হলেও শ্রমিকদের স্বাধীনভাবে সংগঠন করা ও সম্মিলিতভাবে দর-কষাকষির অধিকার সীমিত। এ ছাড়া বাংলাদেশ পরিবেশবিষয়ক বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সমঝোতায় যোগ দিলেও বায়ুদূষণের দিক থেকে ঢাকা বিশ্বের অন্যতম নিকৃষ্ট শহর।